গৃহযুদ্ধের ‘আন্তরিক দার্শনিক রম্য’ পেল বুকার

সাহিত্যে এবারের বুকার পুরস্কারটি পেয়েছেন শ্রীলঙ্কান লেখক শেহান করুনাতিলকা। ইংরেজি ভাষায় লিখিত তার বিদ্রƒপাত্মক উপন্যাস ‘দ্য সেভেন মুনস অব মালি আলমেইদা’র জন্য তাকে এবারের বুকার পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এটি লেখকের দ্বিতীয় উপন্যাস। উপন্যাসটিতে শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের সময় ১৯৮৯ সালে নিহত এক ফটোগ্রাফারের মৃত্যুর পরের জীবনের করুণ-হাস্যরসাত্মক গল্প বলা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধের ভয়াবহতাও তুলে ধরেছেন ঔপন্যাসিক।

এতে লেখক দেখান যে, সেই ফটোগ্রাফার মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে জেগে উঠে নিজেকে এক স্বর্গীয় ভিসা অফিসে আবিষ্কার করেন। এর আগে পৃথিবীতে তাকে হত্যা করে তার মৃতদেহটি কেটে টুকরো টুকরো করে মধ্য কলম্বোর বেইরা লেকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। তিনি জানেন না কে তাকে হত্যা করেছে। এখন তার কাছে সাতটি চাঁদ আছে যেগুলোর মাধ্যমে তিনি তার সবচেয়ে কাছের মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন এবং তার তোলা গৃহযুদ্ধের নৃশংসতার ছবিগুলো কোথায় লুকানো আছে তাদের সেই খবর দিতে পারবেন। ছবিগুলো প্রকাশ্যে এলে শ্রীলঙ্কাসহ পুরো বিশ্বেই তোলপাড় পড়ে যাবে। ফটোগ্রাফারের নিজেরও অনেক সমস্যা দেখান লেখক। তিনি একজন জুয়াড়ি, একজন গোপন সমকামী এবং তার খুনি কে সে সম্পর্কেও তার কোনো ধারণাই নেই। নিজের হত্যার রহস্য সমাধানের চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি যখন সময়ের বিপরীত দিকে চলা শুরু করেন, তখন যা বেরিয়ে আসে তা হলো এক বিশৃঙ্খল দেশের একটি ব্যঙ্গাত্মক গল্প, যে দেশটি সহিংসতায় ছিন্নভিন্ন; তবে, আলমেইদার মতো লোকদের প্রতিশ্রুতিপরায়ণতার ফলে ক্ষতবিক্ষত দেহ নিয়েও কোনোমতে টিকে আছে দেশটি।

বুকার পুরস্কারের বিচারকরা বলেন, বইটিকে যা আলাদা করেছে তা হলো ‘এর বিষয়বস্তুর উচ্চাকাক্সক্ষা এবং এর বর্ণনামূলক কৌশলগুলোর হাস্যরসাত্মক এবং কৌতুককর সাহসিকতা এবং ঔদ্ধত্য’। দ্য গার্ডিয়ানের রিভিউতে তোমিওয়া ওওলাদে বলেন, ‘এর দৃশ্যকল্পগুলো হয়তো হাস্যকর লাগবে। কিন্তু তা এমনই বিদ্রুপ এবং করুণ রসের সঙ্গে হাজির করা হয়েছে যে, তা পাঠককে গভীরভাবে নাড়া দেবে। করুনাতিলকা তার দেশের ইতিহাসের এক ভয়ংকর সময়কালের প্রতি শৈল্পিক ন্যায়বিচার করতে পেরেছেন’। এই বছরের বুকার পুরস্কারের প্রধান বিচারক নীল ম্যাকগ্রেগর বলেন, উপন্যাসটি বেছে নেওয়ার কারণ হলো ‘এটি এমন একটি বই যা পাঠককে জীবন এবং মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এক রোলারকোস্টার যাত্রায় নিয়ে যায় এবং এমন জায়গায় পৌঁছে দেয়, যাকে লেখক বিশ্বের অন্ধকার হৃদয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এবং সেখানে পাঠক তাদের বিস্ময়, আনন্দ, কোমলতা, ভালোবাসা এবং আনুগত্য খুঁজে পায়।’

নিল ম্যাকগ্রেগর বলেন, ‘এটি একটি অধিবিদ্যক থ্রিলার, একটি মৃত্যু পরবর্তী জীবনের যাত্রা, যা শুধুমাত্র ভিন্ন ঘরানার নয় বরং জীবন এবং মৃত্যু, দেহ এবং আত্মা, পূর্ব এবং পশ্চিমের সীমানাকে বিলীন করে দেয়। এটি পুরোপুরি আন্তরিক একটি দার্শনিক রম্য যা পাঠককে কল্পনায় ‘বিশ্বের অন্ধকার হৃদয়’ তথা শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহ বাস্তবতায় নিয়ে যায়। যেখানে গিয়ে পাঠক কোমলতা এবং সৌন্দর্য, প্রেম এবং আনুগত্য এবং এমন একটি আদর্শের সন্ধান করবেন, যা প্রতিটি স্বতন্ত্র ব্যক্তি মানুষের জীবনকে ন্যায্যতা দেয়।’ বিচারক প্যানেলে গ্রেগরের সঙ্গে আরও ছিলেন অ্যাকাডেমিক ও সম্প্রচারক শাহিদা বারি, ইতিহাসবিদ হেলেন ক্যাস্টর, ঔপন্যাসিক ও সমালোচক এম জন হ্যারিসন এবং ঔপন্যাসিক, কবি ও অধ্যাপক অ্যালাইন মাবানকো। বিচারকরা সবাই করুণাতিলকাকে পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হয়েছিলেন।

করুণাতিলকা দ্বিতীয় শ্রীলঙ্কান-বংশোদ্ভূত ইংরেজি সাহিত্যিক হিসেবে বুকার পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৯২ সালে প্রথম শ্রীলঙ্কান হিসেবে বুকার জিতেছিলেন মাইকেল ওন্ডাতজে, তার উপনাস ‘দ্য ইংলিশ পেশেন্ট’ এর জন্য। ১৯৭৫ সালে শ্রীলঙ্কার গ্যালেতে জন্ম নেওয়া করুণাতিলকা বেড়ে উঠেছেন কলম্বোতে। তার প্রথম উপন্যাস ‘চায়নাম্যান : দ্য লিজেন্ড অফ প্রদীপ ম্যাথিও’ কমনওয়েলথ বুক (২০১২), ডিএসএল (২০১২) এবং গ্র্যাশিয়েন পুরস্কার জিতেছিল। তিনি রক সংগীত এবং চিত্রনাট্যও লিখেছেন। তার প্রথম উপন্যাসটিকে সর্বকালের সর্বসেরা ক্রিকেট বিষয়ক উপন্যাস হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তার পরবর্তী বই ছোটগল্পের সংগ্রহ ‘দ্য বার্থ লটারি অ্যান্ড আদার সারপ্রাইজেস’ ২০২৩ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত হবে।

শ্রীলঙ্কার ওয়াটার স্টোনের ফিকশন বিভাগের প্রধান বি কারভালহো এই উপন্যাসকে ‘দুর্দান্ত উদ্ভাবনী উপন্যাস’ হিসেবে আখায়িত করেছিলেন। তিনি জানান, তিনি এবং তার সহকর্মীরা এটি বুকার পুরস্কার জেতায় বেশ আনন্দিত হয়েছেন। উপন্যাসটির মূল্যায়নে তিনি বলেন, ‘এটি কল্পনা এবং প্রজ্ঞার মিশেলের এক সফল মহাকাব্য, যাতে বিদ্রুপ ও করুণ রস এবং সাহসিকতার সঙ্গে আমাদের ইতিহাসের এক অন্ধকার সময়কালের বাস্তবতার উদঘাটন করা হয়েছে।’

বর্তমানে শ্রীলঙ্কায় বসবাসকারী করুণাতিলকা তিনটি শিশুতোষ বইও লিখেছেন। তিনি বিজ্ঞাপনের কপিরাইটার হিসেবেও কাজ করেছেন এবং সিঙ্গাপুর, লন্ডন, কলম্বো, সিডনি এবং আমস্টারডামসহ এশিয়ান এবং ইউরোপীয় বাজারে তার ২০ বছরেরও বেশি কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্কয়ার নামে একটি ব্যান্ডের গিটারিস্ট ছিলেন। তার ওয়েবসাইটে লেককের পরিচিতি সম্পর্কে লেখা আছে, ‘পাঞ্চলাইন, ম্যানিফেস্টো এবং কল-টু-অ্যাকশনের জন্য বুকারের শর্টলিস্টে স্থান পাওয়া লেখক; ব্যর্থ ক্রিকেটার, ব্যর্থ রকস্টার, ব্যর্থ নিরামিষাশী। মানুষ, মেশিন এবং বাজারের পর্যবেক্ষক। সেমিকোলন ব্যবহার করতে জানে না; এবং কারও সাহায্য ছাড়া ডায়রিয়া বানান করতেও অক্ষম।’

