ভারত ভাগের ৭৫ বছর

ভারতবর্ষের স্বাধীনতার কৃতিত্ব কি হিটলারের

[গান্ধী, জিন্নাহ কারোই নয়, বরং ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ভারত এবং পাকিস্তান সৃষ্টি মূলত হিটলারের অবদান। যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত ‘মডার্নাইজেশন অব ইসলাম অ্যান্ড দ্য ক্রিয়েশন অব দ্য মাল্টিপোলার ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ বইয়ের লেখক ডক্টর সুমিত কুমারের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাধর্মী অধ্যায় ‘হিটলার, নট গান্ধী শুড বি গিভেন ক্রেডিট ফর দ্য ইন্ডিপেন্ডেস অব ইন্ডিয়া’ ঈষৎ বিশ্লেষণসহ অনূদিত হলো। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা নিয়ে আমাদের লালিত ধারণাকে এই রচনা চ্যালেঞ্জ করে। আমাকে রচনাটি সরবরাহ করেছেন সাবেক সচিব, ১৯৫৮ ব্যাচের সিএসপি মনজুর মোর্শেদ, কৃতজ্ঞতা জানাই।]

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঔপনিবেশিক শক্তিকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে কারণ বিশ্বযুদ্ধ তাদের অর্থনৈতিক মেরুদন্ড সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দিয়েছিল। হিটলার যদিও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরপর ভারতের স্বাধীনতার জন্য আমি গান্ধীকে নয়, কৃতিত্ব প্রদান করি হিটলারকেই। হিটলার ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের অর্থনীতি এতটাই ধ্বংস করে দিয়েছিলেন যে দুদেশের পক্ষে নিজস্ব বিশাল সেনাবাহিনী লালন করা সম্ভব ছিল না, ফলে অন্যদিকে ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে ক্রম স্ফীত স্বাধীনতা আন্দোলন দমন করাও সম্ভব ছিল না। স্মরণ করা যুক্তিযুক্ত হবে যে ব্রিটেনের অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে পড়েছিল যে মার্শাল প্ল্যানের আওতায় মোট ঋণের এক-চতুর্থাংশ তাদেরই দিতে হয়েছে। ভারতে গান্ধী কিংবা অন্য কোনো ক্যারিশম্যাটিক নেতা থাকুন বা না-ই থাকুন শুধু আর্থিক মেরুদ- ভেঙে পড়ার কারণে ১৯৪৭ সালেই ব্রিটেনকে ভারত ছেড়ে যেতে হতো। তাদের অর্থনীতি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর শুধু ভারত নয়, ব্রিটেনের আরও অনেক উপনিবেশ ছেড়ে যেতে হয়েছে। ১৯৪৬ সালে জর্ডান, ১৯৪৭-এ প্যালেস্টাইন, ১৯৪৮-এ শ্রীলঙ্কা, একই বছর মিয়ানমার, ১৯৫২-তে মিসর, ১৯৫৭-তে মালয়েশিয়া। ফ্রান্সকেও একই কারণে ১৯৪৯ সালে লাওসকে ও ১৯৫৪ সালে কম্বোডিয়াকে স্বাধীনতা দিতে হয়েছে; ১৯৫৪ সালে তাদের ছেড়ে যেতে হয়েছে ভিয়েতনাম। নেদারল্যান্ডসকে ছাড়তে হয়েছে ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ, বিশেষ করে ১৯৪৯ সালে ইন্দোনেশিয়া। যদি কোনো হিটলার না থাকতেন, যদি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ না হতো তাহলে ভারত এবং অন্য আরও কিছু উপনিবেশকে স্বাধীনতার জন্য সম্ভবত আরও তিরিশ বছর বা তার চেয়েও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হতো।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরিণতিতে ভারতের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ত্বরান্বিত হয়েছে। ১৯৪২ সালের বহুল প্রচারিত ক্রিপস মিশন ছিল চার্চিল অনুমোদিত রাজনৈতিক অজুহাত ব্রিটেনের কাছ থেকে আর একটু সময় নেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঔপনিবেশিকবিরোধী অনুভূতিকে কিছুটা প্রশমিত করা।

