চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলে বিধানসভা নির্বাচনে উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখ-সহ চার প্রদেশে ভূমিধস জয় পেয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় শাসক দল বিজেপি। তখন পাঞ্জাবসহ পাঁচ রাজ্যে নির্বাচন হলেও সবার দৃষ্টি ছিল জনসংখ্যায় বৃহত্তম রাজ্য উত্তর প্রদেশের ফলের দিকে। নভেম্বরের শেষের দিকে হিমাচলে ও ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বিধানসভা নির্বাচন হতে যাচ্ছে গুজরাটে। ভারতের রাজনীতিতে রাজ্যগুলোর রাজনৈতিক গুরুত্ব নির্ভর করে রাজ্যে কতটি লোকসভা আসন রয়েছে তার ওপর। মার্চ-এপ্রিলে হয়ে যাওয়া বিধানসভা নির্বাচনে পাঁচ রাজ্যের মধ্যে উত্তর প্রদেশে ৮০টি, পাঞ্জাবে ১৩টি উত্তরাখ-ে ৫টি, গোয়ায় ২টি ও মণিপুরে ২টি লোকসভা আসন রয়েছে। ফলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল উত্তর প্রদেশের সমীকরণ। আগামী ৮ ডিসেম্বর একই সঙ্গে হিমাচল প্রদেশের লোকসভা নির্বাচন ও গুজরাটের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। গুজরাটে লোকসভার আসন রয়েছে ২৬টি ও হিমাচলে ৪টি। ফলে রাজনৈতিক বিবেচনায় গুজরাটের বিধানসভা নির্বাচনের দিকে পুরো ভারতের নজর।
১৯৯৮ সাল থেকে গুজরাটে টানা ক্ষমতায় বিজেপি। তবে ২০১৭ এর বিধানসভায় জিততে বেশ বেকায়দায় পড়তে হয়েছিল দলটিকে। ১৮২ সিটের মধ্যে ৯৯টি আসনে কোনো রকম জিতে ক্ষমতায় গিয়েছিল। পরে অবশ্য কংগ্রেস থেকে ১২ জন বিধায়ককে ‘বাগিয়ে’ নিয়েছিল দলটি। এবার যেকোনো কৌশলে গুজরাটের শাসন ধরে রাখতে মরিয়া বিজেপি। ৫০০ টাকায় রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার, ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত বিনামূল্যে বিদ্যুৎ, ১০ লাখ রুপি পর্যন্ত স্বাস্থ্যবীমা, কৃষকদের ঋণ মওকুফ, কভিডে মৃত্যুবরণ করা পরিবারগুলোকে ৪ লাখ রুপি করে প্রদান, বেকারদের ৩০০ রুপি করে বেকারভাতা দেওয়ার মতো বেশ কিছু উৎসাহী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে রাজ্য বিজেপি। তবে বিধানসভা নির্বাচনের আগে সেতু দুর্ঘটনা বিজেপিকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। দিল্লি ছেড়ে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ এখন গুজরাটে। কংগ্রেস নেতা রঘু শর্মা খোঁচা দিয়ে বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর উচিত গান্ধীনগরে (গুজরাটের রাজধানী) একটি অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রীর অফিস খোলা। প্রায় ১ লাখ কোটি রুপির নানা ধরনের প্রকল্পের উদ্বোধন ও প্রতিশ্রুতি বিজেপির পক্ষ থেকে নির্বাচনের আগে সামনে আনা হয়েছে।
এবার নির্বাচনে বিজেপির জন্য শুধুমাত্র কংগ্রেস নয় মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে আম আদমি পার্টিও। দিল্লির পর পাঞ্জাবের শাসনভার হাতে পাওয়ার পর বেশ উচ্ছ্বসিত কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি। শুধু বিজেপি নয় আম আদমিকে চ্যালেঞ্জ মনে করছে কংগ্রেসও। তাদের আশঙ্কা গোয়ার মতো তারা গুজরাটেও কংগ্রেসের ভোট কাটবে। তাই কংগ্রেস কেজরিওয়াল ও আসাদুদ্দিন ওআইসিকে বিজেপির ‘বি টিম’ বলে কটাক্ষ করছে। এবার নির্বাচনে ভোটার ৪ কোটিরও বেশি। প্রথমবারের মতো এবার যৌনপল্লীতে স্থাপিত হবে নির্বাচনের বুথ। ১ ডিসেম্বর মূলত পাকিস্তান সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ৮৯টি বিধানসভা আসনে ও ৫ ডিসেম্বর রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চলের ৯৩টি আসনে ভোট হতে যাচ্ছে। পাকিস্তান সীমান্তবর্তী আসনে বিজেপির অবস্থান ভালো হলেও রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশের দিকে কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা বেশি। অন্যদিকে, পরিবারতন্ত্র থেকে বের হয়ে ২৪ বছর পর অ-গান্ধী সভাপতি নির্বাচন করেছে কংগ্রেস। নতুন সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের কাছে এই নির্বাচন নিজের যোগ্যতা প্রমাণের প্রথম চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে রাহুল গান্ধীর ‘ভারত জোড়ো’ আন্দোলন কতটা সাড়া ফেলল তার একটা প্রতিফলন আসবে এই নির্বাচনে। ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে গুজরাটের বিধানসভা নির্বাচন বিজেপির জন্য জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের শেষ সুযোগ। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মভূমি গুজরাটের এই বিধানসভায় জয়ী হয়ে আসা বিজেপির জন্য একটা প্রেস্টিজ ইস্যুও বটে। ফলে দুই প্রধান দলের কাছে গুজরাট নির্বাচন একটি ‘এসিড টেস্ট’।
ভারতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় আছে গুজরাট। নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার আগে বলেছিলেন, তিনি ‘গুজরাটের উন্নয়ন মডেল’ সারা দেশে ছড়িয়ে দেবেন। অন্যদিকে গুজরাট সবচেয়ে আলোচিত নাম হয়েছে দাঙ্গার কারণে। ২০০২ সালের সে দাঙ্গা আলোচনা থেকে কখনো সরেনি। দাঙ্গায় মুসলমানদের হত্যার অভিযোগ যেমন আছে, হিন্দু তীর্থযাত্রীদের ট্রেনে অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে হিন্দুদের হত্যার অভিযোগও আছে। নচিকেতা চক্রবর্তী ‘তুমি আসবে বলে দেশটা এখনো গুজরাট হয়ে যায়নি’ বলে গুজরাটের হিংসাকে কলমে, গানে প্রতিরোধ করেছেন। তবে গুজরাট একেক জনের কাছে একেক ব্যাখ্যা বহন করে। সেই গুজরাট ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে ফের আলোচনায়। গুজরাটে বিজেপি, কংগ্রেস ও আম আদমি পার্টির ত্রিমুখী সমীকরণের সময়ে চেন্নাইয়ে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালের পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে মমতার চেন্নাই সফর হলেও স্ট্যালিনের সঙ্গে মমতার সাক্ষাৎ রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করে। লোকসভা নির্বাচনের এক বছর আগে হতে যাওয়া গুজরাটের বিধানসভা নির্বাচন যেমন পরবর্তী রাজনীতির সমীকরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, এই বৈঠকটিও তাই। তামিলনাড়– একমাত্র রাজ্য যেখানে কোনো লোকসভা আসনে জিতেনি বিজেপি। অন্যদিকে মমতার পশ্চিমবঙ্গেও কোনোভাবে সুবিধা করতে পারছে না বিজেপি।
জয়ললিতাহীন তামিলনাড়ুতে এম করুণানিধির মৃত্যুর পর এম কে স্ট্যালিনই সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা। তার দল দ্রাভিদা মুন্নেত্রা কাঝাগাম বা ডিএমকে-এর রয়েছে সংগ্রামী ইতিহাস। ১৯৬৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের হিন্দিকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণাকে রাজপথে আটকে দিয়েছিল ডিএমকে। এছাড়া দলটি বর্তমানে লোকসভার তৃতীয় বৃহত্তম দল। এই মুহূর্তে বিজেপির মোটো ‘হিন্দু, হিন্দি, হিন্দুত্ববাদ’। ফলে গেরুয়া শিবিরকে আটকাতে বিরোধীদের ঐক্যে ডিএমকে’র মতো একটি মধ্য বামপন্থি দলের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। মমতা স্ট্যালিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে স্ট্যালিনকে সম্বোধন করেছেন, ‘আমার রাজনৈতিক বন্ধু ও বিরোধী ঐক্যের সঙ্গী’ বলে। গত বছরের তামিলনাড়ু দিবসে দিল্লির তামিলনাড়ু হাউজে স্ট্যালিন বিজেপিকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘দিন শেষে আমার নাম কিন্তু স্ট্যালিন।’ জার্মানির নাৎসি বাহিনীকে পরাজয়ে ভূমিকা রাখা স্ট্যালিনের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করে তিনি বিজেপি বিরোধী ঐক্যে তার অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। অন্যদিকে এই মুহূর্তে ভারতের সবচেয়ে আলোচিত মুখ্যমন্ত্রীর নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শাসক দল বিজেপিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দিল্লির রাজনীতির দখল নেওয়ার স্বপ্ন এই বাঙালি নারীনেত্রীর। উত্তর প্রদেশের নির্বাচনে তার সফর নিয়ে রাজ্যজুড়ে তোলপাড় হয়। যদিও-বা পশ্চিমবঙ্গের বাইরে কোথাও ক্ষমতা নেওয়ার পরিস্থিতি এখনো তৈরি করতে পারেনি মমতার তৃণমূল কংগ্রেস। তবে তিনি একটি কোয়ালিশন চান। বিজেপি কংগ্রেসের বাইরে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যমণি হতে চান। অন্যদিকে কংগ্রেস ফিরে আসতে চায় বিরোধী নেতৃত্বের মঞ্চে। বিজেপি প্রমাণ করতে চায় কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী তারা ফের ক্ষমতায় আসছে। কিন্তু বিজেপিকে গুজরাট-হিমাচলের জনপ্রিয়তার চ্যালেঞ্জও যেমন মোকাবিলা করতে হবে তেমনি পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের বন্ধুত্বও বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে যেকোনো সময়। ফলে বিরোধী দলে ঐক্য সৃষ্টি হলে ২০১৯-এর লোকসভার চেয়ে ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন কঠিন হবে বিজেপির জন্য।
লেখক : কলামিস্ট
shahadatju44@gmail.com