বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী ফারদিন নূর পরশকে (২৩) হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মরদেহের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক শেখ ফরহাদ। তিনি নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তাও।
গতকাল মঙ্গলবার ময়নাতদন্ত শেষে তিনি বলেন, ‘ফারদিনের মাথার বিভিন্ন অংশে ও বুকে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে আমরা নিশ্চিত হয়েছি এটি একটি হত্যাকা-। দ্রুতই ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেওয়া হবে।’
রাজধানী ঢাকা থেকে নিখোঁজের পর গত সোমবার (৭ নভেম্বর) নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উদ্ধার করা হয় ফারদিনের মরদেহ। গতকাল দুপুরে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
গতকাল পর্যন্ত হত্যায় জড়িত কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এমনকি থানায় মামলা পর্যন্ত হয়নি। তবে কারা কী কারণে ফারদিনকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দিয়েছে, সেটি জানতে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ, র্যাবসহ একাধিক সংস্থা। ইতিমধ্যে তার কথিত প্রেমিকাসহ একাধিক লোককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। বিশ্লেষণ করা হচ্ছে রাজধানীর রামপুরা ও নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন স্পটের সিসি (ক্লোজ সার্কিট) টিভি ক্যামেরার ফুটেজ।
ফারদিনের পরিবার বলছে, এটা পরিকল্পিত হত্যাকা-। তার বাবা কাজী নূর উদ্দিন বলেন, ‘ফারদিনের মরদেহ পচে ফুলে গেছে। আমার ধারণা, তাকে শুক্রবার হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। তার ব্যবহৃত ফোন, ঘড়ি ও মানিব্যাগ সঙ্গেই পাওয়া গেছে। ফলে আমরা নিশ্চিত পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অনুরোধ, দোষীদের দ্রুত খুঁজে বের করুক। দরকারে সিসি ক্যামেরা ফুটেজ খুঁজে বের করুক। আমরা ফারদিন হত্যার সর্বোচ্চ বিচার চাই।’
তিনি জানান, গতকাল বুয়েট ক্যাম্পাস ও ডেমরায় শামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজে ফারদিনের জানাজা হয়েছে। তাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার দেলপাড়ায় দাফন করা হবে।
এদিকে গতকাল দুপুরে বুয়েটের শহীদ মিনার চত্বরে এক মানববন্ধন থেকে ফারদিন ‘হত্যার’ সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন বুয়েটের শিক্ষার্থীরা। এ সময় ফারদিনের সহপাঠীরাসহ বুয়েটের শতাধিক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। লিখিত বিবৃতিতে শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমরা বুয়েট শিক্ষার্থীরা এ হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের চিহ্নিত করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত বিচারের দাবি জানাচ্ছি।’ ফারদিন ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত মেধাবী এবং নির্ঝঞ্ঝাট একজন মানুষ ছিল বলেও জানান তারা।
এর আগে দুপুর ২টার দিকে ফারদিনের মরদেহ বুয়েট ক্যাম্পাসে নিয়ে আসা হয় এবং কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজা সম্পন্ন হয়। জানাজায় বুয়েটের ছাত্র-শিক্ষক, ফারদিনের বাবাসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
গত সোমবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জের লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলের পেছনে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে নৌ-পুলিশ ফারদিনের মরদেহ উদ্ধার করে। বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফারদিন গত ৪ নভেম্বর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। ৫ নভেম্বর রাজধানীর রামপুরা থানায় এ বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন বাবা কাজী নূর উদ্দিন।
জিডিতে উল্লেখ করেন, গত ৪ নভেম্বর দুপুরে ফারদিন রাজধানীর ডেমরা থানা এলাকার কোনাপাড়া শান্তিবাগ শুভেচ্ছা টাওয়ারের বাসা থেকে বুয়েটের আবাসিক হলে যাওয়ার উদ্দেশে বের হয়। পরদিন সকাল ১০টায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে তার পরীক্ষা ছিল। পরে তিনি জানতে পারেন ফারদিন পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। এরপর ছেলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে মোবাইল ফোন বন্ধ পান।
জিডিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘খোঁজাখুঁজি করে জানতে পারি ফারদিন তার মেয়ে বন্ধু বুশরার সঙ্গে রিকশায় রামপুরা থানাধীন ট্রাফিক বক্সে সামনে গিয়ে নেমে পড়ে। এখন পর্যন্ত সে বাসায় ফেরেনি।’
ফারদিনের বাবা কাজী নূর উদ্দিন বিজনেস পত্রিকা ‘দ্য রিভারাইন’-এর সম্পাদক ও প্রকাশক। ফারদিনের মা ফারহানা ইয়াসমিন গৃহিণী। তাদের গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা উপজেলায়। তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় ছিলেন ফারদিন। পড়াশোনায় মেধাবী ফারদিন এসএসসি ও এইচএসসিতে সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন। গবেষণায় আগ্রহ ছিল তার। ফারদিন নিজের ইচ্ছায় বুয়েটে ভর্তি হয়েছিলেন বলে জানান তার বাবা নূর উদ্দিন।
ফারদিনের চাচাতো ভাই সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ফারদিনের সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনসহ সবকিছু ঠিকঠাক পাওয়া গেছে। অজ্ঞান বা মলম পার্টি এ ঘটনা ঘটালে তার সঙ্গে থাকা সবকিছু খোয়া যেত। আমাদের ধারণা, এটি হত্যাকা-। পুলিশকে তদন্তের জন্য ফারদিনের ব্যবহৃত ল্যাপটপ দিয়েছি আমরা। ওখান থেকে যদি তারা কোনো সূত্র খুঁজে পায়।’
নারায়ণগঞ্জ সদর নৌ-পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মনিরুল ইসলাম বলেন, সোমবার বিকেলে অজ্ঞাত হিসেবে ফারদিনের লাশ উদ্ধার করা হয়। তখন ফারদিনের পকেটে একটি মোবাইল ফোন পাওয়া যায়। ওই ফোন থেকে সিম কার্ড বের করে অন্য একটি মোবাইল ফোনে লাগানো হলে এক মিনিটের মধ্যে তার মা ফারহানা ফোন দেন। তখন তার কাছ থেকে ফারদিনের পরিচয় জানা যায়। পরে ফারদিনের মা-বাবা এসে লাশ শনাক্ত করেন।
নিখোঁজের জিডির তদন্ত বিষয়ে রামপুরা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. গোলাম মওলা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখনো কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হায়াতুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা জানি না পরিবার মামলা কোথায় করবে। আসলে রামপুরাতে তার কিছুই নেই। এখান থেকে সে নিখোঁজও হয়নি। আমরা যেটা জানতে পেরেছি তার বান্ধবীর সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে রামপুরা গিয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে খোঁজার জন্য পরিবার আমাদের কাছে আসে, আমরা তাদের সহযোগিতা করেছি।’ তদন্তে ফারদিনের বান্ধবীর সঙ্গে ঝামেলার বিষয়ে কিছু জানা যায়নি বলেও জানান তিনি।