ফেইসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম প্রভৃতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার গুজব ছড়িয়েছে। অনেক প্রবাসী বাংলাদেশের ব্যাংকারদের ফোন করে জিজ্ঞেস করছেন, তারা দেশে টাকা পাঠাবেন কিনা। আবার দেশেই থাকেন এমন অনেকে জানতে চাচ্ছেন, ‘ব্যাংকে এখন টাকা রাখা কতটা নিরাপদ। ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাবে না তো!’
গ্রাহকদের মনে প্রশ্ন-সংশয়, ব্যাংকে সঞ্চয় করা কষ্টের টাকা প্রয়োজনের সময় ফেরত পাওয়া যাবে তো? কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তি এবং স্থানীয় ব্যাংক-কর্মকর্তাদের আশ্বাসে এখনো ব্যাংক-ব্যবস্থায় আস্থা রাখছেন গ্রাহকরা। প্রাথমিকভাবে দুয়েকজন ব্যাংক থেকে টাকা তুললেও তারা পরে আবার জমা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তা।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের মোহাম্মদ মহিউদ্দিন থাকেন সৌদি আরব। সেখান থেকেই রাজধানী ঢাকার একজন বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাকে ফোন দিয়েছেন তিনি। তার প্রশ্ন, ব্যাংকে এফডিআর করা টাকা পাব তো? ব্যাংক কর্মকর্তা তাকে আশ্বাস দেন। তার আশ্বাসে ব্যাংক থেকে টাকা তোলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়ান তিনি।
শুধু মহিউদ্দিন নন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজবে কান দিয়ে মহিউদ্দিনের মতো আরও অনেকে এমন পরিস্থিতিতে পড়েছেন। এই প্রসঙ্গে খুদে বার্তায় (মেসেজে) কথা হয় মহিউদ্দিনের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যাংকে টাকা রাখলে দুয়েক মাস পর আর পাওয়া যাবে না। ফেসবুকে এমন অনেক পোস্ট আমার চোখে পড়ে। ফলে ব্যাংক থেকে টাকা তোলার সিদ্ধান্ত নিই। এমনকি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের নমিনি আমার স্ত্রীকেও বলেছিলাম টাকা তোলার বিষয়ে। কিন্তু আমার নিকটাত্মীয় এক ব্যাংক কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি এটা গুজব বলে জানান। ব্যাংকের টাকায় কোনো সমস্যা হবে না বলেও আমাকে আশ্বাস দেন তিনি। ফলে টাকা তোলার সিদ্ধান্ত বদল করি।’
মহিউদ্দিন ছাড়াও বেশ কয়েকজন ব্যাংক গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রথম দিকে গুজবের কারণে ভয় পেলেও পরে তারা ব্যাংকের ওপরই আস্থা রেখেছেন। তারা বলছেন, ‘নগদ টাকা তো সঙ্গে রাখা সম্ভব নয়। চোর-ডাকাত নানা সমস্যায় পড়তে হবে। তাই ব্যাংকে আস্থা রাখা ছাড়া উপায় নেই।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের মোট আমানত ১৪ লাখ ৮২ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা, যা আগের মাসের চেয়ে ১১ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা বেশি। বর্তমানে মোট তারল্যের পরিমাণ ৪ লাখ ১৫ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ ১ লাখ ৬৯ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতে তারল্যের সংকট নেই।
এই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র জি এম আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘ব্যাংক খাতে তারল্যের সংকট নেই। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে সুযোগসন্ধানী চক্র ব্যাংক ব্যবস্থা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। মানুষ যাতে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারে বিশ্বাস না করে সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো ব্যাংকে যদি তারল্য বা অন্য কোনো সংকট দেখা দেয় তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকট সমাধানে সহায়তা দেবে বলে জানান তিনি।