ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের অগ্রভাগ বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হেনেছে গতকাল সোমবার সন্ধ্যা ৬টায়। এর সঙ্গে সঙ্গেই প্রবল ঝড়ো বাতাস ও বৃষ্টি শুরু হয়। মধ্যরাতে বরিশাল ও চট্টগ্রামের উপকূল অতিক্রম করে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ভোলার দৌলতখানে গাছ পড়ে বিবি খাদিজা (৮০) ও নড়াইলে আরও একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘূর্ণিঝড়ের দুর্যোগ মোকাবিলায় কর্মকর্তাদের সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ এবং দলীয় নেতাকর্মীদের দুর্যোগের কবলে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। সিত্রাংয়ের কারণে গতকাল বেলা ৩টা থেকে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠানামা বন্ধ রাখা হয়েছে। স্থগিত করা হয় জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের আজ মঙ্গলবারের পরীক্ষা।
ভোলার দৌলতখান সংবাদদাতা জানান, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে গাছ পড়ে বিবি খাদিজা নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। তিনি দৌলতখান পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের গোলাম মোস্তফার স্ত্রী। বৃদ্ধার ছেলে জামাল জানান, সন্ধ্যা ৭টার দিকে নিজ ঘরের ওপর গাছ পড়লে তিনি এর নিচে চাপা পড়েন। স্বজনরা উদ্ধার করে দৌলতখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নড়াইল সংবাদদাতা জানান, ঝড়ো হাওয়ায় গাছের ডাল ভেঙে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলায় মর্জিনা বেগম (৪০) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল দুপুরে উপজেলা পরিষদ চত্বরে এ ঘটনা ঘটে। নিহত মর্জিনা বাগেরহাট সদর উপজেলার অর্জনবাহার গ্রামের বাসিন্দা। তিনি গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন। স্থানীয়দের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, দুপুর ১২টার দিকে উপজেলা পরিষদ চত্বর দিয়ে যাওয়ার সময় পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের সামনে পৌঁছলে একটি মেহগনি গাছের ডাল ভেঙে তার মাথায় পড়ে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। লোকজন তাকে লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি জানান, গতকাল সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়ে ঝড়টি মধ্যরাতের মধ্যে মেঘনা মোহনা দিয়ে উপকূল অতিক্রম করেছে। ঘূর্ণিঝড় ও অমাবস্যার প্রভাবে সাগরে স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ থেকে ১০ ফুট বেশি জোয়ার বেড়ে যায়। তবে বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা এলাকায় বেশি এবং উপকূলের অন্যান্য এলাকায় তুলনামূলকভাবে কম জোয়ার দেখা গেছে। এদিকে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিতে থাকা প্রায় ১০ লাখ মানুষকে সরিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেশের বন্দরগুলো থেকে জাহাজ সরিয়ে গভীর সমুদ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
গতকাল রাত ৮টায় ঢাকা আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, সন্ধ্যায় ঝড়টি উপকূলে আঘাত হানতে শুরু করে। সিত্রাংয়ের কারণে মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৭ নম্বর বিপদসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরিশাল, ঝালকাঠি, ভোলা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরগুনা, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর ও নোয়াখালী জেলা এবং ওই এলাকার দ্বীপ ও চরগুলোকেও ৭ নম্বর বিপদসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর ও কক্সবাজার উপকূল এবং সেখানকার চর ও দ্বীপগুলোকে ৬ নম্বর বিপদসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে জানান, ভোরের দিকে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব ক্রমেই কমে যাবে। তবে এর প্রভাবে দেশের উপকূলে এবং অন্যান্য অঞ্চলেও কাল (মঙ্গলবার) বৃষ্টি হতে পারে।
গতকাল বিকেলের পর থেকে ঘূর্ণিঝড়ের অগ্রভাগ উপকূল অতিক্রম করতে শুরু করে। এর প্রভাবে উপকূলে বৃষ্টিপাত ও ঝড়ো হাওয়া শুরু হয়। এ বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রের আবহাওয়াবিদ এসএম কামরুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সন্ধ্যার পর থেকে বাতাস ও বৃষ্টিপাত শুরু হয়। তবে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের নিচু এলাকাগুলোতে জোয়ারের উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত হতে পারে।’
এদিকে ঝড়ের প্রভাবে চট্টগ্রামসহ দেশের উপকূলীয় এলাকায় বাতাস ও বৃষ্টিপাত বইছিল সন্ধ্যা থেকে। তবে এ বাতাসে কোথাও কোনো ক্ষয়ক্ষতির সংবাদ পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া উপকূলীয় এলাকায় জোয়ার বাড়লেও লোকালয়ে জলোচ্ছ্বাস প্রবেশের খবর পাওয়া যায়নি। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র, ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি) এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন, উপকূলের ১৩ জেলার জেলা প্রশাসকরা কাজ করছেন। এদিকে ঘূর্ণিঝড়ের মাঠপর্যায়ের অবস্থা জানতে কথা হয় সিপিপি পরিচালক আহমাদুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘রাত ৮টা পর্যন্ত সাত হাজার আশ্রয় কেন্দ্রে ছয় লাখ মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। মধ্যরাতে তা ১০ লাখে উন্নীত হতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ৭০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক ঝুঁকিতে থাকা উপকূলের মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে আনতে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করছে।’
