মূলত নব্বইয়ের দশক থেকে বিশ্বব্যাপী ঋণের সুদহার কমার মধ্য দিয়ে সস্তা ঋণের প্রচলন শুরু। পরবর্তী তিন দশকে নানা পর্যায়ে ওঠানামার মধ্য দিয়ে লাইবর হার ১১ থেকে করোনার সময় প্রায় শূন্য শতাংশে নেমে আসে। এরপর থেকেই সস্তা ঋণের ফাঁদে গোটা বিশ্ব আরও বেশি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এখন এই ঋণ গলার কাঁটা হয়ে দেখা দিয়েছে অনেক দেশ ও ব্যবসায়ীদের জন্য। বাংলাদেশের মতো নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য এই সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে।
বহু বছর ধরে ইউরোপ-আমেরিকা সস্তা ঋণের যে নীতি অনুসরণ করে আসছিল, সেই ব্যবস্থা পাল্টে দিয়েছে উচ্চমূল্যস্ফীতি ও ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ। মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে গিয়ে উন্নত দেশগুলো ফিরে গেছে সনাতন পদ্ধতিতে; বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে অব্যাহতভাবে সুদহার বাড়িয়েই চলছে এবং বিশে^র অন্যান্য দেশ তাদের অনুসরণ করছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সে পথে হাঁটেনি। উল্টো বাংলাদেশে ঋণ ও আমানতের সুদহার কমছে।
গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ব্যাংকব্যবস্থায় ঋণ-আমানতের সুদহার নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখা যায় চলতি বছরের মার্চ-জুন প্রান্তিকে ব্যাংক আমানতের গড় সুদহার ৪ শতাংশের নিচে রয়েছে। এ সময়ে গড় ঋণের সুদহারও কমে ৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। যদিও বিবিএসের হিসাবে গত সেপ্টেম্বরে দেশের মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। আর জুলাই-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে। এমন পরিস্থিতিতে ঋণ ও আমানতের সুদহার বাড়ানোর চাপে রয়েছে বাংলাদেশও।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র জি এম আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমানত ও ঋণের বিপরীতে সুদের হার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নীতিমালা রয়েছে। ব্যাংকগুলো এই নীতিমালার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে পারে। ব্যাংক তো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ব্যাংক তার ব্যবসা বিবেচনা করে বিষয়গুলো নির্ধারণ করবে।
আর ঋণের বিপরীতে সুদের হার তুলে দেওয়া হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব সিদ্ধান্ত নেয়, তা গবেষণা করেই নেয়। এ বিষয়েও গবেষণার মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে কবে নাগাদ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে, সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই শীর্ষ কর্তা।
বাংলাদেশে করোনার অভিঘাত শুরুর পর ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে সরকারের নির্দেশে ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূলত ব্যবসার ব্যয় কমাতে আমানতকারীদের ঠকিয়ে সস্তা ঋণের প্রচলন শুরু করে সরকার। কিন্তু এতে ব্যবসায়ীদের লাভ হলেও জনগণ কোনো সুফল পায়নি। সস্তা ঋণের কারণে উৎপাদন ব্যয় কমলেও পণ্যমূল্য কমেনি; বরং বৈশি^ক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক ও দেশীয় উৎপাদনকারীরা বেশি মূল্যে পণ্য বিক্রি করে অস্বাভাবিক মুনাফা করছেন।
এদিকে কম সুদের সস্তা ঋণ দেশকে ভালো বিনিয়োগের পরিবর্তে উচ্চ খেলাপি ঋণ উপহার দিয়েছে। করোনার দুই বছরে ঋণখেলাপিদের ব্যাপক সুবিধা দেওয়ার পরও খেলাপি ঋণ বেড়েই চলেছে। গত দেড় বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। অপরদিকে সস্তা ঋণ অর্থনীতিতে মুদ্রা সরবরাহ বাড়াচ্ছে। এতে বাড়তি চাহিদা সৃষ্টি হচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে। আবার ঋণের একটি অংশ পাচারও হয়ে যাচ্ছে।
সুদহার বাড়ানোর চাপ : যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে গিয়ে ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচবার সুদহার বাড়িয়েছে ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড)। বছর শেষ হওয়ার আগে আরও বাড়ানো হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ফেড চেয়ারম্যান জেরোমি পাওয়েল। ফেডের সুদহার বাড়ানোর পরিপ্রেক্ষিতে ট্রেজারি বন্ডের সুদহারও এখন বাড়তির দিকে। শুধু ট্রেজারি বন্ড নয়, চলতি বছর লন্ডন ইন্টারব্যাংক অফারড রেটের (লাইবর) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরড ওভারনাইট ফিন্যান্সিং রেটও (এসওএফআর) অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এসওএফআর রেট ছিল শূন্য দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, যা অক্টোবর শেষে ৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে লাইবর হার শূন্য দশমিক ৫ থেকে ৫ দশমিক ২ শতাংশ ছাড়িয়েছে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণ করে বিশে^র ৭০টি দেশও সুদহার বাড়িয়েছে।
মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার এ সময়ে বিশে^র অধিকাংশ দেশ এরই মধ্যে সুদহার বাড়ানোর মাধ্যমে ঋণের চাহিদা কমানোর পন্থা বেছে নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে নীতি সুদহার কিছুটা বাড়ানো হলেও ব্যাংক আমানত ও ঋণের সুদহার বাড়ানোর কোনো পদক্ষেপ এখনো নেয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, মেয়াদি ঋণের সুদহার সর্বশেষ তিন মাসের গড় মূল্যস্ফীতির নিচে হতে পারবে না। জুলাই-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। কিন্তু মূল্যস্ফীতি বাড়লেও ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহার বাড়াতে পারছে না। এর কারণ হিসেবে ব্যাংকগুলো জানিয়েছে, সরকারের নির্দেশে ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশে বেঁধে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাই ঋণের সুদহার না বাড়ালে আমানতের সুদহার বাড়ানো যাচ্ছে না। এখন আমানতের সুদহার বাড়ানো হলে ব্যাংকগুলোর লোকসানে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে বিদ্যমান ৯ শতাংশ সুদহারের সীমা তুলে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকেরই এক প্রতিবেদনে। গত ২৭ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণের সীমা তুলে দিলে ব্যবসার খরচ বেড়ে জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমবে। এরপরও উচ্চ মূল্যম্ফীতির এ সময়ে সুদহারের সীমা তুলে দেওয়ার চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প নেই। তবে সীমা তুলে দেওয়ার কারণে একবারে সুদহার যেন অনেক বেড়ে না যায়, সে জন্য ব্যাংকগুলোর ওপর নৈতিক চাপ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এমন প্রতিবেদন দিলেও খোদ ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারাই তা আমলে নিচ্ছেন না।
সুদহার প্রসঙ্গে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে মেয়াদি আমানতের সুদের হারের বিষয়ে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, ব্যাংকগুলো তা মানার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির কারণে আমানতের সুদহার প্রায় ৯ শতাংশ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। সে ক্ষেত্রে ৯ শতাংশ দেওয়া তো কঠিন। তবুও নির্দেশনা মানার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। আর ঋণের বিপরীতে সুদের হারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলেছি। এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। এখন দেখা যাক কী সিদ্ধান্ত আসে।’
আর বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঋণের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক যে সুদের হার নির্ধারণ করে দিয়েছে, ব্যাংকিং খাতের লেনদেনের ক্ষেত্রে এটা একটা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, রিজার্ভও কমে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সুদের ক্যাপ তুলে দেওয়া। এই ক্যাপ যদি থাকে, তাহলে মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি সংকোচন ঘটেই মূলত সুদের হার বৃদ্ধির মাধ্যমে। ক্যাপ থাকার কারণে এখন সেটার তো সুযোগ নেই।
এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক কিছুদিন আগে তাদের একটি গবেষণাপত্র বের করেছে, সেখানে সুদের হার তুলে দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এটা দিয়ে হয়তো বোঝানো হচ্ছে যে আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি। তবে এখানে সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। এখন দেশে ডলার সংকট, রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে, সেই সঙ্গে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতিও বাড়ছে। এই মুহূর্তে সুদের হার তুলে দিলে যে সুবিধা পাওয়া যাবে, আরও পরে তুললে হয়তো সেই সুবিধা পাওয়া যাবে না।
আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ঋণ : কম সুদহারের কারণে শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বই ঋণের জালে আটকা পড়েছে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট বিশ্বকে অতিরিক্ত ঋণের বিপদ শিখিয়েছিল বলে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু তারপর থেকে ঋণ নেওয়া কমেনি, উল্টো বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০০৭ সালে সরকার, কোম্পানি এবং পরিবারের ঋণ ছিল বিশ্ব জিডিপির ১৯৫ শতাংশ, যা ২০২০ সালের শেষ নাগাদ ২৫৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবে বিশে^ ঋণ বাড়লেও এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জিডিপি বাড়ছে না। আইএমএফের ঋণ নীতি বিভাগের প্রধান সোনজা গিবসের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এক দশকে বৈশি^ক ঋণ ৯০ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়েছে, যেখানে জিডিপি বেড়েছে মাত্র ২০ ট্রিলিয়ন ডলার।
এ সময় অব্যাহতভাবে বাংলাদেশের ঋণও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, এর সঙ্গে বিপদও বাড়তে শুরু করেছে। মাত্র পাঁচ বছরেই বিদেশি ঋণ দ্বিগুণ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিদেশি উৎস থেকে দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৫৮১ কোটি ডলার। আর চলতি বছরের জুন শেষে দেশের সরকারি-বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৫৮৬ কোটি ডলার, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ২২ শতাংশ। এই ঋণের প্রায় ৭৩ শতাংশ নিয়েছে সরকার। বাকি ২৭ শতাংশ নিয়েছে দেশের বেসরকারি খাত।
শুধু বিদেশি ঋণ নয়, কম সুদের কারণে অভ্যন্তরীণ ঋণও বাড়ছে। চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকিং খাতে আমানতের স্থিতি ছিল ১৪ লাখ ৭১ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা; অর্থাৎ আড়াই বছরে অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৪ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা বা ৪৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
সস্তা বিদেশি ঋণ এখন গলার ফাঁস : কম সুদে বিদেশি ঋণ নিয়ে এখন বিপদে পড়েছে দেশের বেসরকারি খাত। লাইবর ও এসওএফআরের হার যখন নি¤œমুখী অবস্থানে ছিল, তখন দেশের বেসরকারি খাত বিদেশি ঋণে ঝুঁকে পড়ে। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল। সেই সুলভে নেওয়া ঋণ এখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকা প্রায় ২৪ শতাংশ দর হারিয়েছে। একই সময়ে এসওএফআর ও লাইবর হারও ৩ থেকে ৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। ফলে যেসব কোম্পানির বিদেশি মুদ্রায় আয় নেই, বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানি, তাদের বিদেশি ঋণের সুদহার এখন ২৮ থেকে ৩০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ব্যক্তি খাতের কোম্পানিগুলোর নেওয়া বিদেশি ঋণের ৬৮ শতাংশই স্বল্পমেয়াদি। টাকার অবমূল্যায়ন, দেশে ডলার সংকট এবং এসওএফআর ও লাইবর হার বেড়ে যাওয়ায় বিদেশি ঋণগ্রহণকারী অনেক কোম্পানি খেলাপি হওয়ার শঙ্কায় রয়েছে। এ অবস্থায় অফশোর ইউনিটের মাধ্যমে ঋণের অর্থ জোগানদাতা ব্যাংকগুলোও বিপদে পড়েছে।
শুধু বেসরকারি খাত নয়, বড় ধরনের সংকটে রয়েছে সরকারও। এক দশকে বিদেশি ঋণের উৎসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে নেওয়া ঋণের সুদহার ছিল নির্দিষ্ট ও সুলভ। ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ২০-২৫ বছর হলেও সুদহার নির্ধারিত ছিল সর্বোচ্চ ২ শতাংশ। সেখানে এখন বৈদেশিক ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে নিয়েছে সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট ও বাণিজ্যিক শর্তযুক্ত ঋণের মতো কঠিন শর্তের ঋণও।
দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন ঋণের ভিত্তিতে দেশে এখন বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এর একটি হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। রাশিয়ার দেওয়া ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ঋণের ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ ঋণের সুদহার ধরা হয়েছে লাইবরের অতিরিক্ত ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। চুক্তিটি যখন সই হয়, তখন লাইবর হার ছিল বেশ কম। কিন্তু এখন লাইবর হার বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ঋণের সুদ বাবদ পরিশোধযোগ্য ব্যয়ের পরিমাণও অনেকটাই বেড়েছে।
বিশ্ব এখন নতুন ঋণ সংকটের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। খাদ্য ও জ্বালানির উচ্চ মূল্যের কারণে দরিদ্র দেশগুলো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। শ্রীলঙ্কা, ঘানা, মিসর এবং পাকিস্তান ইতিমধ্যে তাদের ঋণ সাহায্যের জন্য আইএমএফের কাছে আহ্বান জানিয়েছে। বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশও আইএমএফের কাছে ৪৫০ কোটি ডলার ধার চেয়েছে। আইএমএফের একটি নিবন্ধ অনুসারে, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর প্রায় ৬০ শতাংশ ঋণ সংকটে বা এর ঝুঁকিতে রয়েছে।
জিডিপিতে ঋণের উচ্চ অনুপাতের কারণে যুক্তরাজ্য, ইতালি ও গ্রিসের মতো ধনী দেশগুলোও বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অন্যদের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র এই সমস্যা থেকে কিছু সুরক্ষিত রয়েছে। শেল গ্যাসের মজুদ দেশটিকে জ্বালানি সংকট থেকে আপেক্ষিক বিজয়ী করে তুলেছে এবং ক্রমবর্ধমান ডলার অন্যান্য দেশের তুলনায় দ্রুত মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে সাহায্য করবে। কিন্তু শক্তিশালী মার্কিন ডলার পৃথিবীর অন্য সবার জন্য জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। এটি বিশে^র বাকি অংশকে মূল্যস্ফীতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং যারা ডলারে ধার নিয়েছে তাদের দুর্দশা বাড়াচ্ছে। ৫০ বছরেরও বেশি সময় আগে ইউএস ট্রেজারি সেক্রেটারি তার সমকক্ষদের বলেছিলেন, ‘ডলার আমাদের মুদ্রা, কিন্তু এটি আপনার সমস্যা।’ প্রবাদটি এখন সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক।