কোটি টাকার কাজে রডের বদলে তার!

হবিগঞ্জ জেলা সদরে খোয়াই নদীর পাড় ঘেঁষে কোটি টাকা ব্যয়ের ওয়াকওয়ে (পায়ে হাঁটার পথ) নির্মাণকাজে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বালু ও রডসহ নিম্নমানের বিভিন্ন সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে শহরবাসী। এমনকি ওয়াকওয়ের একটি অংশে দরপত্রের শিডিউলে উল্লিখিত রড ব্যবহার না করে জিআই তার ব্যবহার করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কোটি টাকার এই ওয়াকওয়ে নির্মাণকাজ শেষের অল্পদিনের মধ্যেই ধসে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হবিগঞ্জ শহরে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের বিপরীতে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের পেছন থেকে নিউ মুসলিম কোয়ার্টারের কালভার্ট পর্যন্ত পুরনো খোয়াই নদীর পাড়ে ওয়াকওয়ে নির্মাণের কাজ হাতে নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহানের প্রচেষ্টায় এ জন্য ১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। শহরে উন্মুক্ত স্থান দিয়ে হাঁটাচলার কোনো সুব্যবস্থা না থাকায় শহরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন এ উদ্যোগ নেয়।

পাউবো থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওয়াকওয়ে নির্মাণের জন্য গত এপ্রিল মাসে ওটিএম (উন্মুক্ত) পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়। অবশ্য খাতা-কলমে উন্মুক্ত দরপত্র হলেও হবিগঞ্জ জেলা যুবলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমেদ ছাড়া আর কোনো ঠিকাদার এ দরপত্রে অংশ নেননি। প্রকল্পটির দরপত্রের শিডিউল অনুযায়ী ৪৮০ মিটার দৈর্ঘ্যরে এই ওয়াকওয়ের সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজের মধ্যে রয়েছে ১১০ মিটার জায়গায় মাটি ভরাট, মাটি আটকাতে ১৮ ফুট লম্বা আরসিসি পিলার ড্রাইভ, পিলারের সঙ্গে ২৫ মিলি (৭ সুতা) রড দিয়ে আড়াআড়িভাবে পাঁচ ফুট বাই দুই ফুট স্ল্যাবকে জোড়া লাগানো, বসার জন্য আটটি চেয়ার, একটি গোলঘর, এসএস পাইপ দিয়ে বেড়া এবং রাস্তায় পার্কিং টালি স্থাপন।

তবে সরেজমিনে দেখা যায়, পিলারের সঙ্গে স্ল্যাবগুলোকে রডের বদলে জিআই তার দিয়ে বাঁধা হয়েছে। এর ফলে মাটি ও পানির সংস্পর্শে কিছুদিন পরেই ওই তারে মরিচা ধরে স্ল্যাব ছিঁড়ে পানিতে পড়ে যাবে বলে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন শহরের একাধিক বাসিন্দা। এ ছাড়া স্ল্যাব ও পিলারগুলো তৈরিতেও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।

এ প্রসঙ্গে ওয়াকওয়ে লাগোয়া স্টাফ কোয়ার্টার এলাকার বাসিন্দা ফারুক আহম্মেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পিলার ও স্ল্যাবে নিম্নমানের কংক্রিট, বালু, রড ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া রডের পরিবর্তে জিআই তার ব্যবহার করা হয়েছে। মাটি ও পানির সংস্পর্শে কিছুদিন পরেই পিলারের সঙ্গে তার দিয়ে বাধা স্ল্যাব ছিঁড়ে পানিতে ডুবে যাবে। এতে মাটি সরে গিয়ে কোটি টাকার ওয়াকওয়ে ধসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

নিম্নমানের কাজের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঠিকাদার তাজউদ্দিন আহমেদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে তার পক্ষে ওয়াকওয়ে নির্মাণকাজ দেখভালের দায়িত্বে থাকা জহির মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘স্ল্যাবের ছিদ্র দিয়ে রড ঢোকানো যায় না। এ জন্য তার ব্যবহার করা হচ্ছে। মাটি ভরাট করার পর তার ছিঁড়ে স্ল্যাব পড়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। আর সব নির্মাণসামগ্রীই শিডিউল অনুযায়ী ব্যবহার করা হয়েছে।’

এদিকে ওয়াকওয়ে নির্মাণকাজে অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাব ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার মিনহাজ আহমেদ শোভনও অনেকটা ঠিকাদারের প্রতিনিধির সুরে কথা বলেছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুরনো খোয়াই নদীর পানি সবসময়ই স্থির থাকে। ভরাট করা অংশের মাটি বসে গেলে ওয়াকওয়ে ধসে যাওয়ার আশঙ্কা কম। এ ছাড়া ওই ওয়াকওয়েতে যানবাহন যাতে না চলে সে ব্যবস্থা করা হবে। আশা করছি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এ কাজ শেষ হবে।’