পার্বত্যাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চলমান সমন্বিত অভিযানে নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দিল শারক্বীয়ার সাত সদস্য এবং পাহাড়ি একটি ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী’র তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে র্যাব। তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানানো হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকায় র্যাব সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানান।
এদিকে বান্দরবানের রুমা উপজেলাসংলগ্ন রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ির বড়থলি থেকে গতকাল রাঙ্গুইয়া তঞ্চঙ্গ্যা (৩৮) নামে এক যুবকের লাশ উদ্ধার করেছেন সেখানকার বাসিন্দারা। ওই যুবককে গত ১৫ অক্টোবর জঙ্গিগোষ্ঠী অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
দুর্গম ওই এলাকায় প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জঙ্গিবিরোধী সমন্বিত অভিযান চলছে। বান্দরবানের রুমা ও রোয়াংছড়ি উপজেলায় জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার জঙ্গিরা প্রশিক্ষণের আস্তানা গেড়েছে বলে এর আগে র্যাব কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন। ওই এলাকায় এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চার কিলোমিটার জুড়ে কর্ডন করে রাখা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্তত সহস্রাধিক সদস্য সেখানে অভিযানে গেছেন বলে জানা গেছে। নিরাপত্তার কারণে এ অভিযানের সময় রুমা ও রোয়াংছড়িতে পর্যটকদের ভ্রমণ আপাতত নিষিদ্ধ করেছে জেলা প্রশাসন। এর আগে দুই দফায় নতুন জঙ্গি সংগঠনের ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তৃতীয় দফায় সাতজনকে নিয়ে সংগঠনটির ১৯ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হলো। গত ১০ অক্টোবর ঢাকায় র্যাবের ব্রিফিংয়ে বলা হয়েছিল, নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দিল শারক্বীয়ার সদস্যদের পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের ছত্রছায়ায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সংগঠনটি দুর্গম পাহাড়ে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ শিবির স্থাপন করেছে বলে জানায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জঙ্গিদের ধরতে পাহাড়ে সমন্বিত অভিযানে বেশ অগ্রগতি হয়েছে বলে গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
অভিযানের সর্বশেষ অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার শীর্ষ নেতাদের ধরতে সম্প্রতি পাহাড়ে অভিযান শুরু হয়। এ অভিযানে এখন পর্যন্ত ১০ জনকে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। আগামীকাল (আজ শুক্রবার) বেলা ১১টায় বান্দরবানে সংবাদ সম্মেলন করে এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানানো হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি জঙ্গিবাদে জড়িয়ে নতুন করে কথিত হিজরতের নামে ঘরছাড়া তরুণরা জামাতুল আনসারের হয়ে পাহাড়ি এলাকার আস্তানায় আশ্রয় নেয়। এসব আস্তানায় ওই তরুণদের ভারী অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে হিজরতের নামে বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হওয়া ১৯ জেলার ৫৫ তরুণের পরিচয় পাওয়া গেছে। ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্তঘেঁষা দুর্গম পাহাড়ে বাড়িছাড়া এসব তরুণ জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। নতুন এ জঙ্গি সংগঠনকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) নামে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী।’
বিলাইছড়িতে যুবকের লাশ উদ্ধার : বিলাইছড়িতে জঙ্গিগোষ্ঠীর হাতে অপহরণের শিকার যুবকের লাশ উদ্ধারের বিষয়ে জানতে চাইলে রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার মীর আবু তৌহিদ গতকাল রাত সাড়ে ১১টার দিকে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সেনাবাহিনীর স্থানীয় জোনের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে রাঙ্গুইয়া তঞ্চঙ্গ্যা নামে একজনের লাশ পাওয়ার কথা জানতে পেরেছি। তিনি বিলাইছড়ির বড়থলি ইউনিয়নের বাসিন্দা। তবে কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে তা জানতে পারিনি। খবর পেয়ে পুলিশের একটি দল সেখানে রওনা হয়েছে। তারা পৌঁছানোর পর বিস্তারিত জানা যাবে।’
বড়থলির একাধিক জনপ্রতিনিধি জানান, জঙ্গিবিরোধী অভিযান চলাকালে গত ১২ অক্টোবর বড়থলি ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের টাইগারপাড়া থেকে ২৮ জন শ্রমিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতার জন্য সাইজামপাড়ায় গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ২২ জন ১৩ অক্টোবর বাড়ি ফিরে এলেও ছয়জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ছিলেন। ওই ছয়জন ১৫ অক্টোবর টাইগারপাড়ার বাড়ি ফেরার পথে জঙ্গিদের সামনে পড়ে যান। তখন দুজন শ্রমিক পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও চারজন জঙ্গিদের হাতে ধরা পড়েন। ওই চারজনের মধ্যে তিনজন ১৬ অক্টোবর পালাতে পারলেও রাঙ্গুইয়া তঞ্চঙ্গ্যা পালাতে পারেননি।
বড়থলি ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও টাইগারপাড়ার বাসিন্দা জামাইয়া তঞ্চঙ্গ্যা একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করার পর রাঙ্গুইয়া তঞ্চঙ্গ্যার লাশ ৩ নম্বর ওয়ার্ডের উলুছড়িপাড়ার পশ্চিম পাশের জঙ্গলে পাওয়া যায়। তাকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে।’