ভারতে ব্রিটেনের যে হতাশাব্যঞ্জক পরিস্থিতি তার বিবরণ দিয়েছেন ঐতিহাসিক পি জে কেইন এবং এ জি হপকিন্স। যুদ্ধ যখন শেষ হলো ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী পদ্ধতি নিজেই উদ্দেশ্যহারা হয়ে গেল। ভদ্রলোক প্রশাসক যারা এত দিন ব্রিটিশ রাজের স্বার্থের ব্যবস্থাপক ছিলেন ক্রমবর্ধমান প্রতিকূলতার মুখে নতুনভাবে মোকাবিলা করে স্বার্থরক্ষার পথ উদ্ভাবনে আর সাহসী হলেন না। তা ছাড়া ১৯৩৯ সালের পর ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের অধিকাংশ সদস্যই ভারতীয়দের মধ্য থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত।

১৯৪৫ সালে নতুন ভাইসরয় ওয়াভেল মন্তব্য করলেন, দুর্বলতা বলি, ক্লান্তি বলি আমাদের যে হাতিয়ার তা হচ্ছে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের ব্রিটিশ উপাদান। রাজের বিরুদ্ধাচারীদের হাতে নগর পরাস্ত হয়েছে, আর গ্রামাঞ্চল নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ১৯৪৬-এ নৌবাহিনীতে একটি বিদ্রোহের কারণে সেনাবাহিনীতে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। ব্রিটেনের জন্য দুর্ভাগ্য, ওয়াভেলের মতো হতভাগা বার্তাপ্রেরক লন্ডনকে জানিয়ে ছিলেন ভারত শাসন করার শক্তি তারা হারিয়েছেন। এই শক্তিহীনতা ভারতকে স্বাধীনতার দিকে নিয়ে গেল।

কথায় বলে যুদ্ধের বিজয়ীরাই ইতিহাস রচনা করেন। ১৯৪৭ সালে ভারতীয় কংগ্রেস পার্টি সবচেয়ে বড় যে মিথগুলো চালু করল, তা তাদের দরবারি ঐতিহাসিকরা লিখলেন, ১৯৪৭-এর স্বাধীনতা এসেছে মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের কারণেভারতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে ভ্রান্তিপূর্ণ বিবৃতি হচ্ছে এটি। যদি হিটলার না থাকতেন, যদি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ না হতো তাহলে গান্ধীর আন্দোলনের বুদবুদ অচিরেই মিলিয়ে যেত আর স্বাধীনতা পেতে লেগে যেত আরও অনেক দশক। তত দিনে গান্ধী মরহুম হয়ে যেতেন এবং ইতিহাসে তার নাম লেখা থাকত সে সময়কার বহু স্বাধীনতা সৈনিকের একজন হিসেবেযেমন লেখা আছে বাল গঙ্গাধর তিলক, লাল লাজপত রায়, মোতিলাল নেহরু, দাদাভাই নওরোজি ও চিত্তরঞ্জন দাসের নাম। অহিংস আন্দোলনের যে প্রচারণা তিনি পেয়েছেন তখন তা পেতেন না।

মহাত্মা গান্ধীর মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি, হয়েছে হিটলারের মাধ্যমে যিনি ব্রিটেনকে অর্থনৈতিক দেউলিয়া অস্তিত্বে পরিণত করেছিলেন।

প্রকৃতপক্ষে ১৯৩০-এর দশকেই জনগণের মধ্যে গান্ধীর জনপ্রিয়তা বহুলাংশে কমে গিয়েছিল, কারণ বাস্তবে গান্ধীর কোনো ধারণাই ছিল না কেমন করে ভারতের স্বাধীনতা আনতে হবে। ১৯২৭ সালে মাদ্রাজ কংগ্রেসে যখন পন্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরু এবং সুভাষ চন্দ্র বসুদুজন স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা ভারতের জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণার প্রস্তাব পাস করালেন, গান্ধী তখন বিরক্ত হয়েছিলেন আর তাকে সন্তুষ্ট করতে পরের বছর ১৯২৮-এর কলকাতা কংগ্রেস মিশনে মাদ্রাজ রেজুলেশন বদলে লেখা হলো ব্রিটিশ শাসনে ভারতের জন্য ডমিনিয়ন মর্যাদা চেয়ে অনুরোধ জানানো হবে।

