রাজনৈতিক পীড়নের পুনরাবৃত্তি ভয়ংকর

এক. ২০১৩ সালে একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল ‘বিএনপি’র দেখানোর পথে আওয়ামী লীগও হাঁটছে?’ পুরনো প্রশ্নটি আবারও ঘুরে-ফিরে আসছে। আমরা খুব সহজে পেছনের ঘটনাগুলো ভুলে যাই। ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগের লংমার্চ নির্মূলের চেষ্টা করেছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করতে গাড়ি, ফেরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় ঢাকাতেই একদিনে গ্রেপ্তার হয়েছে ৮ হাজার মানুষ। মতিয়া চৌধুরীকে রাস্তায় ফেলে পুলিশ দিয়ে পেটানো, ইডেনে ছাত্রদলের নির্বিচারে ছাত্রী পেটানোর ঘটনাও ঘটেছে। ফলে এ কথা বলা যাবে না আওয়ামী লীগের অগণতান্ত্রিক আচরণের অভিযাত্রা নতুন। প্রশ্ন হচ্ছে, খারাপ উদাহরণগুলোরই কি চর্চা চলবে? বিএনপি যে পথ দেখিয়েছে, তাদের দেখানো পথেই আওয়ামী লীগও হাঁটছে। তবে এ হাঁটায় আরও বেশি হুঙ্কার।

দুই. এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ। পুরোটা সময় ক্ষমতা দখলে মরিয়া বিএনপি ও তার জোট। তবে ক্ষমতা ছাড়তে চায় না আওয়ামী লীগ। কারণ, দলটির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের অভিযোগ জমে গেছে। ক্ষমতা হারালে দলটিকে অনেক হিসাব দিতে হবে। এ ভয় থেকেই বিরোধীদের থামাতে তারা তৎপর। হামলা-মামলা দিয়েই তারা প্রতিপক্ষকে থামিয়ে দিতে চায়। অতীতে এ পথে তারা সফলও হয়েছে। কিন্তু কতদিন সেটা? বিরোধীদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে সরকার কতটা লাভবান হচ্ছে বা আদৌ হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর তারাই ভালো দিতে পারবে। তবে বিএনপির সমাবেশে নানা ধরনের বাধা ও প্রতিকূলতা সৃষ্টি করায় ঝিমিয়ে পড়া দলটি যে গা-ঝাড়া দিয়ে উঠেছে, তা মোটামুটি স্পষ্ট। এ জন্য আওয়ামী লীগকে ধন্যবাদ জানাতে পারে বিএনপি।

তিন. কয়েক বছর ধরে পৃথিবীর নানা প্রান্তে কর্তৃত্ববাদী নেতাদের আবির্ভাব ঘটছে। প্রশ্ন উঠছে, গণতন্ত্র কি তবে বিপন্ন? গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটি বহুমাত্রিক, যার অন্যতম মাত্রা হলো, জাতি-বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে দেশের যে কোনো নাগরিকের কিছু বিশেষ অধিকারের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠা। নির্বাচিত সরকার সংবিধানের সম্মান বজায় রাখছে কি না, তা দেখার দায়িত্ব দেশের বিচারবিভাগ আর সংবাদমাধ্যমের। তাই কোনো দেশে এই দুটি স্তম্ভ স্বাধীন আর শক্তিশালী না হলে সেই দেশকে গণতান্ত্রিক বলা যায় না। আমাদের দেশে সরকার ও প্রধান বিরোধী দল দুই পক্ষই গণতন্ত্রের অপরিহার্য বিষয়গুলোকে বাদ দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া আর ক্ষমতায় টিকে থাকাকে একমাত্র ইস্যু বানিয়ে তুলছে। কিন্তু গণতন্ত্রের সমস্যা কি শুধুই এ দুটো বিষয়? দুটো দলই তার মতো করে স্বৈরাচারী মনোভাব দেখিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতায় থাকলে তারাই আবার প্রতিপক্ষকে ‘প্রতিযোগিতার সমান ক্ষেত্র’ থেকে বঞ্চিত রেখে নিজের সুবিধার জন্য সবরকম অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে থাকে। গণতন্ত্র সম্পর্কে তাদের ধারণা জমিদারতন্ত্রের মতো। তারা বিরোধী দলে থাকাবস্থায় নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থে গণতন্ত্রের প্রত্যাশী হয়ে ওঠে। গণতন্ত্র তাদের কাছে নীতি-আর্দশের বিষয় নয়। স্রেফ ক্ষমতায় যাওয়ার উদ্দেশ্য একটি কৌশলগত হাতিয়ার মাত্র। সেখানে আলাদাভাবে কোনো দলকে দেখার কিংবা পক্ষ নেওয়ার সুযোগ কই!

চার. আগের মতো আমরা খোলামেলা অনেক কিছুই বলতে পারি না, বললেও তা ইনিয়ে-বিনিয়ে, হাত কাঁচুমাচু করে বলতে হয়। আমাদের সামনে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নামে কালাকানুন। আচ্ছা, বিএনপি ক্ষমতায় এলে এ আইন কি বাতিল হবে? আমার মনে হয় না। বরং বিএনপি আরও জোরালো করবে। অতীতে আমরা দেখেছি, র‌্যাব গঠন নিয়ে আওয়ামী লীগ সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করেছিল, ক্ষমতায় গিয়ে সেই র‌্যাবকে সঙ্গে রেখেছে। নিজে এখন যেটা বলার সাহস পাই না, সেই কথাগুলো চালাকি করে অন্যকে উদ্ধৃত করে বলি। যেমন অধ্যাপক রেহমান সোবহান কয়েক মাস আগে এক সেমিনারে বলেছিলেন যে, ‘পাকিস্তান আমলে যেসব কথা বলতে দ্বিধাবোধ করতেন না, সে ধরনের কথা এখন আর বলা যায় না।’

পাঁচ. অনির্বাচিত কিন্তু বিশেষ ধরনের নেতৃত্বগুণসম্পন্ন কিছু মানুষ রয়েছেন, ইংরেজিতে যাদের ‘এলিট’ বলা হয়। গণতন্ত্রকে বলা যেতে পারে এই এলিটদের সঙ্গে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতা ভাগ করে নেওয়ার একটি প্রক্রিয়া। সব দেশে এই প্রক্রিয়া এক রকম নয়। কোন দেশ জনপ্রতিনিধিদের, আর কোন দেশ অনির্বাচিত এলিটদের বেশি ক্ষমতা দেবে, তা ওই দেশের ইতিহাস আর পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। কোনো দেশে ঠিক কতটুকু গণতন্ত্র আছে, সেটা বলতে গেলে অনেক কিছুই হিসাবের মধ্যে আনতে হয়। গণতন্ত্রে এলিটদের প্রভাবে পড়ছে স্পষ্ট কর্তৃত্ববাদের ছাপ। আর কর্তৃত্ববাদ অল্প হলেও গণতন্ত্রের কিছু ভালো দিককে নিজের করে নিয়ে সেই গণতন্ত্রেরই আদর্শগত বিকল্প হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে অর্থনৈতিক স্বার্থের লোভ দেখিয়ে। বর্তমান পৃথিবীতে গণতন্ত্র আর কর্তৃত্ববাদের সীমারেখাটি তাই ক্রমশ সঙ্কীর্ণ হতে হতে মিলিয়ে যাওয়ার পথে।

ছয়. ‘রাজনীতি কোনদিকে এগোচ্ছে’ পথেঘাটে এ আলোচনা সরব। বিএনপির জনৈক নেতাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি জবাব দেন, ‘আওয়ামী শাসনের পতন নিশ্চিত’। বললাম কীভাবে, তেমন আন্দোলন তো দেখছি না। বললেন, ‘হচ্ছে, টেলিভিশন দেখেন না?’ বললাম, ‘জনতা তো মাঠে নামছে না’। তিনি হেসে বললেন, ‘আমেরিকা আমাদের সঙ্গে আছে’। অন্যদিকে ভারতকে সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে অনুরোধ করেছেন। বিদেশের ওপর নির্ভরতা, দেশের মানুষের ওপর না। এ দুই দলের মারামারি, সংঘর্ষ, বড় বড় কথা সবই ক্ষমতায় থাকার জন্য এবং ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য; দেশের মানুষের স্বার্থে নয়। তারা ব্যবস্থা বদলের কথা বলে না, শুধু ক্ষমতাটা দখল করতে চায় যেনতেনভাবে। উভয়ই বাজার অর্থনীতির দর্শনে বিশ্বাসী।

