ঢাকার কাল শুধু গড়িয়ে চলে

ঢাকা শহর আজ বাংলাদেশের বাঙালির সাংস্কৃতিক রাজধানী। দীর্ঘ কষ্টসাধ্য সংগ্রাম আর ইতিহাসের রক্তস্নাত অক্ষয় অধ্যায় সৃষ্টি করে এই সাংস্কৃতিক রাজধানীর উদ্ভব হয়। বাঙালির কলঙ্ক শুধু পলাশী যুদ্ধ নয়, বক্সারের যুদ্ধও। পলাশীতে যুদ্ধের নামে মীরজাফর আর ক্লাইভ অভিনয় করেছিল। আসল এবং সবচেয়ে হৃদয় দীর্ণ করা যুদ্ধ এবং রক্তপাত হয়েছিল বক্সারে। মীর কাসিমের পরাজয় এবং মৃত্যুই বাংলা ও বাঙালির চূড়ান্ত বিপর্যয়ের অন্ধকার কালের শুরু। তারপর ইতিহাস এবং নিয়তি হেঁটে গেছে নিরবধি। নিয়তিবাদী বাঙালি নিয়তিকে পরিত্যাগ করে নয়, বরং সঙ্গে করেই হেঁটেছে। কখনো নিয়তির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে, কখনো আপস করেছে। সে এক আশ্চর্য স্ববিরোধী মানস চৈতন্যের জাতি। শতাব্দীর পর শতাব্দী নগর জীবনকে বাঙালি অবজ্ঞা করেছে। প্রকৃতির সঙ্গে আত্মবিলয় ঘটিয়ে কৃষিকে অস্তিত্বরক্ষার একমাত্র উপায় হিসেবেই ভেবেছে। উপনিবেশ যুগের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে আধুনিক শিক্ষার স্পর্শ পেয়ে নগর ভীতিকে তারা জয় করতে শেখে। নগর ভীতিপ্রদ ছিল এ কারণেই যে সেখানে বাস করে রাজা-রাজন্যবর্গ এবং পরিষদ, এবং অবশ্যই সৈন্য-সামন্ত। প্রাচীন বাঙালির কল্পনায় ছিল দৈত্য দানবের আবাস যে রূপকথায়, নগর তারই প্রতিকল্প।

সাতচল্লিশের দেশ ভাগ চরম রাজনৈতিক এবং সামাজিক অস্থিরতার কাল। চরম সংকটও বটে। তবু নতুন স্বপ্ন তাড়িয়ে জনতা গ্রাম ছেড়ে শহরে ঢুকে পড়ে। ঢাকাসহ প্রতিটি জেলা ও মহকুমা শহরে নতুন বাসিন্দার আনাগোনা শুরু হয়। শহরের জন-বিন্যাসের বদল ঘটতে থাকে। সংস্কৃতির দীর্ঘস্থায়ী ভাঙা-গড়ার এক অস্থির কাল আচমকা সামনে এসে দাঁড়ায় বাঙালির। পুরাতন সমাজ আর নবাগত সমাজের সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে অভিনতুন রূপ সামনে আসে। ভেঙেপড়া পুরাতন সমাজ, পরিবার এবং শ্রেণির বিন্যাস উপড়ে ধর্ম পরিচয়ে দেশান্তর হতে থাকলে যে শূন্যতা সৃষ্টির পূর্ণতা নতুন বাসিন্দার দ্বারা, তারা আবার পরস্পর অচেনা। তাদের আঞ্চলিক ভাষা এবং জীবনচর্চাও আলাদা। এভাবেই পূর্ববঙ্গের গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দারা নতুন এক পূর্ববঙ্গীয় মিশ্র নগর সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটায়। মিশ্র এই পূর্ববঙ্গীয় নগর

সংস্কৃতির স্থিতিকাল মাত্র দুই দশক। পূর্ববঙ্গ স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ হয়ে গেলে আচমকাই আর এক প্রবল ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে ঢাকাসহ প্রতিটি নগরে। অস্থিরতা সৃষ্টি হয় সাতচল্লিশ-উত্তর নগর-বিন্যাসে। লক্ষ্য মুক্তিযোদ্ধা, নতুন রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা নগর, বিশেষ করে ঢাকা শহরে আছড়ে পড়ে। একাত্তরের সেই নব্য নগরবাসীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক আর সামাজিক উত্তরাধিকারী হচ্ছে আজকের চলমান ঢাকা নগরবাসী।