কয়েক সপ্তাহ আগে বুকার ওয়েবসাইটকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে করুণাতিলকা জানান, ২০১৪ সালে তিনি তার এই উপন্যাস লিখতে শুরু করেছিলেন। তার দেশে ৩০ বছর ধরে চলমান গৃহযুদ্ধ ২০০৯ সালে শেষ হওয়ার পর কীভাবে এই উপন্যাসের গল্পের ধারণাটি তার মাথায় এসেছে সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তখন গৃহযুদ্ধে কতজন বেসামরিক নাগরিক মারা গিয়েছিল এবং এর জন্য কার দোষ ছিল তা নিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ বিতর্ক চলছিল, কিন্তু আমি বর্তমান নিয়ে লিখতে যথেষ্ট সাহসী ছিলাম না, তাই আমি ২০ বছর পেছনে, ১৯৮৯ সালের অন্ধকার দিনগুলোতে চলে গেলাম।’

লেখক আরও জানান, তিনি উপন্যাসটি লেখার জন্য বৌদ্ধধর্ম এবং অন্য প্রাচ্য ধর্মগুলো থেকে মৃত্যু-পরবর্তী জীবন সম্পর্কে ধারণা ধার করেছেন। তিনি বলেন, ‘উপন্যাসটিতে মৃত্যু-পরবর্তী জীবনকে একটি ভিসা অফিস হিসেবে এবং এমন একটি সরকারি আমলাতন্ত্র হিসেবে দেখেছি যারা তাদের চারপাশে আত্মা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কিন্তু তারা জানেন না তারা কোথায় যাবেন।’

পুরস্কার গ্রহণ করার সময় করুণাতিলকা বলেন, ‘আমি আপনাদের জন্যই এই বইগুলো লিখি। আসুন এই গল্পগুলো শেয়ার করে নেওয়া যাক।’ তিনি বলেন, আমার আশা অদূর ভবিষ্যতে, হয়তো ১০ বছর পরে বা যতটা সময় লাগে, এই উপন্যাসটি এমন এক শ্রীলঙ্কায় পড়া হবে, যারা বুঝতে পেরেছে যে, দুর্নীতি এবং জাতিগত বিভেদ, প্রলোভন এবং স্বজনপ্রীতি জয়ী হতে পারেনি এবং কখনই পারবে না। এবং এমন এক শ্রীলঙ্কায় পড়া হবে যে, তার অতীতের গল্প থেকে শিক্ষা নেয়। আর ভবিষ্যতে উপন্যাসটি বইয়ের দোকানের ফ্যান্টাসি বিভাগে থাকবে, যাকে বাস্তববাদ এবং রাজনৈতিক ব্যঙ্গ বলে ভুল করা হবে না।’

১৯৮৯ সালে করুণাতিলকা ছিলেন কিশোর বয়সী। তা ছিল এমন একটি সময়কাল যাকে তিনি ‘আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার সময়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন; শ্রীলঙ্কায় যখন একাধিক ফ্রন্টে সংঘাত চলছিল জাতিসংঘের বাহিনী ও তামিল টাইগারদের মধ্যে এবং সরকার ও অসন্তুষ্ট শ্রমিক এবং ছাত্রদের মধ্যে। করুণাতিলকা বলেন, ‘এক সঙ্গে দুটো যুদ্ধ চলছে এমন এক সময়ে একজন কিশোরের জন্য স্কুলে যাওয়া বেশ কঠিন কাজ ছিল।’ তিনি বলেন, ১৯৮৩-২০০৯ সালের শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ ছিল তার স্মৃতিতে সবচেয়ে অন্ধকার সময়। ওই সময়ে তার দেশে একই সঙ্গে ‘একটি জাতিগত যুদ্ধ, একটি মার্কসবাদী বিদ্রোহ, বিদেশি সামরিক উপস্থিতি এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবিরোধী একটি স্কোয়াডের উপস্থিতি ছিল।’

এবারের বুকার পুরস্কারের জন্য সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পাওয়া অন্য বইগুলো হলো লেখক নোভায়োলেট বুলাওয়ের ‘গ্লোরি’, পার্সিভাল এভারেটের ‘দ্য ট্রিস’, অ্যালান গার্নারের ‘ট্র্যাকল ওয়াকার’, ক্লেয়ার কিগানের ‘স্মল থিংস লাইক দিস!’ এবং এলিজাবেথ স্ট্রাউটের ‘ওহ উইলিয়াম!’

ম্যাকগ্রেগর বলেন, যদিও সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পাওয়া ছয়টি বই পরস্পর থেকে একেবারেই আলাদা ছিল, তথাপি ‘এটা স্পষ্ট যে, সবগুলো উপন্যাসই আসলে একটি প্রশ্ন নিয়ে এবং তা হলো ‘একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি মানুষের বা একটি স্বতন্ত্র বক্তিজীবনের গুরুত্ব আসলে কী?’

লেখক: সাংবাদিক ও লেখক

jr.tareq@gmail.com