সাত. বামপন্থিরা মাঠে আছে, তবে তা সীমিত শক্তি নিয়ে। প্রচলিত ব্যবস্থা বদল ও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের কথা বলছে তারা। এমন গণতন্ত্রের কথা বলছে যাতে ভোট ও ভাতের অধিকার নিরন্তর চালু থাকে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষ ও দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবী, শিল্পপতি তথা আপামর জনসাধারণের ঐক্যের কথা বলছে। কিন্তু তাদের প্রতি আস্থা রাখতে পারছে না মানুষ। কেন? সে সলুকসন্ধান করতে ব্যর্থ হচ্ছে বামপন্থিরা। সংগঠনের দুর্বলতা আছে, অন্তর্দ্বন্দ্ব, মতাদর্শগত দূরত্ব আছে, তাই বোধকরি তাদের আহ্বান মানুষের মধ্যে সেভাবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে না। তাহলে প্রশ্ন তো এসেই যায় সমাধানের পথ কী? বর্তমানে আমাদের দেশে ধনিকগোষ্ঠী ক্রমশ সুসংগঠিত শক্তি। তারা গণমানুষের পক্ষে শাসনব্যবস্থা বদল হতে দেবে না, প্রচ- বাধা সৃষ্টি করবে, তাদের সহায়তা করবে সাম্রাজ্যবাদ। সুতরাং কাজটি মোটেও ফুল বিছানো পথে নয়। লড়াইয়ের মাঠে বামপন্থিদের নিজেদের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করতে হবে। মানুষের মধ্য থেকে তাদের সমস্যা নিয়ে সংগ্রাম করে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হবে। বেনিয়া-পুঁজিবাদ যে সমাজচেতনার জন্ম দিয়েছে তা ভাঙতে হবে প্রগতিশীল চেতনার বিকাশ ঘটিয়ে। কাজটি যত কঠিনই হোক এর বিকল্প নেই।

আট. বামপন্থি তথা কমিউনিস্ট পার্টি সম্পর্কে অনেক সংশয় রয়েছে। অভিযোগও আছে। কঠোর সমালোচনা তাদের প্রাপ্য, আত্মসংশোধনের জন্য তাদের ওপর ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাওয়াও জরুরি। তবে রাজনীতির নিজস্ব প্রয়োজনে এবং যুক্তিতেই অদ্ভুত আঁধারে কমিউনিস্ট পার্টির মতো দলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণেই একটা বড় প্রশ্ন হলো, দলের নেতা ও কর্মীরা কি মুখস্থ বুলি ও ছকের বাইরে গিয়ে নতুন রাজনীতি ভাবতে পারবেন? প্রতিস্পর্ধী বাম রাজনীতিকে নতুন করে গড়তে হবে, তার ভিত্তিতে নিজস্ব নীতি ও কর্মসূচি তৈরি করে প্রত্যয়ের সঙ্গে জনসমাজের সামনে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু সেই নবনির্মাণের কাজটি বামপন্থি লোকেরা করে ফেলবেন এবং জনসাধারণকে তা বুঝিয়ে দেবেন এই পুরনো অহংকার-দম্ভ ছেড়ে দেওয়া দরকার। জনসংযোগ দরকারি। কেবল নিজেদের কথা প্রচার করা নয়, শ্রমজীবী মানুষের কথা মন দিয়ে শোনা এবং তা থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা নিতে হবে। তাদের চাহিদা ও দাবিগুলো জানা দরকার, কোন অবস্থান এবং ধারণা থেকে সেই চাহিদা উঠে আসছে বোঝা দরকার। অনুধাবন করা দরকার, তারা নিজেদের অধিকার বলতে আজ কী বোঝেন। তাদের পাশে দাঁড়িয়ে, তাদের সঙ্গে কাজ করে, তাদের প্রতিদিনকার জীবনের সক্রিয় অংশীদার হয়েই প্রকৃত অংশগ্রহণ সম্ভব। কথায় ও কাজে শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে যৌথভাবে প্রতিস্পর্ধী রাজনীতি গড়ার পথে এগোতে পারলে হয়তো ‘সমাজের যৌথ নীতিবোধ’-এর সন্ধান পাওয়া যাবে। ইতিহাস ফিরে আসে না, কিন্তু ইতিহাস থেমেও থাকে না। আবার ইতিহাসের ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি খুবই ভয়ংকর।

লেখক: সহকারী সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন

emonn.habib@gmail.com