হালদার ঐতিহ্য ফেরাতে নতুন উদ্যোগ

দেশের কার্প জাতীয় মাছ উৎপাদনের একমাত্র প্রাকৃতিক উৎস হালদা নদী মানবসৃষ্ট বিভিন্ন দূষণে প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে। ১৯৪৬ সালে যেখানে ৪ হাজার ১১১ কেজি রেণু উৎপাদন হতো, ২০০৩-০৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ২০ কেজিতে। তাই হালদা নদীর প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র সুরক্ষা, সংরক্ষণ ও উন্নয়নের উদ্দেশ্যে মৎস্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। হালদা নদীর প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প (২য় পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্পে শুধু পুকুর খননেই ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ কোটি টাকা।

প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা মৎস অধিদপ্তর। এটি বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছে চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত। সাধারণত যেকোনো নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়ার ক্ষেত্রে মেয়াদ ৩ বছর প্রাক্কলন করার বিধান রয়েছে।

প্রকল্প প্রস্তাবে দেখা যায়, প্রস্তাবিত প্রকল্পে আলাদা খাতে পুকুর খননের জন্য ১২ কোটি ১৪ লাখ টাকার সংস্থান রয়েছে। এর বাইরে আবার হ্যাচারি নির্মাণের মধ্যেও পুকুর পুনরায় খননের জন্য ৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। হ্যাচারিগুলোর মধ্যে রয়েছে হাটহাজারীর মদুনাঘাট হ্যাচারির পুকুর, রাওজানের মুবারক্ষীল হ্যাচারি পুকুর, হাটহাজারীর মাছুয়াঘোনা হ্যাচারি পুকুর। পরিকল্পনা কমিশন এ নিয়ে প্রশ্নও তুলেছে। এ ব্যয় প্রাক্কলনের যৌক্তিকতা সম্পর্কে মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছে কমিশন।

এ প্রসঙ্গে মৎস্য অধিদপ্তরের অর্থ ও পরিকল্পনা শাখার উপপরিচালক মো. শাহেদ আলী গত শনিবার দেশ রূপান্তরকে জানান, শুধু হ্যাচারিগুলো ডেভেলপ করা হবে যাতে মাছের রেণু বা পোনা নষ্ট না হয়। পুকুরগুলো মূলত লালন পুকুর। এগুলোতে মাছগুলো নিয়ে এলে দেশের বিভিন্ন স্থানে পোনা সরবরাহ করা যাবে। এটার ক্ষেত্রে অবশ্যই সংযোজন বিয়োজন হবে। কর্তৃপক্ষ যেটাকে বাদ দিতে বলবে, সেটাকে অবশ্যই বাদ দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, একটি পুকুর খননের পর তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বৃষ্টি ও পাড়ের মাটি এসে ভরাট হয়ে যায়। ২০১৩ সালের খনন করা পুকুরে ইতিমধ্যে পলি জমে ২ থেকে ৩ ফুট অগভীর হয়ে গেছে। সেগুলো পুনঃখননের প্রস্তাব করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশন বলছে, অর্থ বিভাগের বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও ১টি জিপ, ২টি ডাবল কেবিন পিকআপ ও ২টি স্পিডবোট কেনার সংস্থান রাখার যৌক্তিকতা নেই। তাই অর্থ বিভাগের জনবল নির্ধারণ কমিটির সুপারিশ পুনরায় বিবেচনা করে মোটরযান না কেনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের এ কর্মকর্তা বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে যেহেতু নিষেধাজ্ঞা আছে সেজন্য এগুলো এখন সম্ভব না, এগুলোর বাস্তবায়ন হবে না। শুধু প্রকল্পের অধীনে বায়োলজিক্যাল খাতগুলোতে জোর দেওয়া হবে।

এছাড়া প্রকল্পটির একটি খাতে অভিজ্ঞতা বিনিময় সফর বাবদ ৩৩ লাখ টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন এতে প্রশ্ন তুলে বলেছে, এই অভিজ্ঞতা বিনিময় সফরে কারা অংশ নেবে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। এতে সরকারি কর্মকর্তা, নাকি মৎসজীবী শ্রেণির লোক অংশ নেবে তা স্পষ্ট করতে বলেছে পরিকল্পনা কমিশন।

প্রস্তাবিত প্রকল্পে ১ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয়ে মৎসজীবী বা সুফলভোগীদের দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যে সেলাই মেশিন পরিচালনা, হাঁস, মুরগি ও ছাগল পালন, ভ্যান ও রিকশা চালনায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন বলছে, এটি প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় নয় বিধায় এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বিষয়টি প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) থেকে বাদ দিতে হবে।

 মো. শাহেদ আলী বলেন, প্রজেক্ট কমúিøশন (পিসিআর) রিপোর্টের ফলোআপ হিসেবে কাজ করা দরকার। আর ওই নদীটা বঙ্গবন্ধু ফিশারিজ হেরিটেজ হিসেবে পরিচিত। কার্প জাতীয় মাছের প্রজনন সুরক্ষা আরও কীভাবে নির্বিঘেœ করা যায় এবং যেহেতু এ মাছ খুব দ্রুত বাড়ে সেটির রেণু সারা দেশে দেওয়ার জন্য সরকারের উচ্চ মহল থেকে নির্দেশনা আছে সেজন্য প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছে।

এ প্রকল্পের মূল কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে- ৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬তলা বিশিষ্ট অফিস-কাম ল্যাবরেটরি ভবন স্থাপন, ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল নির্মাণ, ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে হ্যাচারির সেøাপ প্রটেকশন, ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ল্যাবরেটরি ইকুইপমেন্ট স্থাপন করা। এছাড়াও রয়েছে ১০টি অগভীর নলকূপ, ৬টি সাব-মার্সিবল পাম্প, সাড়ে চার লাখ ঘনমিটার পুকুর খনন, দেড় লাখ ঘনমিটারের পুকুর পুনঃখনন। এছাড়া ৪ হাজার ৪৭৮ মিটার বাউন্ডারি ওয়াল, হালদার তীরবর্তী অঞ্চল বনায়ন করাসহ আরও বেশ কয়েকটি কার্যক্রম রয়েছে প্রকল্প প্রস্তাবে।