গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক ও বিচ্ছেদ

ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের পর ১৯৬৯ সালের মধ্যভাগে রাজনীতি ও আন্দোলনের গতিধারাটা কী দাঁড়াবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল, ইয়াহিয়া খান কোন ধরনের পদক্ষেপ নেবে সে বিষয়েও প্রশ্ন ছিল, মুজিব তখন কানাডার একজন সাংবাদিককে একটি সাক্ষাৎকার দেন; শর্ত ছিল যে সেটি প্রকাশ করা যাবে না; ওই সাংবাদিকমার্ক গেন তার নাম প্রকাশ করেননি বটে, তবে মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে পৌঁছে দিয়েছিলেন ঠিকই। ২০২০ সালে ওয়াশিংটনের মহাফেজখানা থেকে প্রয়াত সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান সেটি উদ্ধার করেন। ওই সাক্ষাৎকারে ইয়াহিয়া সরকারের বিরুদ্ধে মুজিবের প্রধান অভিযোগটাই ছিল এই যে, ইয়াহিয়ার শাসনে উদার গণতন্ত্রপন্থিরা নয়, কমিউনিস্টরাই সুবিধা পাচ্ছে। তার বর্ণনায়, ‘আমরা সরকারি নীতির সমালোচনা বা সভা করতে পারি না। যারা গোপন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত তারাই কার্য চালাতে পারে। আমরা যারা সাংবিধানিক রাজনীতি ও প্রকাশ্য রাজনীতিতে বিশ্বাসী তারা পারি না। তারা আমাদের অফিস খোলা রাখতে দেয়, কিন্তু জনসভা করতে দেয় না।’ আরও বলেছেন, ‘যদি সরকার আমাদের গণতন্ত্র দেয় [...] বামপন্থিদের তখন ভয় করার দরকার নেই। [...] যদি তারা নির্বাচন না দেয়, কেউ যদি ভাবে যে সাত কোটি মানুষকে বুলেট দিয়ে দাবায়ে রাখতে পারবে, তাহলে আমরা উদারপন্থিরা খারাপ অবস্থায় পড়ব। সরকারের জানা উচিত যে অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। ক্ষুধার্ত মানুষের কোনো ধর্ম বা আদর্শ নেই। ক্ষুধা নিবারণের চেষ্টা তারা করবেই। [...] গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে বামপন্থিরা সুযোগ পেয়ে যাবে। সামরিক শাসকের অধীনে কমিউনিস্টরা সংগঠিত হচ্ছেন, যেমনটা আইয়ুবের আমলে হচ্ছিলেন। তারা আন্ডারগ্রাউন্ডে কাজ করেন, আর আমরা কার্যক্রম চালাতে পারি না। সামরিক আইন কর্তৃপক্ষের মনোভাবটা অবিলম্বে বদলাতে হবে।’

ব্যক্তিগতভাবে কমিউনিস্টদের যে তিনি অপছন্দ করতেন তা নয়, তাদের অনেকের সঙ্গেই তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল, তবে তিনি তাদের রাজনীতির বিরোধী ছিলেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে নিজের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘আমি নিজে কমিউনিস্ট নই। তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না। একে আমি শোষণের যন্ত্র হিসেবে মনে করি। এই পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যত দিন দুনিয়ায় থাকবে তত দিনে দুনিয়ার মানুষের ওপর থেকে শোষণ বন্ধ হবে না।’ তার আকাক্সক্ষা ছিল পাকিস্তান হবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেখানে সব নাগরিকের থাকবে সমান অধিকার। কিন্তু মুসলিম লীগের নেতারা সেটা চাননি। শেখ মুজিবের ভাষায়, ‘পাকিস্তানের শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি মানুষ যে আশা ও ভরসা নিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে শরিক হয়ে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে তাদের অর্থনৈতিক মুক্তির দিকে কোনো নজর দেওয়াই তারা দরকার মনে করে না।’

পাকিস্তান রাষ্ট্র যে কমিউনিজমকে একটা বিপজ্জনক ছোঁয়াচে রোগ মনে করত সেটা দেখে তিনি কৌতুকও বোধ করেছেন। ১৯৪৯-এ ঢাকা জেলে কারাবাসের সময়ে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হাজি দানেশকে প্রথমে শেখ মুজিবদের সঙ্গেই রাখা হয়েছিল। কিন্তু ‘দুদিন পরেই আবার তাকে আমাদের কাছ থেকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হলো। কারণ সরকারি হুকুমে আমাদের সঙ্গে কাউকেও রাখা চলবে না। বিশেষত সরকারের মতে যারা কমিউনিস্ট তাদের সঙ্গে তো রাখা চলবেই না। তাহলে আমরা যদি কমিউনিস্ট হয়ে যাই।’ সেবার দেখা গেল যে অনেককেই জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হলো, শেষ পর্যন্ত রয়ে গেলেন শুধু দুজন, শেখ মুজিবুর রহমান ও বাহাউদ্দিন চৌধুরী। শেখ মুজিবকে আটকে রাখার কারণ বোঝা যায়, তিনি প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগের তেজস্বী যুগ্ম সম্পাদক; কিন্তু অল্পবয়সী বাহাউদ্দিন চৌধুরীকে না ছাড়ার কারণটা কী? মুজিব জানাচ্ছেন, ‘কারণ হলো, সরকার সন্দেহ করছিল সে কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন হয়ে পড়ছিল। এ সময় অনেককেই কমিউনিস্ট বলে জেলে ধরে আনতে শুরু করেছিল [...] এদের মধ্যে অনেকেই ইংরেজ আমলে বহুদিন জেল খেটেছেন।’ জেলখাটা আত্মত্যাগী কমিউনিস্টদের প্রতি তার ভক্তি-শ্রদ্ধার কোনো ঘাটতি ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল ওই এক কথা : ‘আমি কমিউনিস্ট নই’। ষাট দশকের শেষে এসে তার অনুসারী যুবকরা অনেকেই সমাজতন্ত্রপন্থি হয়ে উঠেছিল, কেউ কেউ জোরেশোরে সামাজিক বিপ্লবের আওয়াজও দিচ্ছিল। কিন্তু তিনি তাদের যে নেতৃত্ব দেবেন সেটা মোটেই সম্ভব ছিল না। যুদ্ধশেষে যখন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের রণধ্বনি তুলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠিত হয় তখন তার প্রধান সংগঠকও তার প্রতি অনুগত নিকটজন সিরাজুল আলম খানকে তিনি বলেই দিয়েছিলেন যে তার পক্ষে কমিউনিস্ট হওয়া সম্ভব নয়।

কমিউনিস্ট পার্টির লোকদের সঙ্গে তার সমালোচনা ছিল দুটি; একটি মৃদু, অপরটি কঠিন। মৃদু সমালোচনাটি এই মর্মে যে, তাদের কথা সাধারণ মানুষ বোঝে না। তিনি স্মরণ করেছেন যে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি যখন ছাত্রলীগ গঠিত হয় তখন তাতে দু-চারজন কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন ছাত্র ছিল। তারা সরকারকে পছন্দ করত না। কিন্তু তার মতে তারা এমন সব আদর্শ প্রচার করত যা সাধারণ ছাত্র ও জনসাধারণ বুঝত না। ‘শুনলে ক্ষেপে যেত’। ঠাট্টা করে এদের, ‘জনসাধারণ চলছে পায়ে হেঁটে, আর আপনারা আদর্শ নিয়ে উড়োজাহাজে চলছেন। জনসাধারণ আপনাদের কথা বুঝতে পারবে না আর সঙ্গেও চলবে না। যতটুকু হজম করতে পারে ততটুকু জনসাধারণের কাছে পেশ করা উচিত।’ এটা ছিল বন্ধুত্বসুলভ মৃদু সমালোচনা। কঠিন সমালোচনাও ছিল, সেটা হলো এই যে কমিউনিস্টদের ইচ্ছাটা হচ্ছে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকেজো করে দেওয়া, প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বকে অযোগ্য বলে প্রমাণ করা। ১৯৫৪-এ নির্বাচনের আগে যখন লীগবিরোধী যুক্তফ্রন্ট গঠন করার প্রস্তাব ওঠে তখন প্রতিক্রিয়াশীল ও ‘অতিপ্রগতিশীল’ উভয় পক্ষ থেকেই আওয়ামী লীগের ওপর চাপ এসেছিল সম্মতি আদায়ের। ‘অতিপ্রগতিশীল’ শব্দটি মুজিব ব্যবহার করতেন কমিউনিস্টদের বোঝার জন্য। তার ধারণা প্রতিক্রিয়াশীলদের জন্য প্রয়োজন ছিল রাজনৈতিক আশ্রয়ের; কিন্তু অতিপ্রগতিশীলদের অভিপ্রায়টি ছিল সুদূরপ্রসারী। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে এ সম্বন্ধে বলা আছে, ‘অতিপ্রগতিশীলদের কথা আলাদা। তারা মুখে চায় ঐক্য। কিন্তু দেশের জাতীয় নেতাদের জনগণের সামনে হেয়প্রতিপন্ন করতে এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলে, চেষ্টা করে সেজন্য। তাহলেই ভবিষ্যতে বলতে পারবে যে, এ নেতাদের ও তাদের দলগুলোর দ্বারা কোনো কাজ হবে না। এরা ঘোলা পানিতে মাছ ধরার চেষ্টা করতে চায়।’ অতিপ্রগতিশীলরা অবশ্য তাদের কাজের এ রকম ব্যাখ্যা মোটেই মানবেন না। তাদের বক্তব্য, বুর্জোয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে বুর্জোয়া নেতারাই অকার্যকর করেন, এবং জনগণের কাছে তারা তাদের ব্যর্থতা নিজেরাই প্রমাণ করে দেন, কারণ তারা নিজেদের স্বার্থটাই শুধু দেখেন, জনগণের স্বার্থকে পদদলিত করে। ভাসানী এই অতিপ্রগতিশীলদের দিকেই ঝুঁকেছিলেন, সে-জন্য একদা ভাসানী-মুজিবের যে সম্পর্কটা ছিল গুরু-শিষ্যের, সে-সম্পর্কটি টেকেনি, বিচ্ছেদ ঘটেছে।