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ব্র্যাক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী সেলিম আর এফ হোসেইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের কিছু ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট রয়েছে। কিন্তু তারল্যে সংকট নেই। সংকট তৈরি হওয়ারও সম্ভাবনা নেই। কিছু দুষ্টু লোক ব্যাংকের তারল্য নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছে। তাতে বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। স্বাধীনতার পর কোনো ব্যাংক গায়েব হয়ে যায়নি। দুই-একটি ব্যাংকে সংকট তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে তার সমাধান হয়েছে। ভবিষ্যতেও সংকট তৈরি হলে বাংলাদেশ ব্যাংক এগিয়ে আসবে।’
গুজবে কোনো প্রভাব পড়বে কিনা? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘মানুষ যদি বিশ্বাস করে তাহলে হয়তো কিছু প্রভাব পড়তে পারে। তবে আমার বিশ্বাস, মানুষ ব্যাংক ব্যবস্থায় আস্থা রাখবে। গুজবে বিশ্বাস করবে না।’
সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া গুজবের বিষয়ে বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের লক্ষ্মীপুর জেলার একটি শাখার ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘গত সপ্তাহে গুজবের কারণে কয়েকজন গ্রাহক টাকা তুলেছিল। পরিমাণে বেশি টাকা হলেও গুজবের প্রভাব যাতে না পড়ে সেজন্য আমরা কোনো প্রশ্ন ছাড়াই টাকা দিয়ে দিয়েছি। চলতি সপ্তাহে দুইজন গ্রাহক এসে তোলা টাকা আবার জমা দিয়েছেন।’ তারা আমাকে জানিয়েছেন ‘তারা ভয়ে টাকা তুলেছেন। পরিচিত কয়েকজন ব্যাংকারের সঙ্গে কথা বলে ভয় কেটেছে। তাই আবার টাকা জমা দিয়েছেন।’
মার্কেন্টাইল ব্যাংকের রামপুরা শাখার জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তা দেবাশিস বসাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যাংক থেকে টাকা তোলা নিয়ে গুজবের বিষয়টি আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছি। কিন্তু আমার শাখায় বা মার্কেন্টাইল ব্যাংকের অন্য কোনো শাখায় এর প্রভাব পড়েছে এমন তথ্য পাইনি। তবে গত বুধ ও বৃহস্পতিবার স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে টাকা কিছুটা বেশি তোলা হয়েছে। অর্থাৎ আগে যেখানে ১ কোটি টাকা উত্তোলন হতো সেখানে হয়তো ২০ লাখ টাকা বেশি উত্তোলন হয়েছে।’ এর কারণ সম্পর্কে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘শুক্র ও শনিবার ব্যাংক বন্ধ থাকে। সে কারণে মাঝে মাঝেই এমন ঘটনা ঘটে।’
স্বাধীনতার পর প্রথম ১৯৯২ সালে ব্যাংক অব ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ইন্টারন্যাশনালে (বিসিসিআই) সমস্যা তৈরি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হস্তক্ষেপ করে। এরপর ব্যাংকটির মালিকানা বদল হলে নতুন নাম হয় ইস্টার্ন ব্যাংক। দেশের সংহত ও সাবলীল ব্যাংকগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। বিসিসিআইর অধিকাংশ গ্রাহককেই আমানত ফেরত দিয়েছে ইস্টার্ন ব্যাংক। ২০০৬ সালে দেউলিয়া হয় ওরিয়েন্টাল ব্যাংক। মালিক পক্ষের লুটপাটের কারণে রুগ্ণ হয়ে পড়লে ওই বছরের ১৯ জুন ব্যাংকটির দায়িত্ব নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরে মালিক পক্ষের ৮৬ শতাংশ শেয়ারের বড় অংশ কিনে নেয় আইসিবি গ্রুপ। এরপর ব্যাংকটির নাম পরিবর্তন করে করা হয় আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক। ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়ানোর পথে আছে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে তৎকালীন ফারমার্স ব্যাংকে সমস্যা দেখা দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হস্তক্ষেপ করে। ব্যাংকটির সংস্কার করে নাম রাখা হয় পদ্মা ব্যাংক। ছোট আমানতকারীদের আমানত ফেরত দিয়েছে তারা। বড় আমানতকারীরা এখনো আমানত ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন।