সরকার পতনের আন্দোলন, নির্বাচন, ‘রাষ্ট্র রূপান্তর’ করতে জাতীয় ঐক্য গড়ে গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিএনপির সঙ্গে ঐকমত্যে পৌঁছেছে গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক রাজনৈতিক দলগুলো। এই আন্দোলনের রূপরেখা ও কর্মসূচি সমন্বয়ের লক্ষ্যে দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি লিয়াজোঁ কমিটি করা হবে। লিয়াজোঁ কমিটির কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী বর্তমান সরকারের পতন ঘটিয়ে জনগণের সরকার গঠন করা হবে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে গুলশানে দলটির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক দলগুলোর সঙ্গে বিএনপি নেতাদের বৈঠকের পর এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আব্দুর রব।
সংবাদ সম্মেলনে আব্দুর রব বলেন, ‘রাতের অন্ধকারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় আওয়ামী লীগ ব্যালটবাক্স ভরে অনৈতিকভাবে,অবৈধভাবে ক্ষমতায় এসেছে। আজকে দেশে-বিদেশে সবাই এটা জানে। তাই আজকে অবৈধ সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরাতে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। সবাই মিলে শুধু সরকারের পতন ঘটাবে না, ঐক্যবদ্ধভাবে রাষ্ট্র মেরামত করবে, সংস্কার করবে, সংবিধান সংস্কার করবে এবং আন্দোলন ও নির্বাচন দুটোই একসঙ্গে করবে।
সংবাদ সম্মেলনে বৈঠকের বিষয়বস্তু তুলে ধরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে একটা গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টি করতে আমরা একযোগে যুগপৎ আন্দোলন করব। বৈঠকে আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে একমত হয়েছি। ইতিমধ্যে এ কাজ আমরা শুরু করেছি। আমরা রাষ্ট্রের পরিবর্তনের যে কথা বলেছি, সেই পরিবর্তনগুলো আমরা আরও বিস্তারিত আলোচনা করে আশা করি একমত হতে পারব। আমরা এ বিষয়টাকে দ্রুত করার জন্য পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি আলোচনায় বসব এবং শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাব বলে আমরা নিশ্চিত।’
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘আমরা আপনাদের সামনে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি যে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে যুগপৎভাবে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলবার জন্য এখন থেকেই। এ রকম করেই বলতে পারি যে আজকে থেকেই। আমরা আন্দোলনে আছি, সেই আন্দোলনে থাকব। বিএনপির ভিশন-২০৩০-তে বর্ণিত বিভিন্ন প্রস্তাবনার সঙ্গে গণতন্ত্র মঞ্চের প্রস্তাবনার মিল রয়েছে।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আগামী দিনের আন্দোলন-সংগ্রাম সফল করতে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের নিয়ে একটি লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হবে। যার মাধ্যমে আমাদের লক্ষ্য, আমাদের দফাগুলো, আমাদের কর্মসূচি, রূপরেখা সবগুলো থাকবে। এসব বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, আপাতত যুগপৎ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে পারব এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আমরা অবৈধ সরকারকে পরাজিত করতে সক্ষম হব।’
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি নির্বাচনের বিষয় স্পষ্ট করে বলেন, ‘এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে আমরা কেউ যাব না। আমরা যেটা দাবি করেছি, সেটা হচ্ছে এই সরকারের পদত্যাগ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন ও বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে।’
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পাটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এমন জোট তৈরি করব যারা একসঙ্গে আন্দোলন, নির্বাচন ও রাষ্ট্রের রূপান্তর ঘটাতে রাজি হবে। দেশে যাতে বারবার ক্ষমতায় গিয়ে কেউ স্বৈরাচার হতে না পারে, জনগণের বাইরে যেতে না পারে।’
এর আগে বেলা ১১টা ৪০ মিনিট থেকে টানা প্রায় তিন ঘণ্টা বৈঠক চলে। বৈঠকে গণতন্ত্র মঞ্চের প্রতিনিধিদলে ছিলেন জেএসডির আ স ম আব্দুর রব, শহিদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, শহীদুল্লাহ কায়সার, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, আকবর খান, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, আবুল হাসান রুবেল, গণ অধিকার পরিষদের সদস্য সচিব ফারুক হাসান, ভাসানী অনুসারী পরিষদের শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু, হাবিবুর রহমান রিজু এবং রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের ইমরান ইমন, সৈয়দ হাসিব উদ্দিন হোসেন প্রমুখ। বিএনপি মহাসচিবের সঙ্গে ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। গণ অধিকার পরিষদের আহ্বায়ক রেজা কিবরিয়া বিদেশে ও সদস্য সচিব নুরুল হক নুর একটি দূতাবাসে সাক্ষাৎকারে থাকায় তারা বৈঠকে অংশ নিতে পারেননি বলে জানান গণতন্ত্রের মঞ্চের নেতারা। চলতি বছরের ৮ আগস্ট জেএসডি, নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণ অধিকার পরিষদ, ভাসানী অনুসারী পরিষদ ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনএ সাতটি দল নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে গণতন্ত্র মঞ্চ। পৃথক মঞ্চ থেকে তারা আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের দাবি করে আসছে। সরকার পতনের আন্দোলনের দাবিনামা চূড়ান্ত করতে গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে এই সংলাপে বসল বিএনপি। ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ গঠনের পর এটি বিএনপির সঙ্গে তাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। এর আগে চলতি বছরের মে-জুন মাসে গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক জেএসডি, নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন ও গণ অধিকার পরিষদের সঙ্গে আলাদাভাবে সংলাপ করেছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।