একাকিত্বের জন্য সংস্থা

নিঃসঙ্গ নাগরিকদের জন্য একাকিত্বের সংস্থা তৈরির প্রস্তাব তোলা হয়েছে রাশিয়ার পার্লামেন্ট দুমায়। প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে দেশটির ৫০ লাখেরও বেশি ভুক্তভোগীকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় মনস্তাত্ত্বিক সেবার সুযোগ তৈরি হবে। বৈশ্বিক এ সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াইকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্যই এ উদ্যোগ। লিখেছেন নাসরিন শওকত

একাকিত্বের জন্য সংস্থা

রাশিয়ার পার্লামেন্ট দুমায় ‘একাকিত্বের জন্য সংস্থা’ তৈরির একটি প্রস্তাব তোলা হয়েছে। এ বছরের অক্টোবরে পার্লামেন্টে প্রস্তাবটি তোলেন রুশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা কমিটির ডেপুটি চেয়ারম্যান সের্গেই লিওনেভ। প্রস্তাবের পরামর্শে লিওনেভ বলেছেন, ‘একাকিত্বের জন্য তৈরি নতুন এ সংস্থাটিকে নাগরিকদের মনস্তাত্ত্বিক সেবা দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা রিয়া নভোস্তি। এ সংস্থাটির কাছে নিজের পরিকল্পনার বর্ণনা দিয়ে লিওনেভ উল্লেখ করেছেন, বড় সব শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে একাকিত্বে ভোগার ঘটনা বেশ সাধারণ, যা তাদের হতাশা ও অনিদ্রার মধ্যে ঠেলে দেয়। সেজন্য লিওনেভ তার প্রস্তাবে জোর দিয়ে বলেন, ‘সুতরাং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সবার জন্য মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার ব্যবস্থা করা উচিত।’

সমস্যা যখন একাকিত্ব

মনস্তাত্ত্বিকদের মতে, একাকিত্ব বা নিঃসঙ্গতা একটি মানসিক অবস্থা। যার জন্য কোনো ব্যক্তি নিজের মধ্যে গভীর শূন্যতা ও বিচ্ছিন্নতা অনুভব করেন। যারা একাকিত্বে ভুগছেন তারা নিরাপত্তাহীনতা, উদ্বিগ্ন ও হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। যখন মানুষের সামাজিক সম্পর্কগুলো তাদের পছন্দের মতো থাকে না, তখনই তারা এ ধরনের মানসিক রোগ বা অসুস্থতার মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে থাকেন। এই মানসিক রোগ বা অসুস্থতা তখন তাদের মধ্যে অ্যালকোহলে আসক্তি, ঘুমের সমস্যা, ব্যক্তিত্বহীনতা এমনকি আলঝেইমারের মতো রোগের জন্ম দেয়। এ ছাড়া শরীরের সঙ্গে ভুগতে থাকে মনও। এই একাকিত্বই পরে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, অটোইমিউন স্বয়ংক্রিয় প্রতিরোধহীনতা রোগ, স্থূলতা এমনকি ক্যানসারের দিকেও মানুষকে টেনে নিয়ে যেতে পারে। এখানে হোঁচট খাওয়ার মতো গুরুতর একটি বিষয়ও রয়েছে। একাকিত্বের যেমন নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই, তেমনি তা একেকজনের বেলায় একেকভাবে কাজ করে। ভারতীয় বিজ্ঞানী সর্বদা চন্দ্র তিওয়ারি এ সম্পর্কে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছেন। যেখানে এ ধরনের অবস্থাকে ‘প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য অনন্য এক অভিজ্ঞতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিওয়ারি তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, এ ধরনের অবস্থার কোনো একক কারণ নেই। সে কারণেই এ ধরনের ক্ষতিকর মানসিক অবস্থার প্রতিরোধ ও চিকিৎসাও বেশ আলাদা আলাদা হয়ে থাকে।