অসাধারণ শিক্ষাগত কৃতিত্বের অধিকারী সুভাষ চন্দ্র বসু ছিলেন মেধাবী নেতা। মাত্র ছ-মাসের প্রস্তুতি নিয়ে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের জন্য পরীক্ষায় বসে চতুর্থ স্থান অধিকার করেন। সে সময় নির্ধারিত সময়ের ব্যবধানে ব্রিটেনে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতো।

‘দ্য ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল’ গ্রন্থে বসু ১৯২১ সালে গান্ধীর সঙ্গে তার সাক্ষাতের কথা বর্ণনা করেছেন! আমি একটার পর একটা প্রশ্ন করে যাচ্ছি। প্রথম প্রশ্নের জবাবে আমি সন্তুষ্ট, দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাবে হতাশ, তৃতীয় প্রশ্নের জবাব এর চেয়ে ভালো কিছু নয়। আমার যুক্তি এটা আমার কাছে স্পষ্ট করে দিল যে মহাত্মার যদি কোনো পরিকল্পনা থেকে থাকে তাতে স্বচ্ছতার মারাত্মক অভাব রয়েছে এবং তার নিজেরেই স্বচ্ছ কোনো ধারণা নেই কেমন করে পর্যায়ক্রমে এগিয়ে ভারত তার কাক্সিক্ষত স্বাধীনতার লক্ষ্যে পৌঁছাবে।

১৯৩৮ সালে সুভাষ বসু বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। পরের বছর তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন ব্রিটিশদের ছয় মাসের সময় দিয়ে সারা দেশে গণ-অবাধ্যতা আন্দোলন শুরু করবেন এবং কংগ্রেস পার্টির প্রেসিডেন্ট পদের জন্য পুনরায় নির্বাচন করবেন। এটা সম্পূর্ণভাবেই পূর্বানুক্রম অনুযায়ী করতে পারেন। তার আগে জওয়াহেরলাল নেহরু দুই টার্ম প্রেসিডেন্ট ছিলেন, নজির রয়েছে। কিন্তু তাতে গান্ধী সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি কংগ্রেসের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা সীতারামাইয়াকে দাঁড় করিয়ে তার সব সমর্থন ঢেলে দিলেন। তার পরও সুভাষ বসু সীতারামাইয়াকে হারিয়ে দিলেন। গান্ধী প্রকাশ্যে বললেন, সীতারামাইয়ার পরাজয় মানে তার পরাজয়। এরপর গান্ধী নির্বাহী কমিটিকে সুভাষ বসুর বিরুদ্ধে এমনভাবে ব্যবহার করতে শুরু করলেন যে সুভাষ বসু পার্টি থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। এর ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে স্বাধীনতা-সংগ্রামের জাতীয় নেতা অরবিন্দ ঘোষ কংগ্রেসত্যাগী হয়ে বিরুদ্ধে বলতে বাধ্য হলেন :

বর্তমান অবস্থায় কংগ্রেসকে ফ্যাসিস্ট সংস্থা ছাড়া আর কী বলা যায়? গান্ধী স্টালিনের মতোই একনায়ক, আমি হিটলারের মতো বলব না; গান্ধী যা বলেন, তারা তা গ্রহণ করেন এমনকি কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিও তাকে অনুসরণ করে। তারপর তা যায় অল-ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির কাছে, তারা সেটাই গ্রহণ করে, তারপর কংগ্রেস। দ্বিমত পোষণ করার সুযোগ নেই, কেবল সমাজতন্ত্রীরা একটু বলতে পারবে কিন্তু সিরিয়াসলি মতবিরোধ প্রকাশ করবে না। তারা যে প্রস্তাবই পাস করাবে, তা প্রদেশের বেলায় জুতসই হোক বা না হোক সবাইকেই মেনে নিতে হবে। স্বাধীন মতামতের কোনো জায়গা নেই। আগে থেকেই সব ঠিক করা থাকে, মানুষকে স্টালিনের পার্লামেন্টের মতো কিছু কথা বলতে দেওয়া হয়। এ কথার আসলে কোনো গুরুত্ব নেই।

(বাকি অংশ আগামীকাল দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্য) 

অনুবাদক : কথাসাহিত্যিক