মাদকের ঘাটে ঘাটে বখরা

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চনপাড়া বস্তির (চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র) মূল ফটক দিয়ে ঢুকে এক কিলোমিটার ভেতরে ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নব কিশলয় উচ্চ বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশে কাইলা রায়হানের তিনতলা ভবন। গত সোমবার বিকেলে ওই ভবনের কাছাকাছি গেলে দেখা যায়, ভবন লাগোয়া সরু রাস্তার সামনে ১৫ থেকে ২০ বছরের ৮-১০ জনের জটলা। ভবনের সামনে যেতেই সরু রাস্তা দিয়ে ভেতরে ঢুকে যায় তারা।

নব কিশলয় বিদ্যালয়ের আশপাশের দোকানি ও স্থানীয় লোকজন জানান, দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা এভাবেই মাদক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কারবারিরা। বস্তির সব থেকে বেশি মাদক বিক্রি হয় কাইলা রায়হানের বাড়ির সামনে। ওই বাড়িতেই রয়েছে মাদকের গুদাম। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী ফারদিন নূর পরশ (২৩) চনপাড়া বস্তিতে খুন হওয়ার পর থেকে বাড়িটি তালাবদ্ধ রয়েছে। তবে থেমে নেই মাদকের কারবার।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শীতলক্ষ্যা নদীর পাশে ১২৬ একর জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠা চনপাড়া বস্তির ৮০ একরে সোয়া লাখ মানুষের বাস। ৯টি ওয়ার্ড বা মহল্লায় বিভক্ত এই বস্তিতে ছোট-বড় ১১৪টি মাদক বিক্রির স্পট রয়েছে। ইয়াবা ট্যাবলেট, ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজা থেকে

শুরু করে সবধরনের মাদকই এসব স্পটে পাওয়া যায়। এসব মাদক বিক্রি করা হচ্ছে ছোট ছোট ছেলেদের দিয়ে। প্রতিটি স্পটের জন্য কারবারিদের কাছ থেকে সপ্তাহে ৫ হাজার টাকা করে চাঁদা বা বখরা তোলা হয়, মাসে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৩ লাখ টাকা। এর বিনিময়ে প্রকাশ্যে নির্বিঘেœ মাদক বেচাবিক্রির সুযোগ পায় কারবারিরা। একই সঙ্গে ক্রেতারা কোনো ঝুটঝামেলা ছাড়াই মাদক সেবনের সুযোগ পান বস্তি এলাকায়। এসব মাদকের ক্রেতা উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েরা। যাদের বেশিরভাগই রাজধানী থেকে যাওয়া ও বস্তির আশপাশের বাসিন্দা।

এ ছাড়া চনপাড়া বস্তি থেকে মাদকের বড় চালান যায় বস্তিসংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদীর বিপরীত পাশে রাজধানীর ডেমরা থানাধীন শিল্প এলাকায়ও। ডেমরা থেকেই পুরো রাজধানীতে ছড়িয়ে পড়ে এসব মাদক।

বস্তির ষাটোর্ধ্ব এক বাসিন্দা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেসব ছেলেমেয়ে মাদক সেবন করতে আসে তা কল্পনাও করতে পারবেন না। ভার্সিটির ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে আসে, স্বামী-স্ত্রীও প্রাইভেট কার নিয়ে চলে আসে বস্তিতে মাদকসেবন করতে। ২৪ ঘণ্টা ধরে বেচাবিক্রি হয়। প্রতিটি স্পটে মাদক গ্রহণের জন্য ঘরের ব্যবস্থাও আছে।’

তিনি বলেন, ‘একেকটি ওয়ার্ডে সাত থেকে দশটি করে মাদকের স্পট আছে। এখানে কে কোন ওয়ার্ডে মাদক বিক্রি করবে তা রাজনৈতিক নেতারা ঠিক করে দেয়। সব মুখবুজে সহ্য করা ছাড়া কারও কিছুই করার নেই।’

বস্তি এলাকায় আধিপত্য নিয়ে মাদক কারবারিদের মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষ হয়। তাদের বিবাদে অতিষ্ঠ সাধারণ বাসিন্দাদের অনেকে বস্তি ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যাচ্ছেন। বস্তির অফিস ঘাটের নৌকার মাঝি মো. আলমগীর হোসেন সম্প্রতি পরিবার নিয়ে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। তিনি গতকাল মুঠোফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বস্তিতে থাকার মতন পরিবেশ নেই। মাদক কারবারিদের আধিপত্য নিয়ে বিবাদ লেগেই থাকে। একপক্ষ আরেক পক্ষের ওপর হামলা চালায়। নির্বিচারে ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে।’ তার মতন অনেকে বস্তি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন বলে জানান আলমগীর।   

