আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে ঢাকাসহ সারা দেশের হাসপাতালগুলোর শিশু ওয়ার্ডে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশু রোগী বাড়ছে। তিন মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুরা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। হাসপাতালগুলোতে অনেক ক্ষেত্রে ডেঙ্গু রোগীকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে নিউমোনিয়া রোগীর চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে বহির্বিভাগ ও আন্তঃবিভাগের ভর্তি রোগীর ৫০ শতাংশের বেশি নিউমোনিয়া আক্রান্ত। অন্যদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৪৫০-৫০০ রোগী ঠা-া, জ¦র ও কাশি নিয়ে আসছে। এদের মধ্যে ১৫ শতাংশ রোগী নিউমোনিয়াসহ শ্বাসকষ্টজনিত রোগে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।
এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস পালিত হচ্ছে আজ। নিউমোনিয়া সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য‘নিউমোনিয়া এফেক্টস এভরিওয়ান’ অর্থাৎ ‘নিউমোনিয়া সবাইকে আক্রান্ত করে’। দিবসটি উপলক্ষে দেশের সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া বেসরকারি কিছু সংগঠনও এ কর্মসূচি পালন করবে।
দেশে প্রতি বছর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ২৫ হাজার শিশুর মৃত্যু হয়। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৬৮-এর বেশি শিশু মারা যাচ্ছে। নিউমোনিয়া আক্রান্তদের মধ্যে রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতি (হাইপক্সেমিয়া) একটি জটিল সমস্যা। রক্তের অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে শিশুদের বেশি মৃত্যু হচ্ছে। যা সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। নিউমোনিয়া আক্রান্ত শিশুদের যদি রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতি কমানো যায় তাহলে মৃত্যু কমবে। তাই জেলা, উপজেলা হাসপাতালে পর্যাপ্ত অক্সিজেনের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
তারা বলছেন, দেশে প্রতি বছর ৬০ লাখ শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশই হাইপক্সেমিয়ায় ভোগে।
মহাখালীর আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী বিজ্ঞানী ডা. আহমেদ এহসানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটি শিশু একাধিকবার আক্রান্ত হতে পারে। হাইপক্সেমিয়ায় আক্রান্ত যেকোনো রোগীর জন্য চিকিৎসা হিসেবে অক্সিজেন থেরাপি প্রয়োজন।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, চলতি বছর অক্টোবর পর্যন্ত ২ হাজার ৪৩৪ জন নিউমোনিয়ার রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৬, ফেব্রুয়ারিতে ২১৬, মার্চে ৩৩০, এপ্রিলে ২২৬, মে’তে ২৫০, জুনে ২১৫, জুলাইয়ে ১৬৯, আগস্টে ১৮০, সেপ্টেম্বরে ১৭০, অক্টোবরে সবচেয়ে বেশি ৩০৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ ছাড়া চলতি মাসের ১০ দিনে হাসপাতালে রোগী ভর্তি হয়েছে ৮৪ জন। এর আগের বছর নিউমোনিয়ার চিকিৎসা নিতে ২ হাজার ২২৭ শিশু এ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল।
তাদের তথ্যমতে, গত চার মাসে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের উপপরিচালক ডা. প্রবীর কুমার সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডেঙ্গুর কারণে নিউমোনিয়া রোগী নিয়ে চিন্তা করার সময় পাওয়া যাচ্ছে না। ২০০ জন নিউমোনিয়া রোগীর চিকিৎসা ৫ জন চিকিৎসক দিয়ে করা যায়। কিন্তু ২০০ জন ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা ৫ জন চিকিৎসক দিয়ে করা যায় না। তাই ডেঙ্গু সামাল দিতে গিয়ে নিউমোনিয়ায় নজর দিতে পারছি না।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. ইফফাত আরা শামসাদ দেশ রূপান্তরেকে বলেন, ‘অক্টোবর-নভেম্বর মাস শিশুদের নিউমোনিয়ার জন্য পিক টাইম। এর আগেও শিশুরা নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়।’ তিনি বলেন, ‘এ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী জন্য নিউমোনিয়া রোগীর চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে বলা যাবে না। একেকটা রোগের একেক ধরনের চিকিৎসা। হাসপাতালে সব রোগীর গুরুত্ব সমান।’
সরেজমিনে শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের আবুল হোসেন রেসপ্যারেটরি সেন্টার ও নিউমোনিয়া রিসার্চ সেন্টারে কথা হয় ভোলার চরফ্যাশনের নাহার আক্তারের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঠা-াজ¦রে আক্রান্ত তার আট বছরের মেয়ে ফাইজাকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক ভোলার সরকারি হাসপাতালে যেতে বলেন। সেখান থেকে আবার ঢাকা পাঠানো হয়। এখানে পাঁচ দিন চিকিৎসা নেওয়ার পর এখন কিছুটা ভালো।’ সিরাজগঞ্জের মুক্তার রানী ১ বছর ১০ মাস বয়সের শিশুকন্যা অনন্যাকে নিয়ে আট দিন ধরে হাসপাতালে। তিনি বলেন, ‘আড়াই মাস আগে একই সমস্যা নিয়ে এ হাসপাতালে এসেছিলাম। আবার একই সমস্যা নিয়ে মেয়েকে আনতে হলো। চিকিৎসকরা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নিতে বলেছিলেন, আমরা নিইনি। টাকাপয়সার সমস্যা আছে।’ বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মুনতাহা তাবাসুম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিউমোনিয়া রোগী অনেক বেশি, সে হিসেবে এখানে চাপ কমই। প্রতিদিন রোগী ভর্তি হচ্ছে। রোগীর অবস্থা খুব খারাপ হলে সুস্থ হতে সময় লাগে। যদি রোগীর অবস্থা মোটামুটি ভালো থাকে তাহলে পাঁচ থেকে আট দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মধ্যে বেশিরভাগ রোগীই ঢাকার বাইরে থেকে এসেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে অক্সিজেনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে। সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন, ফ্লো-মিটার, অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আছে। রোগীর ধরন অনুসারে নিবিড় চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। চিকিৎসকের পরামর্শে রোগীরা এসব সুবিধা নিতে পারে।’
শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুর শ্বাসকষ্ট, জ¦র-কাশি, শ্বাসের সময় বুক ভেতরের দিকে দেবে যাওয়া ইত্যাদি নিউমোনিয়ার লক্ষণ। সাধারণত শীতকালে এ রোগের প্রকোপ বাড়ে। তাই মায়েদের আরও বেশি সচেতন হতে হবে। লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
তারা বলেছেন, অপুষ্টির কারণে যেসব শিশুর রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং যেসব শিশু উচ্চমাত্রার বায়ুদূষণ ও অনিরাপদ পানি পান করছে তারা অনেক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। শিশু জন্মের পর ছয় মাস শুধু মায়ের বুকের দুধ এবং পরে অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হবে। পাশাপাশি সময়মতো টিকা দিলে এ ঝুঁকি কমে।