দেশ নিয়ে হতাশ লেখকের বুকারজয়

দ্য সেভেন মুনস অব মালি আলমেদা লিখে এ বছর বুকার পুরস্কার জিতে নিয়েছেন শ্রীলঙ্কার ঔপন্যাসিক শেহান করুনাতিলকা। গৃহযুদ্ধের সময় বেড়ে ওঠা এই লেখক দেশের গত এক দশকের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বেশ হতাশ। পরের প্রজন্ম একদিন তার লেখা পড়বে, আপাতত এই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে চান তিনি। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া    

বুকার পুরস্কার

১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর ফের আরেকবার অশান্ত হয়ে উঠেছে শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়াসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত দক্ষিণ এশিয়ার দেশটি। শ্রীলঙ্কার চলমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার দেশটির নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। দুর্ভোগ-দুর্দশার জন্য কয়েক মাস আগে তারা প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে, তার ভাই প্রেসিডেন্ট গোতাবায়াসহ পুরো রাজাপাকসে পরিবারকে দায়ী করে বিক্ষোভ শুরু করে। তাদের বিক্ষোভ একপর্যায়ে সহিংস হয়ে উঠলে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে। পরে দুই ভাই-ই ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। ক্যাবিনেটের বিভিন্ন পদ থেকে পদত্যাগ করেন রাজাপাকসে পরিবারের অন্য সদস্যরা। তাদের বিদায়ের পর শ্রীলঙ্কার নতুন সরকার যে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে, তা নয়। আসলে রাজাপাকসে পরিবারের দীর্ঘদিনের সীমাহীন দুর্নীতি ও অর্থপাচার, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের পেছনে কোটি কোটি টাকা ঋণ নেওয়া, সেই ঋণের টাকাও লুটপাট করা, জাতিগত সংখ্যালঘু ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের দমন-পীড়নের মাধ্যমে পুরো দেশজুড়ে একনায়কতন্ত্র কায়েম করা এসব থেকে সৃষ্ট অরাজকতা সামাল দিতে ঈশ্বরও সম্ভবত হিমশিম খাবেন। এমন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুর্যোগকালে গত মাসে একটি ভালো খবর পায় শ্রীলঙ্কার সাহিত্য অঙ্গন। দেশটির ঔপন্যাসিক শেহান করুনাতিলকা তার দ্য সেভেন মুনস অব মালি আলমেদা উপন্যাসের জন্য এ বছর বুকার পুরস্কার জিতেছেন। এটি তার দ্বিতীয় উপন্যাস। ২০১০ সালে তার প্রথম উপন্যাস চায়নাম্যান : দ্য লেজেন্ড অব প্রদীপ ম্যাথিউ প্রকাশ হয়।

গত মাসের ১৭ তারিখে লন্ডনে করুনাতিলকার হাতে বুকার পুরস্কার তুলে দেন কুইন কনসর্ট ক্যামিলা। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ৪৭ বছর বয়সী এই সাহিত্যিক বলেন, ‘শ্রীলঙ্কা রাষ্ট্র আমার জীবদ্দশায় যত সাংবাদিক, রাজনীতিক, বেসামরিক ও নিরীহ ব্যক্তিকে খুন করেছে, তাদের সবার নাম আমি আজ পড়তে চেয়েছিলাম। কিন্তু ভেবে দেখলাম, আমি যদি তা করতে যাই, তাহলে সারা রাত আমাদের এখানেই কাটাতে হবে। দেরিতে হলেও আজ শ্রীলঙ্কানরা বুঝতে পেরেছে, দুর্নীতি, জাত্যাভিমান ও পরিবারতন্ত্র কখনো মানুষের উপকারে আসেনি, আসবেও না।’

পথচলা

শ্রীলঙ্কার দক্ষিণাঞ্চলীয় গালে শহরে ১৯৭৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন করুনাতিলকা। বেড়ে ওঠেন রাজধানী কলম্বোতে। সেখানে সেন্ট টমাস প্রিপারেটরি স্কুলে পড়াশোনা করেন তিনি। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য নিউজিল্যান্ডে যান। করুনাতিলকার পরিবার চেয়েছিল, তিনি যেন ব্যবসায় প্রশাসন নিয়ে পড়াশোনা করেন। কিন্তু পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক করেন তিনি। ২০১০ সালে চায়নাম্যান : দ্য লেজেন্ড অব প্রদীপ ম্যাথিউ উপন্যাসটি প্রকাশের আগে লন্ডন, সিডনি, আমস্টারডাম ও সিঙ্গাপুরে বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কপিরাইটার হিসেবে কাজ করেন করুনাতিলকা। দ্য গার্ডিয়ান, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, রোলিং স্টোন, নিউজউইক, দ্য ইকোনমিক টাইমসসহ নামি পত্রপত্রিকায় ফিচার লেখেন তিনি। ইন্ডিপেনডেন্ট স্কয়ার, পাওয়ারকাট সার্কাস ও দ্য ব্রাস মাঙ্কি ব্যান্ড নামের শ্রীলঙ্কার রক ব্যান্ডগুলোতে বেজ গিটারও বাজিয়েছেন করুনাতিলকা।  প্রথম উপন্যাসটি নিজেই ২০১০ সালে প্রকাশ করেন তিনি। পরে এটি পেঙ্গুইন থেকে প্রকাশিত হয়। করুনাতিলকা সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রতিভাসম্পন্ন লেখক হিসেবে বিবেচিত। ছোটগল্প ও উপন্যাসের পাশাপাশি শিশুদের জন্য তিনটি বই লেখেন তিনি। করুনাতিলকা বর্তমানে শ্রীলঙ্কাতেই বাস করেন।

বুকারজয়ী উপন্যাস

যে উপন্যাসের জন্য এ বছর করুনাতিলকা বুকার পেলেন, তা এককথায় অসাধারণ বলে মন্তব্য করেছেন সাহিত্য সমালোচকরা। এটির মর্মোদ্ধার সহজ নয়। দ্য সেভেন মুনস অব মালি আলমেদা একই সঙ্গে ডার্ক কমেডি ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গ-বিদ্রপাত্মক একটি উপন্যাস। আবার এর মধ্যে প্রেম ও দায়মুক্তিও রয়েছে। উপন্যাসটি আমাদের নিয়ে যায় আশির দশকে, শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধকালে। উপন্যাসের প্রধান চরিত্রের নাম মালি আলমেদা। পেশায় তিনি একজন ফটোগ্রাফার। নিজের অত্যন্ত প্রিয় নিকন ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে গৃহযুদ্ধের ছবি তোলেন তিনি। উপন্যাসের শুরুতেই আলমেদা জেগে ওঠেন, তবে ইহলোকে নয়, পরলোকে। কেউ তাকে খুন করে তার দেহ টুকরো টুকরো করে কলম্বোর কেন্দ্রস্থলে বেইরা লেকে ফেলে দিয়েছিল। পরলোকে জেগে উঠে আলমেদার মনে হয়, তার মৃত্যু হয়নি, হয়তো কোনো বন্ধুর দেওয়া ঘুমের বড়ি খেয়ে ভুলভাল দেখছেন। পরক্ষণেই তার ভুল ভাঙে। তিনি বুঝতে পারেন, তার আসলেই মৃত্যু হয়েছে এবং তিনি মর্ত্যলোক ত্যাগ করেছেন। আলমেদা এও বুঝতে পারেন, তাকে একটি সরকারি অফিসে রাখা হয়েছে। পুরো অফিস কক্ষ জুড়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় নাকানিচুবানি খাচ্ছে আত্মারা। তাদের অনেকের দেহে সব অঙ্গ নেই, কাপড়-চোপড় রক্তে মাখা। ফরম পূরণের জন্য তাদের লাইনে দাঁড়াতে বলা হলেও তারা লাইনে ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছে না। আত্মাদের সঙ্গে কথা বলার একপর্যায়ে আলমেদা বুঝতে পারেন, তাদের বেশির ভাগই শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধের সময় মারা যান বা তাদের হত্যা করা হয়। এদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক তামিল লেকচারারও ছিলেন। বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র তামিলদের কর্মকাণ্ড সমালোচনা করায় তাকে গুলি করা হয়। এ ছাড়া মৃতদের মধ্যে বামপন্থি দল জনতা বিমুক্তি পেরামুনার (জেভিপি) হাতে খুন হওয়া ব্যক্তিরাও রয়েছেন। তামিল টাইগার ও জনতা বিমুক্তি পেরামুনা উভয়ই আশির দশকে শ্রীলঙ্কা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দিয়েছিল। করুনাতিলকা তার এই উপন্যাসে দেখান, পথের কাঁটা মনে হওয়াদের কীভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করে জেভিপি ও তামিলরা। তাদের হিটলিস্টে বামপন্থি ও শ্রমিক শ্রেণির বেসামরিক নাগরিকরাও ছিলেন। সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিনে কাজ করা আলমেদা শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের নৃশংসতার একজন সাক্ষী। তার লক্ষ্য, গৃহযুদ্ধের ছবি তোলা। তিনি আশা করেছিলেন, এসব ছবি প্রকাশ করা হলে কেবল সরকারেরই পতন ঘটবে না, যুদ্ধও থেমে যাবে। তামিলদের বাড়িঘর যখন পুড়িয়ে দেওয়া হয় ও দখলদাররা হত্যাকাণ্ড চালায়, সে সময় শ্রীলঙ্কার এক মন্ত্রীর নিষ্ক্রিয়তার প্রমাণও আলমেদার কাছে ছিল। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতিত ও নিহত সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্টদের ছবিও তোলেন তিনি। এসব ছবি পৈতৃক বাড়িতে এক বিছানার নিচে লুকিয়ে রেখেছিলেন আলমেদা। পরকালে যাওয়ার পর তাকে কয়েকটি কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি স্বর্গে যাবেন না, নরকে, তা নির্ধারণের জন্য তার এসব দায়িত্ব পালন জরুরি। আলমেদার খুনি কে, তা জানতে তাকে সাত দিন সময় দেওয়া হয়। এই সাত দিন ইহকাল ও পরকালে যাওয়া-আসা করতে পারবেন তিনি। এ ছাড়া জাকি নামের এক বন্ধু ও চাচাতো এক ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তারা যাতে তাকে তার গৃহযুদ্ধের ছবি উদ্ধারে সাহায্য করে, সে চেষ্টাও করতে বলা হয়। সেসব ছবি পাওয়া গেলে শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে বড় শহর কলম্বোতে সেগুলো ছড়িয়ে দিতে হবে এবং এর মাধ্যমে গৃহযুদ্ধের নিষ্ঠুরতা জনসম্মুখে তুলে ধরতে হবে।

ইহকালে আলমেদা যে সাধু পুরুষ ছিলেন, তা নয়। জুয়া খেলাসহ আরও অনেক সমস্যা ছিল তার। তাই তাকে কে এবং কেন হত্যা করতে পারে, এসব বিষয়ে বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না তার। সাত দিন নেহাতই কম সময় মনে হয় আলমেদার। তার ওপর দায়িত্বগুলো পালন করতে গিয়ে তাকে নানাভাবে কাজে বাধা দেয় ভূতেরা। দ্য সেভেন মুনস অব মালি আলমেদার বিষয়বস্তু ও প্লট ১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের সময়কে তুলে আনে। উপন্যাসটি আমাদের জানায়, ভালো মানুষের খোঁজ করে না, এমন মানুষ দুনিয়ায় নেই। ২৫ বছর দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পাশাপাশি শ্রীলঙ্কার ঔপনিবেশিক শাসনামলও এই উপন্যাসে উঠে আসে। এতে দেখানো হয় কফি, চা ও রাবার বাগানে কাজ করার জন্য ব্রিটিশ শাসকরা কীভাবে ভারতের দক্ষিণাঞ্চল থেকে তামিলদের শ্রীলঙ্কায় নিয়ে আসে। তাদের বংশধররাই স্বাধীন তামিল রাষ্ট্রের জন্য লড়াই করে, যেখান থেকে গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত। করুনাতিলকার এই উপন্যাসের জাদুবাস্তবতার সঙ্গে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ-আমেরিকান ঔপন্যাসিক সালমান রুশদি ও কলম্বিয়ান ঔপন্যাসিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ রচিত উপন্যাসের জাদুবাস্তবতার তুলনা করেছেন সাহিত্য সমালোচকরা। অবশ্য একই সঙ্গে দ্য সেভেন মুনস অব মালি আলমেদা পাঠকদের রুশ ঔপন্যাসিক নিকোলাই গোগলের ডেড সোলস বা মিখাইল বুলগাকভের দ্য মাস্টার অ্যান্ড মারগারিতায় বর্ণিত বিদ্রুপাত্মক কৌতুক ও পরাবাস্তববাদের কথা মনে করিয়ে দেয়।      

স্বপ্নের ভাঙা ডানা

উপন্যাসের পটভূমি ১৯৮৯ সাল বেছে নেওয়ার পেছনে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, এ প্রশ্নের জবাবে করুনাতিলকা বলেন, ‘আমি কিছুটা ভীতু গোছের মানুষ। ২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধ শেষ হয়। আমি সেই সময় নিয়ে লিখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এত সাহস আমার নেই। ২০০৯ সালের তুলনায় ১৯৮৯ সাল বরং আমার কাছে নিরাপদ সময়কাল মনে হয়েছে কারণ ওই সময়ের রাজনৈতিক কুশীলবদের অনেকে এখন আর বেঁচে নেই। যখন আমি এই উপন্যাসটি লিখি অর্থাৎ বর্তমান সময়ের সঙ্গে আশির দশকের গৃহযুদ্ধকালীন সম্পর্ক নেই বলে আমার মনে হয়। অবশ্য আমরা এখন ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। দেশের পরিস্থিতি দ্রুত আরও খারাপ হতে পারে। তবে স্বস্তির দিক হচ্ছে, আশির দশক বা তার পরবর্তী সময়ে লোকজন যে হারে গুম হতো বা রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে সব জায়গায় যে পরিমাণ লাশ পড়ে থাকতে দেখা যেত, সেই সময়ে আমরা এখনো প্রবেশ করিনি। আশির দশকের গণহত্যা ও সহিংসতার ধারেকাছে আমরা এ মুহূর্তে নেই। গৃহযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল মাত্র ১৪। রাজনীতি সম্পর্কে স্বভাবতই কোনো ধারণা ছিল না। তবে সে সময় মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজনের চোখে-মুখে আতঙ্ক দেখেছিলাম। দেশ ১৯৮৯ সালে ফিরে গেছে বলে মনে করি না। আশা করি, এই দুই সময়ের তুলনা আমাদের কখনো করতে হবে না।’

নিজের দুটি উপন্যাসেই সহিংসতা ও রাষ্ট্র হিসেবে শ্রীলঙ্কার ব্যর্থতা তুলে ধরেন করুনাতিলকা। গৃহযুদ্ধের পর দেশটি বর্তমানে যেখানে এসে পৌঁছেছে, তার সঙ্গে নিজেকে আগের চেয়ে আরও বেশি যুক্ত করতে পারেন কি না, এ প্রশ্ন করা হলে বুকারজয়ী ঔপন্যাসিক বলেন, ‘দেশ নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমি বেশ বিরক্ত ও হতাশ। একসময় আমাদের অনেক আশা-আকাক্সক্ষা ছিল। আমাদের প্রজন্ম যুদ্ধ ও কারফিউয়ের মধ্যে বড় হয়। সে সময় আমাদের বলা হয়েছিল, যুদ্ধ একবার শেষ হলে আমাদের অগ্রগতি কেউ রুখতে পারবে না। আমাদের জীবদ্দশাতেই যুদ্ধ শেষ হয়। ১২টা বছর পেরিয়ে গেছে। কী দেখছি আমরা? আসলে আমরা অতীত থেকে কিছুই শিখিনি। ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মাহিন্দা রাজাপাকসে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তার সময়ে ২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধ শেষ হয়। তার শাসনামলে সংখ্যালঘু নির্যাতন, সাংবাদিক নিপীড়নসহ এমন আরও অনেক ঘটনা ঘটে, যা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের কিশোর বয়সের লালিত স্বপ্ন ভেঙেচুরে দেয়। মাহিন্দা এখন আর ক্ষমতায় নেই। জনগণই তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। কিন্তু তার পরের সরকার এখন পর্যন্ত মানুষের জন্য কিছুই করতে পারছে না। ২০১৯ সালে ইস্টার সানডের দিন বোমা হামলার ঘটনা আমাকে ব্যাপক আশাহত করে। দেশকে ভালোবাসি, এমনটা এখন আর মনে হয় না। জন্মভূমিতে থেকেও তার প্রতি টান অনুভব করি না। দেশের ভবিষ্যৎ কী, ক্ষমতায় কারা আসবে, কারা যাবে এসব এখন আমি বলে দিতে পারি। আমার ভবিষ্যদ্বাণী খুব একটা যে ভুল হবে, তা মনে হয় না। তবে এই হতাশাজনক পরিস্থিতির সবটাই অন্ধকার, আলোর দিক নেই, এমনটা নয়। যেমন এক্ষেত্রে লেখক-ঔপন্যাসিকদের কথা বলা যায়। শ্রীলঙ্কা রাষ্ট্রের ব্যর্থতার গল্প এত বেশি যে, তাদের লেখার বিষয়ের কখনো অভাব হবে না। এ কারণে ঘরে বসে এসব গল্প লিখে বাস্তবতা থেকে পালানোই শ্রেয় মনে হয় আমার কাছে। একটাই আশা, পরের প্রজন্ম আমাদের গল্প-উপন্যাস পড়বে, জানবে দেশটা কেন এমন হয়ে গেল।’