বস্তিবাসীর অভিযোগ রয়েছে, মাদক কারবারিদের পৃষ্ঠপোষক কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চনপাড়া ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. বজলুর রহমান। তিনি বস্তি এলাকার ‘অঘোষিত সম্রাট’। তিনি একই সঙ্গে কায়েতপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের চনপাড়া ইউনিটের (চনপাড়া শেখ রাসেল নগর ইউনিয়ন) সাধারণ সম্পাদক। বজলুর বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও রয়েছে। তার ঘনিষ্ঠজনদের দিয়ে গড়ে তুলেছেন মাদক কারবারের এক অভয় আশ্রম। বজলুর রহমানের সাঙ্গোপাঙ্গরা মাদকের স্পট থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলে। চাঁদার সেই টাকার ভাগবাটোয়ারা হয় রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে পুলিশের বিভিন্ন মহলেও।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মাদক কারবারি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইউপি সদস্য বজলুর লোকজন নিয়মিত চাঁদা তোলেন। এসব টাকার একটি বড় অংশ রাজনৈতিক নেতারা পান। আরেকটা অংশ চনপাড়া পুলিশ ফাঁড়ি, রূপগঞ্জ থানা, ডেমরা থানা ও ডিবি পুলিশকে দেওয়া হয়। ফলে বস্তিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো ঝামেলা করে না।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে বজলুর রহমানকে গতকাল ফোন করলে এক নারী রিসিভ করেন। এ প্রতিবেদকের পরিচয় জানার পর ফোন কেটে দেন তিনি। এরপর একাধিকবার ফোন করলেও রিসিভ করেননি।

স্থানীয় বাসিন্দা সূত্রে জানা গেছে, বস্তিতে আধিপত্যের লড়াই ও কাঁচা টাকার ছড়াছড়ি শুরু হয় ২০১৩ সালের পর থেকে। সে সময় অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিতে বাড়িপ্রতি প্রথম পর্যায়ে ৪০ হাজার ও পরে ১০ হাজার করে টাকা দিতে হয়েছে। এভাবে কোটি কোটি টাকা বাগিয়ে নিয়েছে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা বজলু, আনোয়ার ও সমশেরের তিনটি গ্রুপ। যাদের আধিপত্য বেশি ছিল তারা বেশি টাকা নিয়েছিল।

বস্তিসংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদীতে চারটি নৌঘাট রয়েছে। ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ‘বাজার ঘাট’, ৪ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যবর্তী অফিস ঘাট, ১ নম্বর ওয়ার্ডের ‘এক নং চরের ঘাট ও ‘বওর বা বাইদ্দার ঘাট’। এসব ঘাট দিয়ে নদী পথে বস্তিতে মাদক ঢোকে। মাদক কারবারিরা কক্সবাজার থেকে ইয়াবা ট্যাবলেট বড় চালান এনে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে জড়ো করে। সেখান থেকে দুই থেকে তিন হাজার করে ভাগ করে প্রথমে মেঘনা নদী ও পরে শীতলক্ষ্যা নদী দিয়ে বাল্ক হেডে করে চনপাড়া বস্তিতে নিয়ে আসে। গভীর রাতে অফিস ঘাট দিয়ে বেশি ঢোকে এসব ইয়াবা। এ ছাড়া পাশর্^বর্তী দেশ ভারত থেকে আসা ফেনসিডিল মেঘনা ব্রিজের পাম্পের আশপাশে গাড়ি থেকে ফেলে দেয় কারবারিরা। সেখান থেকে অটোরিকশা করে ঢোকে চনপাড়া বস্তিতে। নদী পথেও আসে। অন্যান্য মাদকের বেশিরভাগই ঢোকে এই চার ঘাট দিয়ে। বস্তির পাইকারি ডিলারদের মধ্যে বজলু মেম্বরের মেয়ের জামাই রিপন, শ্যালক জাহির ছাড়াও ফেন্সি ফারুক, রবিন অন্যতম।

বস্তির এক নম্বর ওয়ার্ডে মাদক বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করে তালুকদার মুজাহিদ, মাল্টা রনি ও উজ্জ্বল। দুই নম্বর ওয়ার্ডে আলমগীর, তিন নম্বর ওয়ার্ডে শাওন, চান ও পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডে রায়হান, ছয় নম্বর ওয়ার্ডে মনু ওরফে ময়না ও পাগলা ফারুক, সাত নম্বর ওয়ার্ডে বন্দুকযুদ্ধে নিহত শাহিনের সহযোগী জুলহাস, সুমন ও সিরাজুল। আর ৯ নম্বর ওয়ার্ডে রাজার লোকজন। এসব মাদক কারবারি কখনো বস্তির বাইরে বের হয় না।

জানতে চাইলে চনপাড়া বস্তি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) মেহেদী হাসান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাদকের বেশিরভাগই নদীপথে ঢোকে। এজন্য আমাদের তেমন কিছু করার থাকে না।’ মাদক কারবারিদের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমি মাত্র এক মাস হয় এখানে এসেছি। এসব অভিযোগ মিথ্যা।’ 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চনপাড়া বস্তিতে দীর্ঘদিন দুটি গ্রুপের আধিপত্য ছিল। গ্রুপ দুটির একটি হলো বজলু মেম্বার ও জয়নালের। আর অন্যটি শাহিন ও রাজার। পরে বজলু ও জয়নালের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। জয়নাল স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। বর্তমানে জেলে আছেন। তার বিরুদ্ধে অন্তত ১০টি মাদক ও হত্যা মামলা আছে। আর অপর গ্রুপের শাহিন গত বৃহস্পতিবার র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। তিনিও স্বেচ্ছাসেবক লীগের চনপাড়া ইউনিটের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। তার বিরুদ্ধে মাদক ও হত্যার ২৩ মামলা ছিল। রাজাও র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে আছেন।