উপকূলে জোয়ারের উচ্চতা কেমন রয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মাঠপর্যায় থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে জানা যায়, ৮ থেকে ১০ ফুট উচ্চতার সামুদ্রিক ঢেউ উপকূলে আছড়ে পড়ছে। তবে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত কোথাও কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাইনি।’
ঝড়ের অগ্রগতি জানতে গতকাল রাত ৯টায় কথা হয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপপরিচালক সানাউল হক ম-লের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ঝড়টি ভোররাতের মধ্যে উপকূল অতিক্রম করার কথা। তবে এর প্রভাবে ইতিমধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে বরিশালে ২৬০ মিলিমিটার, পটুয়াখালীতে ২৫৩, ভোলায় ২৪৪, খেপুপাড়ায় ২২৪, মোংলায় ২১৯ ও ঢাকায় ১২৪ মিলিমিটার।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলের বেশিরভাগ এলাকা জোয়ারে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সঙ্গে ভারী বৃষ্টি যুক্ত হতে পারে। উপকূলের সবকটি জেলায় স্বল্পস্থায়ী বন্যা হতে পারে। ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কায় দেশের উপকূলের ১৫টি জেলার নদীবন্দরগুলোকে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
এর আগে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে উপকূলের অন্তত ১৩টি জেলা বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান। এসব জেলার মধ্যে রয়েছে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরগুনা, ঝালকাঠি, ভোলা, পটুয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী ও বরিশাল।
ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে জাহাজশূন্য করা হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর জেটি। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম। খোলা হয়েছে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। এদিকে গতকাল বেলা ৩টা থেকে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠানামা বন্ধ রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রামে গতকাল বিকেল থেকেই দমকা হওয়া বইছিল। সন্ধ্যা পর্যন্ত ভাটার মধ্যেও প্রবল ঢেউ দেখা গেছে। সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস। আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জোয়ারের সময় অমাবস্যার প্রভাবে পানির উচ্চতা কয়েক ফুট বেশি থাকার কথা ছিল।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের এসএম কামরুল হাসান বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়ের অগ্রভাগের প্রভাবে গতকাল বিকেল থেকেই উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টি হতে থাকে। তবে প্রধান কেন্দ্র তথা ঘূর্ণিঝড়ের চোখ মেঘনা মোহনা (বরিশাল, ভোলা) দিয়ে অতিক্রম করবে সোমবার মধ্যরাতে। এ ছাড়া পুরো ঝড়টি রাতের মধ্যেই উপকূল অতিক্রম করবে। এর প্রভাবে দেশের পুরো উপকূলীয় এলাকায় জোয়ারের উচ্চতা যেমন বাড়বে, তেমনিভাবে বৃষ্টিপাতও ঘটাবে।’
সিত্রাং উপকূলে আঘাত করেছে অমাবস্যার সময়ে। তাই উপকূলীয় এলাকায় জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব বেশি। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রের আবহাওয়াবিদ এসএম কামরুল হাসান গতকাল বিকেলে জানিয়েছেন, উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। আর এতেই উপকূলে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হবে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সন্ধ্যা পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকার পাঁচ হাজার মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। আমাদের ৫১১টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত আছে। সেগুলো পূর্ণ হলেই শুকনো খাবার ও খিচুড়ি বিতরণ শুরু হবে।
ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় আলাদা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সেবা চালু করেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ ও বন্দর কর্তৃপক্ষ। জেলায় ২৯০টি মেডিকেল টিম প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়।
এপ্রিল-মে এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম। বর্ষার বিদায় ও শীতের আগমনের পূর্বে বঙ্গোপসাগরে এমন ঝড়ের সৃষ্টি হয়ে থাকে। এ ছাড়া গ্রীষ্মের শেষ ও বর্ষার শুরুর আগেও ঘূর্ণিঝড় হয়ে থাকে। দেশে বড় ধরনের সব ঘূর্ণিঝড় এ সময়ে সৃষ্টি হয়েছিল। চলতি মাসে যে এই ঝড় সৃষ্টি হবে তা আগেই পূর্বাভাস দিয়েছিল আবহাওয়া অধিদপ্তর। এ ঝড়টি গত শুক্রবারে লঘুচাপ ও পরবর্তীকালে নিম্নচাপ ও গভীর নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার পর গত রবিবার রাতে তা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়।