পূর্ববঙ্গের ‘বাঙাল বাঙালি’র নগর ঢাকা ইতিহাসের অলিখিত পাতায় আজ পাথরচাপা পড়ে আছে। তার দীর্ঘ বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস কেউ টের পায়নি। ঔপনিবেশিক-পূর্ব যুগে ঢাকা হতে পারত দিল্লি, আগ্রা। মুঘল-পাঠান যুগ ঢাকাকে ক্ষুদ্রবাণিজ্য কেন্দ্র কিংবা পূর্ববঙ্গ থেকে খাজনা আদায় করে অর্থ সঞ্চয়ের কেন্দ্র করেই রাখল। ঢাকা হতে পারল না কলকাতার মতো ঔপনিবেশিক রাজধানী। পাকিস্তান যুগেও হলো না সে করাচি-রাওয়ালপিন্ডি। শত শত বছর ধরে ঢাকাকে অপেক্ষা করতে হলো বাঙালির একাত্তরের যুদ্ধের। সবচেয়ে বড় কৌশলটা করেছিল ইংরেজরা। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের হাত ধরে ইংরেজরা পূর্ববঙ্গে সৃষ্টি করেছিল ছোট-বড় অসংখ্য জমিদার। করদ রাজ্য করেছিল রাজা, নবাবদের প্রশাসনিক অঞ্চল। প্রচুর করের অর্থ সংগ্রহ হতো। অন্যদিকে নীল কুঠিয়ালদের উৎপাদিত নীল চলে যেত বাণিজ্য কেন্দ্র কলকাতায় কিংবা মাদ্রাজে। সেখান থেকে ইংল্যান্ডসহ সারা ইউরোপে। অঢেল অর্থ। বঞ্চিত হলো ঢাকা। ইংরেজ আমলা সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্রের সে ক্ষেত্রে কি ভূমিকা ছিল?

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শুধু বাংলা উপন্যাসেরই জনক ছিলেন না। হিন্দু, উর্দু, তামিল, তেলেগু, মলয়ালমসহ উপমহাদেশের সব ভাষায় রচিত উপন্যাসেরই জন্ম-প্রেরণার উৎস ছিলেন। সে হিসেবে বঙ্কিমের দুর্গেশনন্দিনী শুধু বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম উপন্যাসই নয়, উপমহাদেশীয় ভাষায় রচিত প্রথম উপন্যাস। উপন্যাসটির শুরু এভাবে, ‘৯৯৭ বঙ্গাব্দের নিদাঘ শেষে এক দিন একজন অশ্বারোহী পুরুষ বিষ্ণুপুর হইতে মন্দারনের পথে একাকী ভ্রমণ করিতেছিলেন।’ আশ্চর্য এটাই যে, বঙ্কিমের হাতে বাংলা ভাষায় যে উপন্যাসের প্রথম জন্ম হয় তার শুরুর বাক্যেই বঙ্কিম বাংলা উপন্যাসের পথনির্দেশ করে গেছেন। সেই পথটি হচ্ছে ‘রোমান্স’। সাহিত্য সমালোচক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় যথার্থই বলেছিলেন, ‘যে পথ দিয়ে উহার অশ্বারোহী পুরুষটি অশ্বচালনা করিয়াছিলেন তাহা প্রকৃতপক্ষে রোমাঞ্চের রাজপথ। বহু উপন্যাসে প্রথম বঙ্কিমই এই রাজপথের রেখাপাত করেন।’ বঙ্কিমের দ্বিতীয় উপন্যাস ‘কপালকুণ্ডলা’। সমুদ্রপথে তীর্থযাত্রী নবকুমার গভীর অরণ্যে হারিয়ে যান। সেখানে মানবসমাজ এবং সভ্যতাবর্জিতা যৌবনবতী নারী কপালকুণ্ডলা বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী এই উক্তিটি করে, ‘পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছ’? এই উক্তির আড়ালে রয়েছে আদিম ভয়ংকর প্রকৃতি, রোমান্স-রোমান্টিকতা এবং চরম নিঃসঙ্গতা। বাংলা উপন্যাস কি আজও বঙ্কিমের সেই পথনির্দেশের বাইরে পা ফেলতে পেরেছে? কথা হচ্ছে বাংলায় ইংরেজ শোষণ এবং নগর কলকাতার কোম্পানির কোষাগারে অর্থ জমা হয়ে সমুদ্রপথে বিলেত পৌঁছে ফুলে-ফেঁপে ওঠা, সঙ্গে নগর কলকাতাও। ঢাকা শহরও এর থেকে বাদ যায় না। পূর্ববঙ্গের কৃষকের জমাট রক্তে তৈরি মুদ্রা পৌঁছে যেত ঢাকায় বসবাসকারী জমিদারদের সিন্দুকে। সেখান থেকে রাজধানী কলকাতায়। সে অর্থের একাংশের ভাগীদার ঢাকার ওই জমিদার শ্রেণি।

ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমের কাজ ছিল কৃষকের করের টাকা যেন জলদস্যুদের লুণ্ঠন থেকে নিরাপদে কলকাতার কোষাগারে পৌঁছে, তার দেখভাল করা। নীলকর অত্যাচারী এক সাহেবকে জেলে ঢুকিয়ে দিলে বঙ্কিমকে বদলি করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বাংলাদেশের খুলনায় সুন্দরবন অঞ্চল দিয়ে নৌপথে করের অর্থ বহন করা নৌকাকে জলদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা করার কাজে। সেই নির্জন অরণ্য এবং সমুদ্র পরিবেশেই বঙ্কিমের হাতে রচিত হয় কপালকুণ্ডলা। অবশ্য কল্পনার পথ খুলনার সুন্দরবনেই আটকে থাকেনি, মেদিনীপুরের সমুদ্র উপকূল ও অরণ্যভূমি ছুঁয়ে যান বঙ্কিম। বঙ্কিমের উপন্যাসের আড়ালে রয়েছে বাংলার নগরবিন্যাস। সারা দেশের ঔপনিবেশিক শোষণের ঘাঁটি যে নগর তার মধ্যে পূর্ববঙ্গের ঢাকাও অন্যতম। পুরাতন ঢাকার বুড়িগঙ্গা তীরের দিকে তাকালে চোখে পড়বে ঔপনিবেশিক স্মৃতি। নগরবাড়ি থেকে শুরু করে ফরাশগঞ্জ তীরবর্তী ভগ্নদশাপ্রাপ্ত অসংখ্য জমিদারদের অট্টালিকা তো সেই স্মৃতিবাহী। পরিত্যক্ত এই অট্টালিকাগুলো নগর ঢাকার ঐতিহাসিক স্মৃতি মাত্র, গৌরবের নয়। এই নবাব-জমিদাররাই বাংলার কৃষকের রক্তমাখা রুপার টাকার বস্তা রাজধানী কলকাতার কোম্পানির কোষাগারে পৌঁছে দিত। ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিম (অবশ্যই লেখক বঙ্কিম নন) সেই রুপার মুদ্রার পথচলার ছিলেন পাহারাদার। অবশ্য এই কাজটি দীর্ঘদিন করতে হয়নি বঙ্কিমচন্দ্রকে। অচিরেই তিনি ফিরে যান আদালতের বিচারকের আসনে। কলকাতার মতো ঢাকা শহরের শরীরেও কলঙ্কের দাগ রয়েছে। এটা অস্বীকার করার নয়। কিন্তু সেটি ছোট দাগ। ঢাকা ছিল পান্থ-পথিকের দীর্ঘ পথচলার মাঝখানে ক্ষণস্থায়ী আশ্রয়ের পান্থশালা। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে কোনোকালেই ঢাকা কোনো শাসকের আগ্রহ ছিল না। এমনকি নিকটবর্তী ভাওয়ালের রাজবংশেরও। গজারি বনঘেরা জয়দেবপুরেই তারা প্রাসাদ নির্মাণ করেন। এমনকি তাদের পূর্ববর্তী শাসক গাজী বংশেরও। অন্যদিকে ইতিহাস তো কত সাক্ষ্য বহন করে। নবাব আলীবর্দী খাঁ কিশোর সিরাজ-উদ-দৌলাকে ঢাকার দেওয়ান রাজবল্লভের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু ঘসিটি বেগমের মন্ত্রণায় পড়ে সিরাজ অচিরেই ফিরে গেলেন মুর্শিদাবাদে। ঢাকা কেন তার মন ভরল না, কেনইবা আলীবর্দী পরিবার বিচ্ছিন্ন করে সিরাজকে ঢাকা পাঠালেন রাজবল্লভের অভিভাবকত্বেএর কোনো কারণ ইতিহাসে নেই।

