সেতুর অভাবে আত্রাইয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার

সম্প্রতি পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় করতোয়া নদীতে উত্তরাঞ্চলের ইতিহাসে ভয়াবহ নৌকাডুবির ঘটনায় অন্তত ৭১ জনের মৃত্যু হয়। ঝুঁকি নিয়ে নৌকা পারাপারের সময় তীব্র স্রোতে দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল বলে তদন্তে উঠে আসে। একই নদী দিনাজপুরে এসে আত্রাই নাম ধারণ করেছে। দিনাজপুর সদর ও চিরিরবন্দর উপজেলার মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া সেই আত্রাই নদীতেও একই ধরনের দুর্ঘটনার শঙ্কা রয়েছে। কারণ একটি সেতুর অভাবে যুগ যুগ ধরে ঝুঁকি নিয়ে ওই নদী পার হচ্ছে প্রায় ২০ হাজার মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে একটি সেতুর আকুতি জানালেও কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে প্রতিদিন তীব্র স্রোতকে উপেক্ষা করে নৌকায় যানবাহনসহ সাধারণ মানুষ পারাপার হচ্ছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, সদর উপজেলার বুড়িরহাট ও চিরিরবন্দর উপজেলার পশ্চিম সাইতারা গ্রামের মাঝ দিয়ে চলে গেছে আত্রাই নদী। চিরিরবন্দর অংশের পশ্চিম সাইতারা ও পূর্ব সাইতারা গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষকে চলাচল করতে হয় এই নদীর ওপর দিয়ে। বিকল্প মাটির রাস্তা ব্যবহার করতে গেলে তাদের প্রায় ১৫ কিলোমিটার ঘুরে যাতায়াত করতে হয়। গ্রামের তিন দিকেই নদী। তাই তাদের যাতায়াতের জন্য একটি সেতু খুবই জরুরি। সেতু না থাকায় যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম নৌকা। এছাড়া গ্রাম দুটির ওপর দিয়ে প্রতিদিন বৈদেশিক পাড়া, ইন্দ্রপাড়া, রাবারড্রাম এলাকা ও ডাঙ্গারপাড়ার প্রায় লক্ষাধিক মানুষ যাতায়াত করে। তাদের একমাত্র ভরসা নৌকা।

স্থানীয়রা জানান, পশ্চিম সাইতারা ও পূর্ব সাইতারা গ্রাম থেকে প্রতিদিন ৫০টি ইজিবাইক ও ১৫০টি চার্জার ভ্যান নৌকাযোগে পার হয়ে দিনাজপুর শহরে প্রবেশ করে। প্রতিদিন ৫ শতাধিক শিক্ষার্থী নৌকাযোগে পার হয়ে বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে যায়। গড়ে প্রতিদিন ১ হাজার মোটরসাইকেল নৌকায় পার হয়। এছাড়া প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক শহরে বিভিন্ন কাজের সন্ধানে যান। ফলে নৌকায় পারাপারের অপেক্ষায় সময় পার করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ভালো সড়ক না

থাকায় গ্রাম দুটিতে এখন পর্যন্ত ঢুকতে পারেনি কোনো অ্যাম্বুলেন্স। অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নিতে নৌকার অপেক্ষায় থাকতে থাকতেই অনেক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। গত প্রায় তিন বছরে এরকম অন্তত পাঁচজন মারা যাওয়ার তথ্য দেন স্থানীয়রা।

চিরিরবন্দর উপজেলার পশ্চিম সাইতারা গ্রামের ৬৮ বছরের বৃদ্ধ রবিন চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমার দাদারাও এই নৌকা দিয়ে পার হয়ে শহরে গেছে, আমার বাবাও গেছে, আমাকেও যেতে হচ্ছে, আমার ছেলেকেও যেতে হচ্ছে। কিন্তু মরার আগে নৌকার স্থলে একটা ব্রিজ দেখে যেতে চাই। ব্রিটিশ, ভারত কিংবা স্বাধীনতার এত বছরে বহু সরকার ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু আমাদের কষ্টের কথা কেউ শুনেনি।’

একই গ্রামের কৃষক সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমাদের গ্রামে শাক-সবজি, ধানসহ সব ফসল উৎপাদন হয়। কিন্তু যোগাযোগের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় ঠিক দাম পাই না। নৌকায় ধান ও সবজি নিয়ে যাওয়ার সময় অনেক সময় নৌকা ডুবে ধান-সবজি নদীতে ভেসে যায়।’

সাবেক ইউপি সদস্য জিকরুল হক বলেন, ‘আমরা একটা দ্বীপের মধ্যে বাস করছি। অনেক শ্রমিক সকাল ৭টায় শহরে যাওয়ার জন্য ঘাটে আসে। কিন্তু নৌকার সিরিয়াল পেতে সকাল ১০ থেকে ১১টা বেজে যায়। আবার বাড়ি ফেরার সময়ও একই ভোগান্তি।’

চিরিরবন্দর উপজেলা প্রকৌশলী ফারুক হাসান বলেন, ‘পশ্চিম সাইতারা ও সদরের মাঝামাঝিতে একটি সেতু নির্মাণ করা জরুরি। সেতুটি নির্মাণের জন্য আমরা ইতিমধ্যেই সদর উপজেলার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি।’