২০২১ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে, বিশ^জুড়ে ৩৩ শতাংশ বয়স্ক ব্যক্তি একাকিত্বের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। ২০২২ সালের যুক্তরাষ্ট্রের সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেখানে দাবি করা হয়েছে, করোনা মহামারী সম্পর্কিত ঘটনাগুলো যেমনলকডাউন, শারীরিক দূরত্ব, দূর থেকে কাজ ও পড়াশোনা করা একাকিত্বের মতো সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এই অবস্থা মানুষের সুস্থতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া কতটা গুরুতর হয়ে উঠতে পারে এখনো জানা যায়নি। এদিকে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, কভিড-১৯ মহামারীর প্রথম বছরে উদ্বেগ ও বিষণœতার প্রবণতা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। যে কারণে নজিরবিহীন এই চাপের সৃষ্টি হয়েছে, বিজ্ঞানীরা তার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, সেই সঙ্গে একাকিত্ব, আর্থিক উদ্বেগ, সংক্রমণের ভয় ও ক্ষতির ক্ষেত্রে দুর্দশাকে উল্লেখযোগ্য হিসেবে তুলে ধরেছেন।

রাশিয়ায় একাকিত্ব

২০২০ সালে রাশিয়ান অ্যাকাডেমি ফর সায়েন্স ও হাইস্কুল অব ইকোনমিকসের (এইচএসই) গবেষকরা একটি জরিপ পরিচালনা করেন। গবেষকরা সেখানে দেখতে পান, জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৪৩ শতাংশই একাকিত্বে ভুগছেন। ১৪ বছর বয়সের ১০ হাজার শিশু জরিপটিতে অংশ নিয়েছিল। যখন তাদের প্রশ্ন করা হয়, তারা কখন বেশি একাকিত্ব অনুভব করেছেন? এর উত্তরে ১২ শতাংশ অংশগ্রহণকারীই বলেছেন ‘প্রায় সব সময়’ বা ‘প্রায়ই’। অন্যরা অবশ্য স্বীকার করেছেন, তাদের বেলায় একাকিত্বে ভোগার বিষয়টি ঘটেছিল ‘হঠাৎ’।

এখানে বিশেষভাবে লক্ষ রাখা উচিত, একাকিত্ব নারীদের কীভাবে প্রভাবিত করে। এইচএসসি পরিচালিত অন্য একটি জরিপে দেখা গেছে, রাশিয়ায় ১০ জন নারীর মধ্যে একজন নারীই একাকিত্বে ভোগেন। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই হয় বিধবা নয়তো বিবাহবিচ্ছেদের শিকার। পুরুষদের বেলায় এই অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে কম বা প্রায় অর্ধেক (৪.৭ শতাংশ)। যারা বেশি একাকিত্বে ভুগেছিলেন, তাদের বেশির ভাগই ৮৫ বছরের বেশি বয়সী। তবে একাকিত্বের সমস্যা শুধু বয়স্ক ব্যক্তিদের বেলায় ঘটে তা নয়। জরিপটিতে অংশগ্রহণকারী ১৪-২৯ বয়সী এক-তৃতীয়াংশ উত্তরদাতাও একাকিত্বে ভুগছেন বলে স্বীকার করেছেন। এর মধ্যে ৬.৫ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা ‘প্রায়ই’ বা ‘প্রায় সব সময়’ একাকী বোধ করেন। জরিপটিতে উল্লেখযোগ্যভাবে দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলের চেয়ে বড় শহরে একাকী তরুণদের সংখ্যা বেশি ছিল।

এটি শুনতে অদ্ভুত মনে হতে পারে। কারণ বড় শহরগুলোতে সাধারণত তার বাসিন্দাদের জন্য বেশি সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা থাকে। তবে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই লক্ষ করে আসছেন যে, বড় শহরের মানুষরা যেহেতু তাদের জীবনের বেশির ভাগ সময় অন্যদের দ্বারা বেষ্টিত থাকেন, তাই তাদের মধ্যে নিজস্ব জগৎকে লুকিয়ে রাখার প্রবণতা দেখা যায়। এ ছাড়া একটি বড় শহরের সামাজিক কাঠামো ছোট সম্প্রদায়ের শহরগুলোর তুলনায় নির্দিষ্ট গোষ্ঠীতে বেশি বিভক্ত।

মস্কো স্কুল অব প্র্যাকটিক্যাল সাইকোলজির পরিচালক মনোবিজ্ঞানী গুলি বাজারোভা। রুশ শহরের সামাজিক কাঠামোর তুলনামূলক অবস্থান সম্পর্কে সংবাদমাধ্যম আরটিকে বাজারোভ বলেন, ‘একটি শহরের সামাজিক স্তরবিন্যাস অর্থের ওপর নির্ভর করে না। প্রতিটি শহরেই সামাজিক গোষ্ঠীর নেতারা যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন শহরের বাইরে থেকে আসা মানুষ। তাই এটি শুধুই সম্পদ বা আর্থিক আয়ের স্তরকে বোঝায় না।’ বাজারোভা আরও উল্লেখ করেন, অনেক সময় তরুণদের মধ্যে উচ্চমাত্রার একাকিত্বের সঙ্গে কটূক্তির সম্পর্ক থাকতে পারে। এই নারী মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ মতে, প্রায় ৭০ শতাংশ স্কুলশিক্ষার্থীই এ সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকে। বাজারোভা বলেন, ‘বড় শহরগুলোর মানুষ একে অন্য থেকে বেশি বিচ্ছিন্ন থাকেন। বাবা-মা অর্থ উপার্জনে ব্যস্ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী থাকে অনেক বেশি। তাই শিক্ষকরা সবাইকে সমানভাবে মনোযোগ দিতে পারেন না। সে কারণেই শিশুরা অনেক সময় নিজেদের সমস্যা নিয়ে একা থাকে। সে তুলনায় ছোট শহরগুলোতে, সবাই একে অন্যের বেশ কাছাকাছি থাকেন। বেশির ভাগ বাবা-মাই অন্য পরিবারের বাবা-মাকে চেনেন। সেখানে অসংখ্য মানুষ একে অন্যের প্রতিবেশী নয়তো আত্মীয় হিসেবে বাস করেন। তাই কোনো কিছু ঘটলেই তাদের সহযোগিতা পাওয়া সহজ।’

কলঙ্কের ঘটনা

যুক্তরাজ্যই ইউরোপের প্রথম দেশ যারা ২০১৮ সালে একাকিত্বের জন্য একজন মন্ত্রী নিয়োগ করেছিল। এর পরের এক গবেষণায় দেখা যায়, সব প্রাপ্তবয়স্ক ব্রিটিশের মধ্যে এক-পঞ্চমাংশই বেশির ভাগ বা সব সময় একাকিত্ব বোধ করে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন একাকিত্বেও মন্ত্রীর কার্যালয় সামাজিক অপবাদ কমানোর জন্য বেশ কিছু লক্ষ্য নির্ধারন করে। ‘যাতে এই নাগরিকরা তাদের একাকিত্ব নিয়ে স্বচ্ছন্দে কথা বলতে ও সহযোগিতার জন্য সেবা সংস্থাগুলোর কাছে যেতে পারে।’ এর মধ্যে প্রধান লক্ষ্য ছিল নাগরিকদের একাকিত্বে সহায়তা প্রদানকারী সেবা সংস্থাগুলোর কার্যক্রম বাড়ানো। যাতে তারা নাগরিকরদের সঙ্গে যুক্ত থেকে তাদের একাকিত্ব সম্পর্কে সব ধরনের তথ্য সরবরাহ করতে পারে। ইংল্যান্ডে জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থা এনএইচএসের মতে, প্রতি চারজন বয়স্ক ব্যক্তির মধ্যে একজন এবং প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে একটি শিশুর মানসিক অসুস্থতার অভিজ্ঞতা রয়েছে। একই সময় যুক্তরাজ্যেও মানসিক স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত প্রায় ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই তাদের সমস্যার জন্য সামাজিক বৈষম্যের অভিযোগ করেছেন। জাতীয় এই স্বাস্থ্য সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, এই অপবাদের পেছনে মূল কারণ আসলে ভয়।

এইনএইচএস আরও জানিয়েছে, এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোতে প্রায়ই ‘মানসিক স্বাস্থ্যের অসুস্থতা’কে সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত করে প্রকাশ করতে দেখা যায়। অথবা মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যায় আক্রান্ত কোনো রোগীকে স্বাভাবিক বা পরিপূর্ণ জীবনযাপনে অক্ষম এমন বিপজ্জনক, অপরাধী, মন্দ বা খুব অসমর্থ হিসেবে তুলে ধরতে দেখা যায়।’

রাশিয়ায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ২০২১ সালে দাবি করেছেন, তাদের দেশে ৫০ লাখেরও বেশি মানুষ মানসিক রোগে ভুগছেন। এ বছরের মার্চে রাশিয়ার ইনস্টিটিউট অব পাবলিক ওপিনিয়ন একটি গবেষণা পরিচালনা করে। যেখানে উঠে এসেছে, আগের বছরের তুলনায় এবারের গবেষণায় অংশগ্রহণকারী উত্তরদাতাদের ৭৮ শতাংশই এমন সব সমস্যার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, যা অন্যদের সহযোগিতা ছাড়া কাটিয়ে ওঠা কঠিন ছিল। এর মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ উত্তরদাতা পেশাদার মনোচিকিৎসকের সহায়তা চেয়েছিলেন। আবার ৬০ শতাংশ উত্তরদাতাই ভেবেছিলেন যে, তারা প্রয়োজন মনে করলে মনোচিকিৎসকের সহায়তা চাইতে পারেন। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ২৩ শতাংশ উত্তরদাতা ভেবেছিলেন যে, এই পেশাদারদের কাছ থেকে ভুক্তভোগী রাশিয়ান সহায়তা চাইতে পারেন।

এমপি লিওনেভ ‘একাকিত্বেও জন্য সংস্থা’ সম্পর্কে তার ধারণা বর্ণনা করেন। তখন তিনি উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, ‘আজ কেউ যদি মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান, তাহলে কোনো কারণ ছাড়াই অন্যদের উদ্বেগ বা নিন্দার শিকার হন তিনি।’ তবে এই বিষয়টিকে বাজারোভা ইতিবাচক ফলাফলে পরিবর্তিত হওয়ার প্রবণতা হিসেবে দেখছেন।

সাংস্কৃতিক প্রভাব

দক্ষিণ এশিয়ায় জাপান প্রথম একাকিত্বের মন্ত্রী নিয়োগ করেছিল। সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে জাপানিজ সমাজের কাছে রাষ্ট্র খুবই সাধারণ একটি বিষয়। কিন্তু কভিড-১৯ মহামারী জাপানিজদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। তেতসুশি সাকামোতো ২০২১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাপানের একাকিত্বের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেন। গণমাধ্যমকে তেতসুশি বলেন, মহামারীর কারণে দেশে নারী ও তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার হার দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। এদিকে এ বছর জাপান টাইমসে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্করা একাকী বোধ করেছেন। সেখানে অল্পবয়স্করা আরও বেশি বিচ্ছিন্ন বোধ করতে থাকেন। কভিড-১৯ মহামারীর কারণে সামাজিক মিথস্ক্রিয়া সীমিত থাকায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

২০২১ সালে রাশিয়ার সংবাদমাধ্যম রজিয়স্কায়া গেজেটা তেতসুশির কাছে জানতে চান, একাকিত্বে ভোগা সব মানুষের সংখ্যা কি গণনা করা সম্ভব? যাতে সমস্যাটির প্রকৃত অবস্থা নিরূপণ করা যায়। এর উত্তরে সাকামোতো বলেন, ‘একাকী মানুষের সংখ্যা গণনা করা কার্যত প্রায় অসম্ভব।’

জাপানের একাকিত্বের মন্ত্রী আরও বলেন, ‘একাকিত্ব খুবই ব্যক্তিগত একটি অবস্থা। সমাজে এমন কিছু মানুষও আছেন, যারা বিচ্ছিন্ন থাকার পরও একাকী বোধ করেন না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যারা সাধারণ পার্বত্য এলাকায় বাস করেন। একই সময়ে আরও একটি সাধারণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে দেখা যায়, যখন নাগরিকরা অন্য মানুষের মধ্যে থেকেও একাকী বোধ করেন। আমরা প্রকৃতপক্ষে এই ধরনের মানুষদের জন্য কী করতে পারি? আপনি কীভাবে তাদের দিকে সহায়তার হাত বাড়াতে পারবেন? এই ধরনের সমস্যাগুলো খুব গভীরভাবে গবেষণা করা প্রয়োজন।’ সমস্যাটির সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি এরই মধ্যে জাপানের অনেক গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান পেয়েছে। ২০২১ সালে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে জাপানের অধ্যাপক ইশিদা মিতসুনরি উল্লেখ করেছেন, ‘জাপান ব্যক্তি ও স্বাধীনতার সুরক্ষাকে দৃঢ়ভাবে মূল্য দেয়। অন্যসব দেশের মতো জাপানেও অন্যের বিরুদ্ধে সহিংসতা, সম্পত্তি চুরি করা, ক্ষতি করার মতো বিষয়গুলো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আরও বলা যায়, সহিংসতার সংজ্ঞার মধ্যে রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক ধরনও। জাপানিজ সমাজে কারও জন্য বা সাধারণ মানুষদের জন্য বিরক্তি সৃষ্টি করাকেও অন্যের ক্ষতির কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। লোকরা অন্যের ওপর নির্ভরতা ও স্বাধীনভাবে নিজের সমস্যার সমাধান করার ব্যর্থতাকে ট্যাবু হিসেবে দেখে থাকেন। জাপানিজ উদারনীতিতে ব্যক্তির অধিকারের চেয়ে আমাদের চারপাশের ও বৃহত্তর সমাজের প্রতি দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দেয়। এই মনোভাব একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতার মতো বিষয়গুলোর ওপর গভীরভাবে প্রভাব ফেলে।

