আর মাত্র এক দিন

ঢাকা থেকে ওড়ার প্রায় ছয় ঘণ্টা পর বোয়িং বিমানটি হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রানওয়ে ছোঁয়ার আগেই রাতের দোহার আলো ঝলমলে রূপটায় চোখ আটকাল। একটা ধারণা তখনই মিললা। দ্রুততম সময়ে ইমিগ্রেশন, কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বহির্গমন ফটকে আসতেই ধারণাটা বাস্তব হয়ে উঠল আরও। কাতার প্রস্তুত ফুটবল বিশ্বকাপকে বরণ করে নিতে। এ যে এক অন্যরকম বিশ্বকাপ। যাকে মেলানো যাবে না আগের আসরগুলোর সঙ্গে। বিমানবন্দরের একটা অংশে একঝাঁক আর্জেন্টাইন সমর্থকের ভিড়। সেই দলে ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ সবার গায়ে জড়ানো নীল-সাদা জার্সি। অন্যরকম বিশ্বকাপে তারা দল বেঁধে এসেছেন তাদের রাজার শেষ বিশ্বকাপের সাক্ষী হতে। লিওনেল মেসি তো কেবল আর্জেন্টিনার নয়, গত দুই দশক তিনি বিশ্ব শাসন করছেন নান্দনিক পায়ের কারুকাজে। সুবিশাল হামাদ বিমানবন্দর তাই সেজেছে ফুটবল জাদুকরদের বড় বড় ছবিতে। ফুটবলপ্রেমীদের কিলবিলে ভিড়টাই আয়োজকদের কাছে পরম প্রার্থিত। এরাই পারে কাতারকে বিশ্বের কাছে অন্যভাবে চেনাতে।  

এমন কিছুর জন্যই তো গেল যুগের প্রস্তুতি। মেসি, নেইমার, রোনালদো; কিংবা সেরা না হয়েও বিশ্বসেরা এমবাপ্পের লাখো অনুসারীতে ভরে উঠবে দোহার রাজপথ। জুন-জুলাইয়ের বিশ্বকাপ নভেম্বর-ডিসেম্বরে নিয়ে আসা কাতারকে দুনিয়ার শত কোটি জোড়া চোখের সামনে দিতে হবে পরীক্ষা। পরীক্ষাটা প্রমাণের, পরীক্ষাটা অনেক প্রশ্ন উড়িয়ে দিয়ে একটি সফল আয়োজক দেশের মুকুট জয়ের। তাতে তাদের চেষ্টা ও আন্তরিকতার কমতি নেই। রাতের আঁধারেই তা বোঝা গেছে। তবে দিনের আলোয় দেখলাম বিশ্বকাপকে ঘিরে আয়োজকদের মহাযজ্ঞ। নিজেদের অনন্য করে তুলতে কত কী যে করেছে এবং এখনো করে যাচ্ছে। একটা শহরকে গেল ক’বছরে তারা আমূল বদলে ফেলেছে। ধূসর মরুতে গড়ে তুলেছে শত কিলোমিটার মসৃণ রাজপথ, উড়াল সেতু। মাটি খুঁড়ে ছুটে বেড়াচ্ছে মেট্রোরেল। রাজপথগুলোর দু’পাশে পটে আঁকা ছবির মতো সাজানো ঘরবাড়ি। সুউচ্চ দালানগুলো যেন বিশ্বের কাছে নিজেদের আভিজাত্যের প্রমাণ দিতে চাইছে আকাশ ছুঁতে। আর এসব আয়োজন শুধুই দোহাকে ফুটবল শহরে রূপ দিতে। মাটি খুঁড়ে পাওয়া মনি-মাণিক্যের (পড়–ন তেল-গ্যাস) সদ্ব্যবহারে পারস্য উপসাগরের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা ছোট্ট দেশটি এখন অনেকের কাছেই ঈর্ষার-হিংসার। এত এত আয়োজন, এত এত খরচার পেছনের গল্পটা না হয় আরেক দিন বলা যাবে। আজ খোঁজার চেষ্টা করি কাতার কেন অনন্য?

মাত্র কয়েক ঘণ্টার কাতার অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারলাম, এ যেন সত্যিকারের মিলনমেলা! কাতার ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টার বদলে হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া ব্রডকাস্ট সেন্টারে। বিশ্বকাপের দু’দিন আগেই সেখানে জড়ো হয়েছেন বিভিন্ন দেশ থেকে আসা হাজারো সাংবাদিক। ইউরোপ, আমেরিকার ডাকাবুকো মিডিয়ার কর্মীদের যেমন পদচারণা, সমানভাবে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন আফ্রিকা, এশিয়া থেকে আসা অগণিত সংবাদকর্মী। একই চিত্র দোহার প্রতিটি ফ্যান জোনে। বহুজাতিক ফুটবলপ্রেমীরা সেরে নিচ্ছেন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রিয় দলকে সমর্থন জানাতে এখন যে তাদের আর এ শহর থেকে হাজার মাইল দূরের অন্য শহরে যেতে হবে না। ৫১ বর্গমাইলের ছোট্ট দোহাতে গড়ে উঠেছে আটটি আধুনিক ভেন্যু। এই শহরেই ব্যবস্থা করা হয়েছে ফুটবল লড়াইয়ে যোগ দিতে আসা ৩২ দলের আবাসন ক্যাম্প। লাখো ফুটবলপ্রেমীরও কেন্দ্রবিন্দু এই দোহা। এমনটা কি আগে কখনো হয়েছে? এক শহরের বিশ্বকাপ বলেই এটা সত্যিকারের মিলনমেলা। এক শহরের বিশ্বকাপ বলেই লাখো ফুটবলপ্রেমীকে কেবল নিজ দলকে অনুসরণ করতে ছুটতে হবে না এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত। বাড়তি হিসেবে মিলবে অন্য দেশ, অন্য দল, অন্য তারকাদের ফুটবলে বুঁদ হওয়ার সুযোগ। বিশ্বজোড়া সাবেক তারকারাও অনেক দিন পর মেতে উঠবেন অন্যরকম আড্ডায়। সমগ্র ফুটবল বিশ্বটাকেই যে এক সুতোয় গেঁথে ফেলতে প্রস্তুত দোহা। এ যেন এক বিশাল মঞ্চ। মিলেমিশে একাকার হয়ে ফুটবলের মানুষগুলো শুধুই মেতে উঠবেন ফুটবলের রোমাঞ্চে।

কাতার অন্যরকম, কারণ মাঠের যোদ্ধাদের পোহাতে হবে না স্বল্প সময়ে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দেওয়ার হ্যাপা, যেটা শেষ তিনটি বিশ্বকাপেই হয়েছে। সর্বশেষটা রাশিয়ায়। যার এক শহর থেকে অন্য শহরে আকাশপথে যেতেও পেরিয়ে যেত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কাতারে সেই ঝক্কি-ঝামেলা নেই। সেটা নেই বলেই ফুটবলটা এখানে হয়ে উঠবে মুখ্য।

এ দেশটার স্থান ফুটবলের অভিজাত মহলে নেই। অথচ এই এক বিশ্বকাপ দিয়েই কাতার চাইছে নিজেদের অন্যভাবে চেনাতে ভীষণভাবে। তবে চাওয়া যে সব পাওয়ায় বদলাবে, তা নয়। এখনো অনেক কিছু নিয়েই হচ্ছে আলোচনা-সমালোচনা। জুনের বিশ্বকাপ নভেম্বরে আসায় বলে ভাববেন না ফুটবলাররা বড্ড স্বস্তিতে আছেন! কাতারের গ্রীষ্মকালীন উত্তাপের কুখ্যাতি জগৎজোড়া। কখনো কখনো তা ছাড়িয়ে যায় ৫০ ডিগ্রির মাপকাঠি। নভেম্বরে গরম অবশ্য ততটা নয়। তবে যতটা, তাতে ফুটবলারদের স্বাভাবিক ফুটবল খেলা ও চোখ দিয়ে ভক্তদের ফুটবল গেলার কাজটা সহজ হওয়ার কথা নয়। রাতে তাপমাত্রা কিছুটা কমে যায়। সূর্যের ঘুমের সময়টায় পারস্য উপসাগর থেকে ভেসে আসা হাওয়া গায়ে প্রশান্তি ছড়িয়ে দেয় কিছুটা। তবে ঘুম ভাঙার পর তেজদীপ্ত রবিরাজ যেন হাজির হয়ে যায় মগজ গলানোর খেয়াল নিয়ে।

কাতারের এই অসহনীয় গরম নিয়ে বহুদিন ধরেই কথা উঠছে। আলোচনা জোরেশোরে আছে এখনো। তবে সূর্যের তেজকে শাসন করতে কাতারের চেষ্টার কমতি নেই। তাতে মাটির তলার সম্পদের মজুদ কমে গেলেও। মাঠে ও ফুটবল স্থাপনায় যাতে সূর্য রাজত্ব করতে না পারে, রাজত্ব যাতে মেসিদেরই হয়, সে জন্য বসানো হয়েছে শক্তিশালী শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র। এ যেন সূর্যের সঙ্গে অর্থের এক অসম লড়াই!

