লাল-সবুজ ও হলুদে ছেয়ে গেছে রাজধানী ঢাকার অধিকাংশ রাজপথ। গতকাল শুক্রবার ছিল আওয়ামী লীগের অন্যতম সহযোগী সংগঠন যুবলীগের প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর। সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুব সমাবেশের আয়োজন করে সংগঠনটি। এ আয়োজনে যোগ দিতে নেতাকর্মীরা মাথায় লাগান লাল-সবুজ ও হলুদ রঙের ক্যাপ। গায়ে জড়ান একই রঙের গেঞ্জি। যুব মহাসমাবেশকে করে তোলেন দৃষ্টিনন্দন।
বিএনপি আয়োজিত বিভাগীয় শহরগুলোতে সরকারবিরোধী মহাসমাবেশের জবাবে রাজধানীতে পাল্টা শো-ডাউন করার লক্ষ্য নিয়ে এই আয়োজনে নেতাকর্মীদের ঢল নামে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এই জনস্রোতকে মহাসমুদ্র, যুব-জনতার মহাসমুদ্র বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, চারদিকে শুধু যুব জনতার ঢল। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকেও সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন যুব মহাসমাবেশে। দুপুর ২টায় সমাবেশ শুরু হওয়ার নির্ধারিত সময় হলেও সকাল ৯টা থেকেই সারা দেশ থেকে যুবলীগের নেতাকর্মীরা ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে নানা রঙের টিশার্ট পরে, ক্যাপ মাথায় দিয়ে ও প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে বাদ্যবাজনা বাজিয়ে সমাবেশস্থলে আসতে শুরু করেন। বেলা বাড়তে বাড়তে জনস্রোতও বেড়ে যায়। সাপ্তাহিক ছুটির দিন হলেও ঘর থেকে বের হওয়া মানুষকে যানজটের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। সড়কে যানবাহনের উপস্থিতি ছিল কম। ফলে বাসা-বাড়ি থেকে যারা বেরিয়েছেন সেসব মানুষকে বেশি ভাড়ায় রিকশা-সিএনজি অটোরিকশায় ফিরতে হয়েছে। রাত পর্যন্ত যানজটের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে নগরবাসীকে।
যুবলীগের এ মহাসমাবেশ উপলক্ষে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি ঢাকা মিছিলের শহরে পরিণত হয়। ঢাকার সবদিক ও সব সড়ক থেকে আসা নেতাকর্মীদের মিছিলে মিছিলে মুখরিত হয়ে ওঠে ঢাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আশপাশের এলাকা। এদিকে যুবলীগের বিভিন্ন ইউনিটের পদপ্রত্যাশীদের ছবি সংবলিত পেস্টুন, ব্যানার নিয়ে আলাদা আলাদা শো-ডাউন দেওয়া হয় যুব সমাবেশে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শেখ ফজলুল হক মনির নেতৃত্বে ১৯৭২ সালের আজকের দিনে ঢাকা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে যুব কনভেনশনে যুবলীগ প্রতিষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে আসা যুব সংগঠনের নেতাকর্মীরা গুলিস্তানের জিরো পয়েন্ট, মৎস্যভবন, শাহবাগ, কাকরাইল, সেগুনবাগিচা, এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, দোয়েল চত্বরসহ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সব দিক দিয়েই জড়ো হতে থাকেন। তাদের সবার মুখে সেøাগান ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’। আবার আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক নৌকা, নৌকা বলেও সেøাগান শোনা যায়। যুবলীগের যুব সমাবেশ সফল করতে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীরাও সমাবেশে যোগ দেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের রমনার গেট দিয়ে সরকারের সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও মন্ত্রীরা সমাবেশে প্রবেশ করেন। এ ছাড়া টিএসসির রাজুভাস্কর্য গেট, মেট্রো রেলের স্টেশন গেট, রমনা কালীমন্দির গেট দিয়ে সারা দেশ থেকে আসা দলীয় কর্মী-সমর্থক প্রবেশ করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সবাইকে তল্লাশি করে সমাবেশের ভেতরে ঢোকান।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুবলীগের এই আয়োজনের উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বেলা আড়াইটার পর তিনি অনুষ্ঠানস্থলে এসে পৌঁছান। তখনই শুরু হয় সমাবেশের কার্যক্রম। সমাবেশ মঞ্চে উঠে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনির বড় ছেলে সংগঠনের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ দলীয় পতাকা উত্তোলন করে উদ্বোধন করেন যুব মহাসমাবেশ। এরপর বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে, জাতীয় সংগীত গেয়ে যুবলীগের সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করা হয়। পরে আওয়ামী লীগ সভাপতিকে সভামঞ্চে ফুল দিয়ে বরণ করেন পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল। শেখ হাসিনাকে যুবলীগের পক্ষ থেকে ক্রেস্ট তুলে দেন। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারী শুরুর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এটাই প্রথম রাজনৈতিক সমাবেশ। যেখানে সরাসরি উপস্থিত হন তিনি।
যুব মহাসমাবেশে যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ বলেছেন, বিএনপির সময় বাংলাদেশকে বলা হতো ‘ব্রিডিং গ্রাউন্ড অব টেররিজম’। সেখান থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশকে এখন বলা হচ্ছে ‘নেক্সট এশিয়ান টাইগার’। উন্নয়নের পুরোটাই নেতৃত্বের দূরদর্শিতার ওপর নির্ভর করে এবং শেখ হাসিনা তার প্রমাণ রেখে চলেছেন।
অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বিশ্বের সেরা ক্রাইসিস ম্যানেজার দাবি করেন। পরশ বলেন, দলীয় নেতাকর্মীরা অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করুন। আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় আনতে আগামী ১৪ মাস ঘরে বসে না থেকে, পরিবারকে সময় না দিয়ে নিরলস কাজ করতে নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে মহাসমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে সব গিলে খাবে। গণতন্ত্র গিলে খাবে। নির্বাচন গিলে খাবে। বিদেশি ঋণ গিলে খাবে। সুযোগ পেলে বাংলাদেশ পর্যন্ত গিলে খাবে।
বিএনপিকে উদ্দেশ করে ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, ‘খেলা হবে। খেলা হবে। হবে খেলা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে। দুঃশাসনের বিরুদ্ধে। লুটপাটের বিরুদ্ধে। খেলা হবে বিএনপির বিরুদ্ধে। আগুন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। খেলা হবে ভোট চুরির বিরুদ্ধে। তৈরি হয়ে যান। প্রস্তুত হয়ে যান। জবাব দেব।’
আইএমএফের ঋণের সমালোচনার জবাবে সেতুমন্ত্রী বলেন, ‘ফখরুল বলেন আমরা ঋণ নিয়েছি। আমরা ঋণ নিয়েছি ঘি খাওয়ার জন্য নয়। বিএনপি ঋণ নিয়েছিল ঘি খাওয়ার জন্য। আমাদের ঋণ পরিশোধ হয় বলেই আজকে আইএমএফ খুব সহজে বাংলাদেশকে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে। কারণ, আইএমএফ জানে শেখ হাসিনা সময়মতো ঋণ পরিশোধ করে। সে কারণে তারা ঋণ দিয়েছে।’
যুবলীগের এ আয়োজন নিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, এটা যুব সমাবেশ নয়, এটা মহাসমুদ্র। যুব-জনতার মহাসমুদ্র। এদিকে সেদিকে মানুষ। চারদিকে শুধু যুব জনতার ঢল।