আর্চার ব্লাড ভাসানীর সঙ্গেও কথা বলেছেন। তার কৌতূহল ছিল ওই নেতা সম্পর্কে জানার। কারণ একদিকে রাজনীতিতে মওলানার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে তার সম্পর্কে নানা রকমের বর্ণনা তিনি শুনেছেন, যেমন, ‘magnetic, lovable, a mystic, a Communist, the patron saint of leftists, a senile old fool, and revered hero to the villagers of East Pakistan.’। কৌতূহল নিয়ে দেখা করতে গেছেন, এবং গিয়ে হতাশ হয়েছেন। দোভাষীর মাধ্যমে দুই ঘণ্টা ধরে আলোচনা করে বুঝেছেন যে ভাসানীর ধরনটা হলো একজন প্রান্তিক বিপ্লবীর, যিনি জ্বালাও-পোড়াও ধরনের বাগ্বিস্তারের মাধ্যমে এমন ভাব করছেন যে শুধু আইয়ুবের সরকারকেই যে হটাবেন তা নয় গোটা সমাজটাকেই তিনি পাল্টে দেবেন। শেষ পর্যন্ত আর্চার ব্লাডের মূল্যায়নটা দাঁড়িয়েছে এ রকমের যে, মওলানা ভাসানী আসলে একজন ‘rabble-rouser who sometimes walks like a politician’ সোহরাওয়ার্দী সাহেব তাও যা হোক মেঠো বক্তা বলেই ক্ষান্ত দিয়েছিলেন, ইনি আরও উচ্চে তুলেছিলেন মওলানাকে। মওলানাকে রাজনীতিক বলতেই তিনি রাজি নন, তাকে রাস্তার লোক-ক্ষেপানোর মানুষ হিসেবেই তিনি দেখতে পেয়েছেন। কারণ আছে। একটা কারণ মওলানা ইংরেজি জানতেন না, কথাবার্তা হয়েছে দোভাষীর মাধ্যমে। দ্বিতীয় কারণ মওলানার ঘরবাড়ি ও পোশাকপরিচ্ছদ সুবিধার ছিল না। তার লুঙ্গিটা যে খুব পরিষ্কার ছিল না এটাও ওই রাষ্ট্রদূত লক্ষ করেছেন। সবচেয়ে বড় কারণ অবশ্য এই যে, তারা পরস্পরবিরোধী অবস্থানের মানুষ। ভাসানীর কাছে আর্চার ব্লাড গেছেন মার্কিন সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে আর ভাসানী তো হচ্ছেন দুর্বিনীত রকমের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। আরও একটা ব্যবধান অবশ্য ছিল; আর্চার ব্লাড হচ্ছেন পিতৃতান্ত্রিকতার সমর্থক, আর ভাসানী হচ্ছেন পিতৃতান্ত্রিকতার তথা কর্তৃত্ববাদের ঘোরতর বিরোধী। সেজন্য রাষ্ট্রদূতের মনে হয়েছে যে লোকটা শুধু নৈরাজ্যই সৃষ্টি করতে চায়, আর কিছু নয়। কূটনীতিক হিসেবে তিনি যে মুজিবের স্বাধীনতামুখিতাকে সমর্থন করেছেন তা নয়, তবে মোটামুটি সহানুভূতিশীল যে ছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। আমেরিকানদের কাছ থেকে তেমন সহানুভূতি ভাসানীর প্রাপ্য ছিল না, প্রাপ্য ছিল বিরোধিতা, যেটা তিনি পেয়েছিলেন।

ঊনসত্তরের অভ্যুত্থানের সময়ে ভাসানী ও মুজিব খুব কাছাকাছি চলে এসেছিলেন, পরস্পরের। বস্তুত ভাসানীই ছিলেন অভ্যুত্থানের মূল সংগঠক ও নেতা; মুজিবের মুক্তির পেছনেও ব্যক্তি হিসেবে তার ভূমিকাই ছিল প্রধান। ক্যান্টনমেন্ট থেকে মুক্ত হয়ে মুজিব প্রথমে যে কাজগুলো করেছিলেন সেগুলোর একটা হলো ভাসানীর সঙ্গে দেখা করা। হায়দার আকবর খান রনোর ‘শতাব্দী পেরিয়ে’ বইতে এই সাক্ষাৎকারের প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা আছে। ওই মুহূর্তে ভাসানী ছিলেন ন্যাপ নেতা (একাত্তরে শহীদ) সাইদুল হাসানের বাসায়। রনোও তখন ওই বাসায় ছিলেন, ছিলেন মোহাম্মদ তোয়াহা’ও। তারা হঠাৎ দেখেন মুজিব এসে উপস্থিত। রনো লিখেছেন, ‘আমরা তো অবাক। পরিচিতজনদের সঙ্গে সামান্য কুশলবিনিময় করে তিনি সোজা চলে গেলেন ভাসানী যে ঘরে ছিলেন সে ঘরে। ভাসানীর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলেন। তারপর দরজাটা ভিজিয়ে দিয়ে দুজনে প্রায় মিনিট বিশেক কী কথা বললেন জানি না। বেশ উৎফুল্লচিত্তে বেরিয়ে এসে আর বেশিক্ষণ থাকেননি। শুধু দেখলাম মোহাম্মদ তোয়াহাকে কাছে টেনে নিয়ে কী যে বললেন ফিসফিস করে তোয়াহা সাহেবও যেন কী জবাব দিলেন। হাবভাবে বুঝলাম কোনো সিরিয়াস কথা নয়।’ তবে মোহাম্মদ তোয়াহার ধারণা ভাসানীর সঙ্গে মুজিবের আলোচনার মূল বিষয়টি ছিল আইয়ুবের ডাকা গোলটেবিল বৈঠকে যাওয়া না-যাওয়া নিয়ে। তিনি লিখেছেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি পাইয়া মওলানা ভাসানীর সহিত দেখা করিলেন। মওলানা ভাসানী তাহাকে গোলটেবিলে যোগ দিতে বারণ করিলেন। তিনি মওলানা ভাসানীকে জানাইলেন তিনি ওয়াদাবদ্ধ।’ ওয়াদাবদ্ধ হন বা না হন গোলটেবিলে মুজিব ঠিকই গেছেন। গোলটেবিলের বিরুদ্ধে ছিলেন ভাসানী ও তার অনুসারীরা। তারা চেয়েছিলেন বয়কট করতে। ব্যক্তিগত আলাপে মওলানা মুজিবকে যে পরামর্শটা দিয়েছিলেন সে কথা আরও উচ্চকণ্ঠে ও প্রকাশ্যে তিনি জনসভায় বলেছেন। তার উপলব্ধি ছিল গোলটেবিলে কোনো লাভ তো হবেই না, ক্ষতি হওয়ারই আশঙ্কা। কারণ রাজপথ ছেড়ে আন্দোলন চলে যাবে আলোচনার টেবিলে, পথ হারাবে কথাবার্তায় এবং শেষ হবে আপসে। পি-িতে যখন গোলটেবিল বৈঠক চলছে ভাসানী তখন পশ্চিম পাকিস্তানে, বিভিন্ন স্থানে সামরিক শাসনবিরোধী জনসভা করছেন। ওই মার্চ মাসেই করাচিতে তার নেতৃত্বে শ্রমিকরা জিন্নাহ সাহেবের মাজারে গিয়ে লাল পতাকা উত্তোলন করে এসেছেন। গোলটেবিল সম্পর্কে ভাসানীর উপলব্ধি অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। আন্দোলন স্তিমিত হয়ে গেছে, আপসের আলোছায়াতে। গোলটেবিল বৈঠকে ৬ দফা দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে দেশে ফেরার সময়ে বিমানবন্দরে ভাসানী সম্পর্কে মুজিব যে বলেছিলেন, বুড়ো হওয়ায় তিনি আবোল-তাবোল বকছেন, রাজনীতি থেকে তার রিটায়ার করা উচিতসে বক্তব্যটা ছিল অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত।

এমন কথা মুজিব আগে কখনো বলেননি। পরেও বলেননি। ১৯৬৯ সালের জুলাই মাসে বিদেশি সাংবাদিক মার্ক গেনকে তিনি অনেক কথাই বলেছেন, কিন্তু ওই সাংবাদিকের বিস্তর চাপাচাপির মুখেও ভাসানী সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তখন তিনি নির্বাচন হবে বলে আশা করছেন, এবং বুঝেছেন নির্বাচনে ভাসানীর একটা ভূমিকা থাকবে, যেটিকে বিপক্ষে চালনা করা অসংগত হবে।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়