এই লড়াইয়ে আয়োজকদের জয়ের ব্যাপারে এখনো সন্দিহান পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো। কাতারের অকল্পনীয় চেষ্টার প্রশংসা দূরে থাকা তারা ব্যস্ত এই নভেম্বরেও দোহার ৩০-৩২ ডিগ্রি তাপমাত্রায় খেলা ও এর ভাবী পরিণতিগুলো তুলে ধরতে। দোহায় ক্যাম্প শুরু করা ওয়েলস দল এর মধ্যেই গরমের অত্যাচারে তাদের ট্রেনিং সূচিতে পরিবর্তন এনেছে অনেকবার। বিকেলের কড়া রোদের সূচিগুলো তারা নিয়ে গেছে রাতে। দলটির ফরোয়ার্ড মার্ক হ্যারিসের কথায়, ‘আমরা হোটেলে হাঁটাহাঁটি করার সময়ও সমানে ঘামছি। বেলা ১১টায় হাঁটতে বেরিয়ে তো অসহনীয় তাপের মধ্যে পড়তে হয়েছে।’ ব্রিটেইন ইউনিভার্সিটি অব পোর্টসমাউথের অধ্যাপক মাইক টিপটনের ফুটবল মনোবিদ হিসেবে দুনিয়াজোড়া খ্যাতি। তিনিও কাতারে এসেছেন অন্যরকম বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা নিতে। বল মাঠে গড়ানোর আগে অবশ্য তার মনের কোণে উঁকি দিচ্ছে আশঙ্কা। এই গরম ফুটবলারদের কেবল স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলবে না; এই বিশেষজ্ঞের মতে তাদের মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে ‘অতি গরমে ফুটবলারদের হিট স্ট্রোকের প্রবণতা বাড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি মানসিকভাবেও অস্বাভাবিক করে তুলবে। অতি গরমে খেলার সময় একজন ফুটবলার বারবার ভুল সিদ্ধান্ত নিতে থাকবে। এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে তারা হয়তো বেশি বেশি অনুশীলন করতে চাইবে। তাতে তাদের সমস্যা আরও বাড়বে। আমার মনে হয় এই আবহাওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর খেলা স্বাভাবিক ছন্দ হারাবে।’

কাতারের সংবাদমাধ্যমগুলো অবশ্য এ সবকিছুকেই অপপ্রচার হিসেবে দাবি করছে। হোস্ট কান্ট্রি মিডিয়া সেন্টারের ফটকে কথা হলো আল-রায়ার সংবাদকর্মীর সঙ্গে। ভাঙা ভাঙা ইংলিশে এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তাইফ আরশিদে বলেন, ‘স্টেডিয়াম ও ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে তাপমাত্রা সহনীয় রাখতে শক্তিশালী শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তাতে বড় বেশি সমস্যা হতে দেখিনি এখনো। অথচ পশ্চিমা মিডিয়া এগুলোকে মিথ্যাভাবে উপস্থাপন করছে। আসলে কাতার আয়োজক হিসেবে সফল, এটাই তারা মানতে চাইছে না। তবে জেনে রাখো, ১৮ ডিসেম্বর বিশ্ববাসী এক বাক্যে কাতারকে সফল আয়োজক দেশ হিসেবে স্বীকার করে নেবে।’

কাতার এ কারণেও অন্যরকম। মাঠের লড়াই শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগেও তাদের নিয়ে চলছে নিন্দুকদের নিন্দে-মন্দ। তারপরও ভরদুপুরে রাজপথে সেনেগালিজ সমর্থকদের আজব সাজে ভুভুজেলা বাজাতে দেখে, কিংবা পানশালায় পশ্চিমাদের অবাধ যাতায়াত দেখেই মেনে নিতে হয় এই কাতার হাজির হয়েছে অন্যরূপে। যেখানে সবকিছু ছাড়িয়ে জয় হবে ফুটবলের।