চিনির সংকট সমাধানের প্রতিশ্রুতি মিলমালিকদের

চাল-আটাসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের মতো অস্থির হয়ে উঠেছে দেশের চিনির বাজারও। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা, যা স্মরণকালের সর্বোচ্চ। সরকার দাম ঠিক করে দেওয়ার পরও তিন থেকে চার দিনের ভেতরে চিনির দাম কেজিপ্রতি ১৫-২০ টাকা বাড়ায় চরম ক্ষুব্ধ ক্রেতারা। তারা বলছেন, কারসাজির মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন চিনি পরিশোধনের বেসরকারি মিলমালিকরা। এমন পরিস্থিতিতে আজ মঙ্গলবার থেকে বাজারে চিনির সরবরাহ স্বাভাবিক করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বেসরকারি মিলমালিক ও চিনি ব্যবসায়ীরা। গতকাল সোমবার জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে মিলমালিক এবং পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের মতবিনিময় সভায় তারা এই প্রতিশ্রুতি দেন।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অভিযানের পাশাপাশি কারসাজির মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে কয়েকটি সুগার মিলকে তলব করার পর এমন প্রতিশ্রুতি দিলেন মিলমালিকরা।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) এ. এইচ. এম. সফিকুজ্জামানের সভাপতিত্বে গতকালের সভায় মিলমালিকরা বলেন, দেশের মোট চাহিদার বিপরীতে আরও তিন মাসের অপরিশোধিত চিনি মজুদ রয়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ না থাকায় চিনি পরিশোধন করতে পারেনি মিলগুলো।

সভার শুরুতে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। এতে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে র-সুগারের (অপরিশোধিত চিনি) কোনো ঘাটতি নেই। যে পরিমাণ চিনি মজুদ রয়েছে তাতে তিন-চার মাসের চাহিদা পূরণ সম্ভব।

কমিশনের উপপরিচালক মাহমুদুল হাসান প্রতিবেদনটি তুলে ধরে বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনায় গত রবিবার পর্যন্ত (২৩ অক্টোবর) তথ্য নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। সেখানে আমরা দেখেছি, দেশে চিনির চাহিদা ১৮-২০ লাখ টন। এর মধ্যে এখন সরকারি মিলে আখ থেকে উৎপাদন হচ্ছে ৩০-৩২ হাজার টন। বাকিটা আমদানি করা র-সুগার থেকে পরিশোধন করে বেসরকারি কোম্পানিগুলো সরবরাহ করে। অর্থাৎ চিনির বাজার ৯৫ শতাংশের বেশি তাদের নিয়ন্ত্রণে।’ তিনি জানান, গত রবিবার পর্যন্ত বেসরকারি চিনি কারখানাগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিটি গ্রুপের মিলে এখন পর্যন্ত অপরিশোধিত ৩৮ হাজার টন চিনি মজুদ রয়েছে। এছাড়া পাইপলাইনে আছে আরও ৬১ হাজার টন। মেঘনা গ্রুপে ২৩ হাজার টন অপরিশোধিত মজুদ ও পাইপলাইনে আছে ৫৫ হাজার টন। একইভাবে এস আলম গ্রুপের কাছে ৬৬ হাজার টন মজুদ এবং ১ লাখ ১০ হাজার টন পাইপলাইনে আছে। আব্দুল মোনেম সুগার রিফাইনারির কাছে মজুদ ২২ হাজার টন, পাইপলাইনে ৫০ হাজার টন এবং দেশবন্ধুর কাছে ৪ হাজার টন এবং ৫৫ হাজার টন পাইপলাইনে রয়েছে। অর্থাৎ দেশে এখন ১ লাখ ৫৪ হাজার টন অপরিশোধিত চিনি মজুদ রয়েছে। এছাড়া ২ লাখ ২১ হাজার টনের মতো আমদানির চিনি পাইপলাইনে রয়েছে। অর্থাৎ মজুদ চিনি দিয়ে ৩৫ থেকে ৪০ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব। আর পাইপলাইনের চিনি হিসাবে নিলে তিন মাসের বেশি সময় খাওয়া যাবে।

এ সময় ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘এমন পরিস্থিতির পরও চিনি নিয়ে মহাসংকট হয়েছে। এর আগে ভোজ্য তেল নিয়েও এমন করা হয়েছিল। পরে সেখানে কারসাজি ছিল, সেটার প্রমাণ পেয়েছি। চিনির ক্ষেত্রেও কিছু সমস্যা হতে পারে, সেটা দেখছি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে ৯০ টাকার চিনি রাতারাতি ২০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা গত তিন দিন বাজারে অভিযান পরিচালনা করেছি। খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। খচুরা বিক্রেতারা বলছেন, তারা চিনি পাচ্ছেন না। কিন্তু আদতে তারা ঠিকই বেশি দামে বিক্রি করছেন। পাইকারি ব্যবসায়ীরাও বলছেন মিলগুলো তাদের চিনি দেয় না। কিন্তু তারা যে চিনি বিক্রি করছে তাতে তাদের কোনো ভাউচার নেই। তাহলে নিশ্চয়ই অনৈতিকভাবে বেশি দামে কেনাবেচা হচ্ছে।’

চিনি উৎপাদনে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা তুলে ধরে সফিউজ্জামান বলেন, ‘দেশে প্রতিদিন চিনির চাহিদা ৫ হাজার টন। বড় একটি গ্রুপ একাই প্রতিদিন এ পরিমাণ চিনি পরিশোধন করতে পারে। এমন ৫টি কোম্পানি রয়েছে চিনির বাজারে। তারপরও তারা কেন পারছেন না? চিনির সংকট কেন হলো?’

ভোক্তা অধিকার মহাপরিচালকের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে রিফাইনারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সুগার রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব এবং দেশবন্ধু সুগার রিফাইনার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম রহমান বলেন, ‘আমরা একে আপরের সঙ্গে ব্লেম গেইম খেলছি। আমরা যদি এটাকে বিশ্লেষণ করি, তাহলে সবাইকে দায়ভার নেওয়া উচিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সরকারের বিভিন্ন মহলে কথা বলেছি। ফলে আমাদের যেগুলো সমস্যা ছিল, সেটা এখন সমাধান হচ্ছে। রাত থেকে মিলগুলোর সাপ্লাই স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তারপর যদি কেউ চিনি না পান তবে আমাদের বলবেন, আমরা ব্যবস্থা করে দেব। যেখানে চিনি নেই বলবেন, সরকার নির্ধারিত দামে দিয়ে দেব। সমস্যা আর হবে না।’

চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না জানিয়ে গোলাম রহমান বলেন, ‘আমাদের গ্যাসের সমস্যা আছে, র-সুগারের দাম এই মুহূর্তে ৫০০ ডলারের ওপরে। আমাদের ডিউটি বেশি, এক কেজিতে ৩১-৩২ টাকা দিতে হয়। এখন ডলারের দাম বেশি, ৮৫ টাকার ডলার কিনছি ১০৫ টাকায়। অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালুও বেড়েছে। সেগুলোর দিকে সরকার দৃষ্টি দেবে, সেটা আমাদের জানিয়েছে। সেগুলো সমাধান হলে ভবিষ্যতেও আর সমস্যা হবে না।’

সভায় এস আলম গ্রুপের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার কাজী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘কিছু মিলে সমস্যা হলেও আমাদের তরফ থেকে কিন্তু এতদিন শতভাগ সরবরাহ দিয়েছি। আমরা লাকি যে, চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহে তেমন সমস্যা হয়নি। সেজন্য আমরা কোনোভাবে সরকার নির্ধারিত দামের বেশি বিক্রি করছি না।’

সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, ‘আমরা চাই সবাই পর্যাপ্ত পণ্য পাক। সমস্যা হয়েছে, সেটা এখন কথা বলে সমাধান হচ্ছে। ডিইটি কমানো হলে সেটা আরও ভালো হবে। কারণ প্রতিটি ক্রেতাকে ৩২ টাকা চিনিতে ডিউটি দিতে হচ্ছে। এটা চিনির দাম অনেক বাড়িয়ে দিচ্ছে।’

সার্বিক বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সফিকুজ্জামান বলেন, ‘গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না তা নয়। আপনাদের যে গ্যাসের চাপ প্রয়োজন সেটা সব সময় নেই। আমরা এ নিয়ে কাজ শুরু করেছি। আর গ্যাস নিয়ে সমস্যা হবে না। আলাদা করেই সরকারের গ্যাস সরবরাহকারীদের সঙ্গে কথা বলব।’

কারসাজির অভিযোগে দেশবন্ধুকে তলব : কারসাজির মাধ্যমে চিনির বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং মিলগেটে পণ্যের মূল্যতালিকা প্রদর্শন না করার অভিযোগে দেশবন্ধু সুগার মিলস লিমিটেডকে তলব করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সকালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে লিখিত জবাব দেয় প্রতিষ্ঠানটি। এতে সমস্যাগুলো দ্রুত সংশোধন করা হবে বলে অঙ্গীকার করেছে দেশবন্ধু সুগার মিলস। যদি সংশোধন না হয় পরবর্তী সময়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেয় অধিদপ্তর।