এদিকে রাশিয়ার বিদ্যমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বাজারোভার অভিমত, রাশিয়ানদের অদ্ভুত ধরনের এক মানসিকতা রয়েছে। তারা যে শুধু কারও কাছে সাহায্য চাওয়ার বিষয়কেই এড়িয়ে যায় তা নয়, অন্যের সামনে নিজের দুর্বলতা দেখানোর বিষয়েও জোরালো উদ্বেগ রয়েছে তাদের। এই রুশ নারী মনোবিজ্ঞানী আরও বলেন, ‘এটি নারীদের বেলায়ও একটি সাধারণ বিষয়।’

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

একাকিত্বের জন্য সংস্থার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে রাশিয়ার সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হয়েছিল মন্ত্রী তেতসুশিকে। তার উত্তরে সাংবাদিকদের তেতসুশি বলেন, ‘আমার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কীভাবে সুখী হতে হয় তা মানুষদের শেখানো হবে নাকি? আমি বরং তাদের বলব, কোনো সঙ্গী আছে কি না, থাকলে সঙ্গীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া উচিত তাদের। এই দায়িত্ব থেকে আমার ধারণা হয়েছে যে একাকিত্ব সম্পর্কে ভাবনার উপায় এবং এ সম্পর্কিত ধারণাগুলো কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।’

এদিকে মনোবিজ্ঞানী বাজারোভা সংবাদমাধ্যম আরটিকে বলেন, এটাকেই মূল ধারণা হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। যদি রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ ‘একাকিত্বের জন্য সংস্থা’ তৈরির কথা ভাবেন, তাহলে এভাবেই তা কার্যকর হবে। বাজারোভা আরও বলেন, ‘যদি আমরা একাকী মানুষের সংখ্যা কমাতে চাইএকই সঙ্গে যারা সুখী আছেন, সেই মানুষদের সংখ্যা বাড়াই, তাহলে এটি হবে একটি দুর্দান্ত উদ্যোগ। এ ক্ষেত্রে সঠিক কারণ খুঁজে বের করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

যদি কর্তৃপক্ষকে এ সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করতে দেওয়া হয়, তাহলে আক্ষরিক অর্থেই তাকে একাকিত্বের জন্য সংস্থা বলা যাবে। তবে তা কার্যকর করা খুব কঠিন হবে। কারণ রাশিয়ানদের মানসিক অবস্থার সঙ্গে এ ধরনের সংস্থার সামঞ্জস্য কম। এমনকি এই সংস্থার মধ্য দিয়ে একাকিত্বে ভোগা ভুক্তভোগীদের অনুপ্রেরণা আরও কমে আসার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে নামের ক্ষেত্রে ‘একাকিত্ব’ শব্দটি ব্যবহার না করাই ভালো। বরং এ ক্ষেত্রে একাকী ব্যক্তিরা যা অর্জন করতে চান, তা ব্যবহার করা আরও বেশি কার্যকর হবে যেমন‘একটি বন্ধুত্বের সংস্থা’ ‘একটি আন্তঃক্রিয়ার সংস্থা’ অথবা ‘সামাজিকীকরণের জন্য সংস্থা’। এ ধরনের নাম একাকিত্বের অন্য সব দিককে তুলে ধরবে, যা ভুক্তভোগীদের বেশি আকর্ষণ করবে।’