উপনিবেশ যুগে ঢাকা হতে পারত পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক রাজধানী। হলো না। চর্চার কাঠামোও গড়ে উঠল না। বরং পূর্ববঙ্গ থেকে মেধাবীদের, চিন্তকদের টেনে নিয়ে গেল রাজধানী কলকাতা। বিকল্প হিসেবে সেকালে চট্টগ্রাম হতে পারত বাঙালির অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক রাজধানী। তাও হলো না। অনেক কারণ রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে চট্টগ্রাম চিরকালই হয়ে রইল বাংলার প্রান্তবর্তী জনপদ। তার ভূপ্রকৃতি অরণ্য-ছাওয়া এবং অসমতল পার্বত্য। যোগাযোগের জন্য স্থলপথ দুর্গম। অথচ সুলভ ছিল সমুদ্রপথ। সারা বাংলায় এমন পথ দ্বিতীয়টি নেই। প্রাচীনকাল থেকেই চট্টগ্রাম লুণ্ঠন আর রক্তাক্ত হওয়ার ইতিহাস বহন করেছে। আরাকানি দস্যুরা বিরামহীন লুণ্ঠন করেছে এই বন্দর জনপদ। পর্তুগিজ দস্যুরা পার্বত্য আর সমতলের মানুষ লুণ্ঠন করে ক্রীতদাসের বাজারে বিক্রির জন্য জাহাজ ভিড়িয়েছে এখানে। ইসলামি খিলাফত যুগে পালতোলা আরবীয় বাণিজ্য তরী চট্টগ্রামে ভিড়ত। মুঘল যুগেও এ অঞ্চলের বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল চট্টগ্রাম। মানুষ অপহরণকারী দস্যুরাই যশোর অঞ্চলের ধনাঢ্য জনৈক হিন্দু সামন্ত পরিবারের এক কিশোরকে অপহরণ করে পর্তুগিজ খ্রিস্ট ধর্মযাজকের কাছে বিক্রি করে দেয়। সেই কিশোর লালিত-পালিত এবং খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়ে চট্টগ্রামের গির্জার প্রধান যাজকের পদ লাভ করেন। তার নাম দোম আন্তেনিও রোজারিও। তিনিই প্রথম বাংলা ভাষায় গদ্য রচনা বিষয়ে বই লেখেন। বইটি ছাপা হয় পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে। সেই চট্টগ্রাম পরে ঔপনিবেশিক যুগেও হতে পারল না বাঙালির প্রধান বাণিজ্যভূমি, পারল না হতে সাংস্কৃতিক ভূমি। সেই স্থান দখল করল কলকাতা। কেন এমন হলো? হলো এই কারণে যে উপনিবেশ যুগে কলকাতা হলো ভারতবর্ষের রাজধানী।

গভীর বঞ্চনার শিকার নগর ঢাকার কাল শুধু গড়িয়ে চলে। সমুদ্র-বঞ্চনার শিকার ঢাকা কি হাজার বছরের বহুস্তরীয় বঞ্চনার পাথরকঠিন কাল পেছনে ফেলে একাত্তর-উত্তর স্বাধীনতার ভেতর দিয়ে তার অসীম বঞ্চনাকে পুষিয়ে নিতে পারবে? স্মৃতিতে হয়তো থাকবে তার বৃহৎ অতলান্তিক সমুদ্র-বঞ্চনা। সে তো বিদ্রোহ-শূন্য অতিক্ষুদ্র বুড়িগঙ্গা নদীবিধৌত। ভাগ্যবতী ছিল কলকাতা (যদিও এখন পোড়া কপাল)। বৃহৎ গঙ্গা নদীবিধৌত নগর কলকাতা। হাত বাড়ালেই অনন্তপ্রসারী বঙ্গোপসাগর।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক