ইআরএফ সংলাপে এফবিসিসিআই সভাপতি

সুদহার নয়, ব্যাংকের সক্ষমতা বাড়াতে হবে

বিদ্যমান ঋণের সুদহার বাড়ালে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করেন এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন। অনেকেই ঋণের সুদহার উঠিয়ে দেওয়ার কথা বলছেন। তবে দেশে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং শিল্প সচল রাখতে ব্যাংকঋণের সুদহার ৯ শতাংশ তুলে দিলে সক্ষমতা হারাবে শিল্প। বরং কর্তৃপক্ষের উচিত সুদহার না বাড়িয়ে ব্যাংকের সক্ষমতা বাড়ানো। গতকাল শনিবার ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত সংলাপে এসব কথা বলেন এফবিসিসিআই সভাপতি।

জসিম উদ্দিন বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে শিল্প-কারখানা ইতিমধ্যেই বড় সংকটে পড়েছে। এখন সুদহার বাড়ানো হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে এবং শিল্পের টিকে থাকা কঠিন হবে। ব্যাংকগুলো এখন আমানতের ওপর ৬ শতাংশের বেশি সুদ দেয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঋণের সুদহারের সীমা প্রত্যাহার করা উচিত নয়। বাংলাদেশি ব্যাংকগুলো যেভাবে শাখা স্থাপনের জন্য ২-৩ কোটি টাকা ব্যয় করে তা অন্য কোথাও দেখা যায় না, এমনকি চীনেও নয়। সুতরাং ঋণের সুদহার বাড়ানোর পরিবর্তে ব্যাংকগুলোকে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে ব্যয় কমানোর দিকে মনোনিবেশ করা উচিত।

এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেছেন, কিছু ব্যাংক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অস্বাভাবিক দরে ডলার বিক্রি করে অল্প সময়ের মধ্যে ২০০ কোটি টাকা থেকে ৩০০ কোটি টাকা আয় করেছে। সরকারের উচিত ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।

তিনি বলেন, যখন সুদহার কমানো হয়েছে তখন দেশে বিনিয়োগ বেড়েছে। ঋণের সুদহার বাড়ানোর বিষয়ে গবেষণা সংস্থাগুলোর একেক ধরনের এজেন্ডা থাকে। তারা একেক জনের প্রতিনিধিত্ব করে ও এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়। বাস্তবতা হচ্ছে, সুদহার বাড়লে শিল্প টিকে থাকবে কি না। বর্তমান অবস্থায় সুদহার বাড়ালে শিল্প কোথায় যাবে। সুদহার বাড়ানো হলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, এমনটা বিশ^াস করি না আমি। 

এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ডলার শক্তিশালী করতে সুদহার বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের ফর্মুলা আমাদের দেশে বাস্তবায়ন করলে হবে না। দেশের শিল্পের কথা বিবেচনা করেই নীতি গ্রহণ করতে হবে। জ¦ালানি সংকট নিরসনে কয়লাভিত্তিক জ¦ালানিতে যেতে হবে। নিজস্ব কয়লা ব্যবহার করতে হবে। দেশের উন্নয়নে শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব জ¦ালানি সহযোগিতা লাগবে। বাংলাদেশ বিশে^র নবম ভোক্তা বাজার হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বাজার ঘিরে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। বিদ্যমান বিনিয়োগের সঙ্গে আরও নতুন বিনিয়োগ এলে তাদের ধরে রাখতে জ¦ালানি সহযোগিতা বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ এখন বড় ইস্যু। কভিডের সময় সিদ্ধান্ত ছিল শিল্প বন্ধ করা যাবে না। ওটা সাহসী সিদ্ধান্ত। চলমান সংকটেও তেমন সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। কারণ গত বছর ৫২ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি হয়েছে। তখন ৩৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বলা হলেও বাস্তবে এটা ছিল না। জসিম উদ্দিন আরও বলেন, এখন গ্যাস-বিদ্যুৎ না পেলে বিদেশি ক্রেতার অর্ডার অনুযায়ী পণ্য দিতে ব্যর্থ হব আমরা। ক্রেতারা একবার ফিরে গেলে আর পাওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বন্ধ করাসহ অন্যান্য পদক্ষেপ নিয়ে শিল্পে গ্যাস চালু রাখতে হবে। 

তিনি বলেন, বিশ^বাজারে জ¦ালানির দাম বেড়েছে. তাই গ্যাস বেশি দামে আমদানি করতে হবে। সেক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা শিল্প কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস নিশ্চিত করার জন্য বেশি দাম দিতে রাজি আছে। সরকার গ্যাসে যে পরিমাণ ভর্তুকি দিচ্ছে তার চেয়ে বেশি ট্যাক্স নিচ্ছে। এলএনজিতে ৪৭ শতাংশ কর এবং ডিজেলে প্রতি লিটারে ২৪ টাকা কর নিচ্ছে। এই কর হার কমিয়ে বাড়তি দাম সমন্বয় করে নতুন করে যৌক্তিক দাম ঠিক করা হতে পারে। তিনি মনে করেন শিল্প সচল রাখতে ব্যবসায়ীকেও দায় নিতে হবে। আবার কর কমিয়ে জ¦ালানির দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে। 

অর্থপাচার বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যেহেতু বলেছে, আমদানির আড়ালে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত মূল্য দেখানোর প্রমাণ পেয়েছে তারা। আন্ডার ইন ভয়েস ও ওভার ইন ভয়েসের মাধ্যমে অর্থপাচার হচ্ছে। তাদের উচিত জড়িতদের আইনের আওতায় আনা। তা না হলে শুধু বাহবা নেওয়ার জন্য মুখরোচক কথা বলা উচিত নয়।

আইএমএফের ঋণের বিষয়ে তিনি বলেন, আইএমএফ তাদের ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে শর্ত  দেবে, তবে আমাদের নেগোসিয়েশন করতে হবে দক্ষতার সঙ্গে। সেই সক্ষমতা আমাদের থাকতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি মেটাতে আইএমএফ থেকে ঋণ নিতে হবে। তার মানে এই নয় সবকিছু জলাঞ্জলি দিয়ে। বাংলাদেশের অবস্থা এতটা বেগতিক নয় যে, সব শর্ত মেনে ঋণ নিতে হবে।

এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, যেসব পণ্য আমদানির প্রয়োজন বেশি তা দেশে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলে আমদানিতে ডলারের ব্যয় কমে যাবে। তাতে ডলার ঘাটতি কিছুটা লাঘব হবে। এদিকে এখন নজর দেওয়ার প্রয়োজন। অনুষ্ঠানে ইআরএফ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।