১৫ দিনে মৃত্যু বেড়েছে ৫৩%

দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যু উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। গত মাসের শেষ ১৫ দিনের তুলনায় এ মাসের ১৫ দিনে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও মৃত্যু বেড়েছে অনেক। গত মাসের শেষ ১৫ দিনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১২ হাজার ৫৫৯ ও মারা গেছে ৪৭ জন। সেখানে এ মাসের ১৫ দিনে ভর্তি হয়েছে ১২ হাজার ১১ ও মারা গেছে ৭২ জন। সে হিসেবে গত ১৫ দিনের ব্যবধানে রোগী কমেছে ৪ শতাংশ, কিন্তু মৃত্যু বেড়েছে ৫৩ শতাংশ।

এমনকি এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু ইতিমধ্যেই গত ২২ বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। দেশে ডেঙ্গুর প্রথম প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় ২০০০ সালে। এরপর সর্বোচ্চ প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় ২০১৯ সালে। সে বছর দেশের ৬৪ জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ে ও হাসপাতালে ভর্তি হয় ১ লাখ ১ হাজার ৩৫ জন রোগী। সে বছর মারা যায় ১৭৯ জন। এ বছর এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪৯ হাজার ৯৯২ জন রোগী, অর্থাৎ অর্ধলাখ ছুঁই ছুঁই। কিন্তু গত এক সপ্তাহ আগেই মৃত্যু সর্বোচ্চ রেকর্ড ছাড়িয়েছে। গতকাল পর্যন্ত মারা গেছে ২১৩ জন।

এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর জন্য চিকিৎসকরা তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। এগুলো হলো ডেঙ্গুর রোগীর চিকিৎসায় হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা, রোগীদের দেরিতে ও জটিল অবস্থা নিয়ে হাসপাতালে আসা এবং ডেঙ্গুর ধরন। তবে তারা মনে করেন, শারীরিক পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আগে হাসপাতালে এলে মৃত্যু কমানো সম্ভব। পাশাপাশি চিকিৎসকরা ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমাতে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার প্রজননস্থল দূর করা এবং ব্যক্তিগত প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপরও জোর দিয়েছেন।

এমন অবস্থায় গত ২৪ ঘণ্টায় (গত সোমবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ডেঙ্গুতে আরও আটজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে ২১৩ জনের মৃত্যু হলো। এর আগে কোনো বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ২০০ ছাড়ায়নি। এর আগে এক দিনে এ বছরের সর্বোচ্চ মৃত্যু হয় ৩ নভেম্বর, ৯ জনের।

গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ৬৯২ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪৯ হাজার ৯৯২ জন ডেঙ্গু রোগী। এর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ৩২ হাজার ৫৩৫ আর ঢাকার বাইরে ১৭ হাজার ৪৫৭।

রোগী কমেছে ৪%, মৃত্যু বেড়েছে ৫৩% : গত ১৫ দিনের (১-১৫ নভেম্বর) সঙ্গে তার আগের মাসের শেষ ১৫ দিনের (১৭-৩১ অক্টোবর) ডেঙ্গুর পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই ১৫ দিনে দেশে ডেঙ্গু রোগী কমেছে ৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ, কিন্তু মৃত্যু বেড়েছে ৫৩ শতাংশ। এখন পর্যন্ত  ঢাকায় মৃত্যু হয়েছে ১২৬ জনের, যা মোট মৃত্যুর ৫৯ শতাংশ এবং বাকি ৮৭ জন মারা গেছে ঢাকার বাইরে।

ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম বিভাগ ও কক্সবাজার জেলায় সর্বোচ্চ মৃত্যু : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুর মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে, ৫৪ জনের; যা ঢাকার বাইরের মোট মৃত্যুর (৮৭ জন) ৬২ শতাংশ। এরপর খুলনা বিভাগে ১১, বরিশালে ৯, রাজশাহীতে ৬, ময়মনসিংহে ৫ ও ঢাকা বিভাগে ২ জন মারা গেছে। রংপুর ও সিলেট বিভাগে কেউ মারা যায়নি।

অন্যদিকে, জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারা গেছে কক্সবাজারে ২৪ জন, যা ঢাকার বাইরের মোট মৃত্যুর ২৮ শতাংশ। এরপর চট্টগ্রাম জেলায় ১৬ জন, ১২ জন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৯, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫, পাবনা জেলা ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪ জন করে, নড়াইলে ২ এবং মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, খাগড়াছড়ি, ফেনী, বাগেরহাট, কুষ্টিয়া, বগুড়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পাবনা জেলায় ১ জন করে মারা গেছে।

তিন কারণে মৃত্যু বাড়ছে : ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (মিটফোর্ড হাসপাতাল) দুই পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু বাড়ার তিনটি কারণ পাওয়া গেছে। রাজধানীর ২০টি সরকারি ও ৩৩টি বেসরকারি হাসপাতালে এখন পর্যন্ত ৪৩ জন ডেঙ্গুতে মারা গেছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে এ দুই হাসপাতালে। মিটফোর্ড হাসপাতালে মারা গেছে ২২ ও ঢামেক হাসপাতালে ২১ জন।

এ ব্যাপারে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. নাজমুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের এখানে সব ক্রিটিক্যাল কেস (জটিল রোগী) আসে। যাদের বিভিন্ন জায়গায় ভর্তি করাতে পারে না, সেসব রোগীকে এখানে পাঠিয়ে দেয়। এত ক্রিটিক্যাল কেস যে কিছু করার থাকে না। এসব রোগীর ৮০ শতাংশই ভর্তির দুয়েক দিনের মধ্যেই মারা যাচ্ছে। অনেক খারাপ অবস্থায় আসে বলেই মৃত্যুবরণ করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ ছাড়া এসব রোগীর যেভাবে সাপোর্ট দেওয়া দরকার, বিভিন্ন কারণে কোনো কোনো রোগীর ক্ষেত্রে সেই সাপোর্ট সেভাবে দিতে পারছি না। কিন্তু মূল বিষয় রোগীরা এমন সময়ে আসে, যখন তাদের যেভাবে নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে চিকিৎসা দরকার, সেটা দেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় সেটা দেওয়ার পরও বাঁচানো সম্ভব হয় না।’

ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু কিছু সীমাবদ্ধ আছেই। যে মুহূর্তে রোগীকে আইসিইউতে নেওয়া দরকার, আমরা তো সেটা পারি না, আইসিইউ বেড ভর্তি থাকে। যেভাবে নিবিড় পরিচর্যা করা দরকার হয়, সেই মুহূর্তে সেটা করতে পারি না। ডেঙ্গুর যে ক্রিটিক্যাল কেস, চিকিৎসার সময়টুকুও পাওয়া যায় না। আমরা গত অক্টোবর মাসে ১ হাজার ১৪৭ জন রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছি। এ মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত প্রায় ৫৯৯ জন ভর্তি হয়েছে। এ ১ হাজার ৬০০ জনের মধ্যে প্রায় সবাই ক্রিটিক্যাল। সে হিসেবে মারা গেছে মোট ভর্তি রোগীর শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ বা ১ শতাংশের কম। সেই হিসেবে মৃত্যু কম। কিন্তু ডেঙ্গুতে মৃত্যু হওয়ার কথা নয়।’

মৃত্যু কমানোর পরামর্শ হিসেবে ডা. নাজমুল হক বলেন, ‘রোগীকে সময়মতো হাসপাতালে আসতে হবে ও চিকিৎসককে দেখাতে হবে। ডেঙ্গুর যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা, তাতে জ¦র হলেই চিকিৎসক দেখাতে হবে। চিকিৎসক যে পরামর্শ দেন, সেভাবে যদি রোগী চলাফেরা করেন, তাহলে অবশ্যই মৃত্যু কমে আসবে। চিকিৎসক ও নার্সদের আরও ব্যাপকভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।’

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (মিটফোর্ড হাসপাতাল) পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. কাজী মো. রশিদ উন নবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবার মৃত্যু অনেক বেশি। ডেঙ্গুর যে চারটি ধরন আছে, কোনো রোগী যদি দ্বিতীয়বার অন্য ধরন দ্বারা আক্রান্ত হয়, তাহলে তার জটিলতা অনেক বেশি দেখা দেয়। এবার এ কারণেই ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে জটিলতা বেশি। সে কারণে মৃত্যুও বেশি।’

এই মুহূর্তে দুটি কারণে ডেঙ্গু খুব ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন ডেঙ্গু শুধু ঢাকা শহরেই নয়, সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। দ্বিতীয়ত দ্বিতীয়বার ভিন্ন ধরনের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে।’

তাহলে মৃত্যু কমানোর উপায় কী জানতে চাইলে মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক বলেন, ‘ডেঙ্গু কমানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। মশার প্রজননস্থল দূর করতে হবে। মশার জন্য ব্যক্তিগত প্রতিরোধ ব্যবস্থা করতে হবে। হাসপাতালের বাইরে রোগী বেশি। তারা যেন সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেন। অবস্থা জটিল হওয়ার আগেই হাসপাতালে আসেন। এবার রোগীরা খুব খারাপ অবস্থায় আসছে। এটাই মৃত্যুর অন্যতম কারণ। এটা মানুষকে বোঝাতে হবে।’