‘তের চৌদ্দ বছরের মতো বালাই...’

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিশু-কিশোরদের নিয়ে বলেছেন, ‘তের চৌদ্দ বছরের মতো এমন বালাই আর নেই।’ সেই ‘বালাই’ বর্তমানে কতটুকু বয়সের স্বভাবে আর কতটুকু পরিস্থিতি উপজাত তা নিয়ে ভাবার অবকাশ রয়েছে। কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশে খেলা বলতে আমরা জানতাম গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা, ডাংগুলি, লাটিম, মার্বেল, হা-ডু-ডু ইত্যাদি। শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের কোলাহলে মুখর হয়ে উঠত মাঠ। সেসব খেলাধুলার কথা এখন যেন কল্পনাই করা যায় না। বর্তমানের শিশু-কিশোররা বেড়ে উঠছে বিচ্ছিন্নভাবে। পরিবার ও সমাজের মধ্যে থেকেও তারা ডিভাইসে বুঁদ হয়ে থাকছে ‘আর্টিফিশিয়াল’ বাস্তবতায়। বাসা হোক বা রেস্টুরেন্ট কিংবা পার্কে অনেক শিশুকে মোবাইল নিয়েই বসে থাকতে দেখা যায়। কোনো হুল্লোড় নেই, আশপাশে কী হচ্ছে সেটা জানার আগ্রহ নেই। আমাদের ভবিষৎ প্রজন্ম কি তাদের দুরন্ত ছেলেবেলা হারিয়ে ফেলছে?

শনিবার দেশ রূপান্তরে ‘অপরাধপ্রবণ হচ্ছে শিশু-কিশোররা’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গ্রামীণ ক্রীড়াচর্চা, উন্মুক্ত পরিসরে বিচরণ ও খেলাধুলার অভাবে শিশুদের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। শিশুরা এখন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় তাদের মানসিক বিকাশ বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। ডিভাইসনির্ভর শিশুরা হারাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগের সক্ষমতা। তাদের আপন সামাজিক বলয় বা পরিসর হারিয়ে যাচ্ছে। তারা হয়ে উঠছে একরোখা স্বভাবের। ডিভাইস আসক্তিকে শিশু-কিশোরদের অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ হিসেবে সহজেই চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু শিশু-কিশোরদের সুস্থ বিকাশে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ থেকে শুরু করে মননশীল চর্চার ক্ষেত্রগুলো নগরায়ণ ও উন্নয়নের নামে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের ২২তম ব্যাচের মাঠপর্যায়ের এক প্রতিবেদনে একটি উপজেলার ৩২ গ্রামের শিশুতোষ ৪০টি খেলার কথা বলা হয়েছে। ওই গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ‘আমাদের দেশে একসময় প্রায় এক হাজার ধরনের খেলা ছিল। অবাধে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের ব্যবহারের ফলে প্রায় ৮০ ভাগ গ্রামীণ খেলা হারিয়ে গেছে।’ এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের অধ্যাপক অনুপম হীরা ম-ল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রচার ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে প্রতিযোগিতামূলক কিছু খেলা হারিয়ে গেছে অথবা হারিয়ে যেতে বসেছে। এর পেছনে শুধু যে মোবাইল বা ইন্টারনেট দায়ী তা নয়। এর জন্য সমাজ, পরিবারের বড়রাও দায়ী। বড়রা সময় দিতে পারে না; শিশুরাও তাদের থেকে দূরে থাকতে চায়।’ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দীন আহমদ বলেন, ‘ শিশুরা ডিভাইসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যোগাযোগের ক্ষমতা হারাচ্ছে এবং মানসিকভাবে একরোখা হয়ে একটা পর্যায়ে তারা নানা অপরাধমূলক কর্মকা-ে লিপ্ত হয়ে পড়ছে।’ তিনি বলেন, ‘উত্তরণের উপায় হিসেবে দুটি রাস্তা খোলা আছে। এক. যেখানে শিশুতোষ ক্রীড়ার প্রচলন নেই সেখানে ঘরোয়াভাবে লুডু, ক্যারম কিংবা দাবা খেলার সুযোগ করে দিতে হবে। দুই. পরিবারের সদস্যরা যেন তাদের সময় দেন, যাতে তারা ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করতে নিরুৎসাহিত হয়।’

সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, আধুনিক বিশ্বের অসংগঠিত সমাজব্যবস্থায় দ্রুত শিল্পায়ন, নগরায়ণ, পরিবার কাঠামোর দ্রুত পরিবর্তন, শহর ও বস্তির ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ এবং বিরাজমান নৈরাজ্য ও হতাশা শিশু-কিশোর অপরাধ বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ। অপরিমিত অর্থপ্রাপ্তি, স্মার্টফোন, অসৎ সঙ্গ, অতিরিক্ত উচ্চাশা, পারিবারিক হতাশা, রাজনৈতিক সংস্পর্শ ও অপসংস্কৃতির ছোঁয়া কিশোর-কিশোরীদের অপরাধপ্রবণ করে তুলতে পারে। ইন্টারনেট বা তথ্যপ্রযুক্তি কোনো নিষিদ্ধ বিষয় নয়। একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইন্টারনেটে দক্ষ হতেই হবে, প্রযুক্তি জানতেই হবে। কিন্তু এর ক্ষতিকর, অযৌক্তিক, অপরিমিত ব্যবহার বা গেম খেলার বিষয়টি যখন কারোর চিন্তা আর আচরণের ওপর মন্দ প্রভাব ফেলে সেটা মারাত্মক হয়ে ওঠে। মনোবিজ্ঞানীরা ভিডিও গেমে আসক্তিকে বলছে ‘ডিজিটাল মাদক’। ২০১৫ সালের পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবমতে, বাংলাদেশে গড়ে প্রতি বছর কমপক্ষে দুই হাজার শিশুকে নানা ‘অপরাধে’ আটক করা হয়। পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, কেবল ঢাকাতেই কিশোর গ্যাং আছে ৬০টির বেশি। শিশু-কিশোরদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের চিত্র আরও মারাত্মক। সমাজ ও রাষ্ট্রকে যতই দায়িত্ব দেওয়া হোক না কেন, মনে রাখতে হবে সমাজের ক্ষুদ্রতম একক পরিবার। তাই পারিবারিক কাঠামো আরও সুসংহত করতে হবে। শিশুর সঙ্গে বা সামনে নিষ্ঠুর আচরণ থেকে বিরত থাকতে হবে। কারও উপযুক্ত অভিভাবক না থাকলে রাষ্ট্রকে তার অভিভাবকের দায়িত্ব নিতে হবে। উন্নয়নের মহাসড়কে ওঠা বাংলাদেশ কেন সেই দায়িত্বটুকু পালন করবে না? রাষ্ট্রকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, প্রত্যেক শিশুর সুন্দর শৈশব ও সুন্দর কৈশোরই তাকে অপরাধ থেকে মুক্ত করতে পারে।