‘হকির ম্যারাডোনা’ হিসেবে খ্যাত পাকিস্তানের সাবেক হকি তারকা শাহবাজ আহমেদ ফের এসেছেন বাংলাদেশে। নব্বইয়ের দশকে মোহামেডানের জার্সি গায়ে ঢাকায় মাতিয়েছেন ঘরোয়া হকি। তার নামের সঙ্গে তাই দেশের হকির একটা নস্টালজিক সম্পর্ক। এবার সেই তারকা এসেছেন হকি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি বাংলাদেশের দল মোনার্ক পদ্মার পরাামর্শক হিসেবে।
১৯৯৫ সালে প্রথম আসার ২৭ বছর পরও বাংলাদেশের হকিতে কোনো পরিবর্তন দেখেন না শাহবাজ। দেশের একটি শীর্ষ গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা জানান তিনি।
তাই হতাশা নিয়ে শাহবাজ বলেন, ‘সেই একই অবকাঠামো, একই প্রতিভা, একই পরিকল্পনায় চলছে বাংলাদেশের হকি...সবকিছু আছে আগের জায়গাতেই। বাংলাদেশের হকিতে অবকাঠামোগত কোনো উন্নতিই হয়নি। একটা মাত্র হকি স্টেডিয়াম, বিকেএসপি বাদে হকি টার্ফ নেই আর কোথাও। অথচ হকিতে উন্নতি করতে চাইলে আরও কয়েকটা টার্ফ লাগবে। তরুণদের খেলায় আকৃষ্ট করতে হবে।’
যোগ করেন, ‘আগে কামাল-সাদেক-হারুণদের মতো খেলোয়াড় ছিল। দারুণ একটা পরিবেশ ছিল তখন। ভারতের মুকেশ কুমাররা আসত খেলতে। সেই দিন গত হয়েছে। বাংলাদেশের হকি এগোতে পারেনি, কোনো বদল দেখছি না এখানকার হকিতে।’
হকির জন্য বড় বাজেটের বিকল্পও দেখেন না এই কিংবদন্তি। পাকিস্তান থেকে কার যেন ফোন আসে, সেই ফোন ধরে তারপর নিজেই বলেন, ‘গত ২০-২২ বছরে হকির জন্য কানো অর্থ ঢালা হয়নি বাংলাদেশের হকিতে। এভাবে তো হবে না। হকি উন্নয়নে অর্থ লাগবেই। অর্থ ছাড়া কিছু হবে না। আমি দেখেছি, উপমহাদেশে হকিতে প্রকৃতিগত প্রতিভা আছে। বাঙালি ছেলেরাও প্রতিভাবান। কিন্তু তাদের খেলার সুযোগ কম। ফলে অভিজ্ঞতা হয় না ছেলেদের, বড় দলের সঙ্গে খেলা হয় না। যে কারণে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে।’
বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের যেমন দেখছেন
খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস, ম্যাচ টেম্পারমেন্টের অভাব। এটা বাড়াতে হবে মনে করেন শাহবাজ, ‘ভালো কোচ, ভালো সুযোগ-সুবিধা বাড়ালে এশিয়ার সেরা চারে আসা সম্ভব বাংলাদেশের পক্ষে। কারণ, তাদের সামর্থ্য আছে মালয়েশিয়াকে হারানোর, জাপান, চীনের মতো দলকে। ভারত-পাকিস্তানের চেয়ে তারা এগিয়ে নয়, তবে ভালো ফাইট করতে পারে।’
প্রস্তাব পেলে লম্বা সময়ের জন্য বাংলাদেশের কোচ হতে অবশ্য রাজি নন শাহবাজ। তবে সংক্ষিপ্ত সময় পরামর্শক হতে আপত্তি নেই। বলেন, ‘বাংলাদেশের এমন কোচ দরকার, এখানকার সংস্কৃতির সঙ্গে যে মানিয়ে নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানি কোচ হতে পারে বাংলাদেশে জন্য ভালো কোচ।’
পরামর্শ
বাংলাদেশকে এশিয়ান পর্যায়ে ইভেন্ট করতে হবে। ছেলেরা যাতে উজ্জীবিত হয়, কিছু শিখতে পারে। আসলে অনেক কিছুই করার আছে জানিয়ে বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনকে দিলেন পরামর্শ, ‘আমি ফেডারেশনের সঙ্গে বসতে চাই। বসে তাদের এটাই বলব, হকি উন্নয়নে সরকারের সহায়তা চাইতে। সারা দেশে তো বটেই, ঢাকা শহরে ৩-৪ টার্ফ যেন করে দেয় সরকার। ছেলেদের জন্য বছরে অন্তত দুটি বিদেশ সফরের আয়োজন করতে হবে। সেটা কম খরচে মালয়েশিয়া ও চীনে হতে পারে। এটা না হলে ছেলেরা আগ্রহ হারাবে। এরপর ভারত-পাকিস্তানের সঙ্গে খেলতে হবে।’
উদাহরণ টানেন ক্রিকেটের, ‘ক্রিকেট বাংলাদেশ এখন পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে খেলে। একইভাবে হকিতেও বড় বড় দেশের সঙ্গে খেলা চাই। এসবের কোনো বিকল্প নেই। তাহলেই ওরা তৈরি হবে ভালোভাবে।’ অথচ ২০১৮ সালে জাকার্ত এশিয়াডের পর ৪০ মাস আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেনি। এটাই বাস্তবতা।
হকি খেলোয়াড়দের জন্য হোস্টেল , ডাইনিং, বিনোদন কক্ষ, টেবিল টেনিস থাকা দরকার মনে করেন শাহবাজ। যাতে অন্য শহর থেকে ছেলেরা ঢাকায় আসতে পারে, একটা হকিময় পরিবেশ তৈরি হয়। কিন্তু সত্যিটা হলো, বাংলাদেশের ঘরোয়া হকি লিগই নিয়মিত হয় না। প্রিমিয়ার লিগ, প্রথম বিভাগ হয় না ৪ বছর ধরে। এই অবস্থায় হকিময় পরিবেশ দূর কল্পনাই। তার ওপর রয়েছে সংগঠকদের অনিয়ম, দুর্নীতি।
কথায় কথায় শাহবাজ বলেন, ‘পাকিস্তানের কামার ইব্রাহিম বাংলাদেশ হকি দলের কোচ ছিল। সে গতকাল ফোন করে আমাকে বাংলাদেশের হকিতে সংগঠকদের অনিয়ম নিয়ে অনেক কথা বলেছে। সে বলেছে, সে যখন কোচ ছিল তখন দেখেছে সংগঠকেরা এখানে টাকা বানাতে চাইত। একটা জুসের দাম ১০০ টাকা হলে বলত ২০০ টাকা লিখতে। এটা শুনে তো আমি ভীষণ হতাশ হয়েছি।’