নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার শীর্ষ সন্ত্রাসী বজলুর রহমান বজলু গ্রেপ্তারে চনপাড়া পুর্নবাসনের লোকজনের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। জামিনে বের হয়ে এসে আবারও অত্যাচার নির্যাতন করতে পারে এমন শঙ্কায় চনপাড়াবাসীর মাঝে চাপা আতঙ্কও বিরাজ করছে। চনপাড়া এলাকায় বজলুর বাহিনীর সদস্যরা এখনো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
শুক্রবার (১৮ নভেম্বর) বিকালে র্যাব-১ শীর্ষ সন্ত্রাসী বজলুর রহমান বজলুকে চনপাড়া থেকে গ্রেপ্তার করে। র্যাব জানায়, গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন, ৫ রাউন্ড গুলি, জাল টাকা উদ্ধার করা হয়।
শনিবার (১৯ নভেম্বর) দুপুরে র্যাব-১ এর সদস্যরা বজলুর রহমান বজলুকে রূপগঞ্জ থানায় সোপর্দ করেন।
দুপুরে চনপাড়া এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গোটা চনপাড়ায় নিস্তব্ধতা। বেশ কিছু দোকানপাট খোলা। মানুষের মাঝে আতঙ্কের ছাপ। কথা বলতে এগিয়ে গেলে অনেকে এড়িয়ে যান। বজলু গ্রেপ্তারের পরও মানুষ বজলুর ব্যাপারে মুখ খুলতে ভয় পান এখনও। দোকানপাট খোলা থাকলেও বস্তির অলি-গলিতে তেমন কোন লোকজন নেই। সবাই আতঙ্কে রয়েছেন এরপর না জানি কি হয়। বজলু কি জামিনে বেরিয়ে আসবে?
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বজলু গ্রেপ্তারে চনপাড়া পুর্নবাসন এলাকায় স্বস্তি নেমে এসেছে। স্থানীয়রা প্রকাশ্যে স্বস্তি প্রকাশ করতে না পারলেও ভেতরে ভেতরে সাধারণ মানুষ খুব খুশি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বলেন, ভাই বজলু গ্রেপ্তারে আমরা খুব খুশি। চনপাড়ায় শান্তি আইছে। তয় জামিনে বের অইয়া আইলে না জানি কি অয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফার্নিচার ব্যবসায়ী বলেন, আমার দোকানের ছবি বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে দেখিয়েছে। আল্লায় জানে জামিনে এসে কি করে। হয়তো মরতে হবে নতুবা লাখ লাখ টাকা গুণতে হবে।
আলমগীর হোসেন বলেন, আমি টিভি চ্যানেলে বজলুর ব্যাপারে ওপেন কথা বলছি। ও বের হয়ে আসলে আমাকে মেরে ফেলবে। নাম প্রকাশে কয়েকজন নারী জানান, আমরা চনপাড়ায় শান্তি চাই। চনপাড়ায় আর যেনো মাদক ব্যবসা না হয় আমরা প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মী জানান, বজলুর মতো লোক আওয়ামী লীগের মতো প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী দলে যদি আবার স্থান পায় তাহলে দলের বারোটা বাজবে। চনপাড়ার আওয়ামী লীগকে বজলু শেষ করে ফেলেছে। চনপাড়ার মহিলা লীগের এক নেত্রী নাম না প্রকাশে অনিচ্ছুক বলেন, গত এক যুগ ধরে বজলু চনপাড়ায় ত্রাস সৃষ্টি করেছে। তার ও তার বাহিনীর কাছে চনপাড়াবাসী জিম্মি হয়ে পড়েছিলো। খোদ আওয়ামী লীগের লোকজন গত এক যুগ তার হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, গত ১০টা বছর আমরা অশান্তিতে ছিলাম। বজলু মেম্বারকে টাকা দিয়া ব্যবসা চালাইতে হতো। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া একটু শান্তি পাইলাম। তবে ভয়ে আছি। জামিনে আইসা কি জানি করে।
চনপাড়া পুর্নবাসন কেন্দ্র এলাকার কয়েকজন আওয়ামী লীগ কর্মী বলেন, এক সময়ে নুন আনতে পানতা ফুরানো বজলু এখন পিএস, এপিএস, গানম্যান নিয়ে চলে। অপরাধের নিয়ন্ত্রক বলেই সে এভাবে চলতে পারে। বজলুর বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে হামলা-মামলার শিকার হতে হয় স্থানীয় দলীয় কর্মীদের। এজন্য কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বলতে চায় না। আমরা বজলুকে নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় রয়েছি। এতো কিছু হয়ে যাওয়ার পরও বজলুর রহমান বজলুকে উপজেলা আওয়ামী লীগের নবগঠিত কমিটির কার্যকরী সদস্য পদ এখনও বহাল রয়েছে। এতে বোঝা যায় অপরাধের নিয়ন্ত্রক বজলুকে কমিটির নেতৃবৃন্দরা এখনও প্রশ্রয় দিচ্ছেন।
র্যাব জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, বজলুর রহমান ওরফে বজলু কায়েতপাড়া ইউপির ৯নং ওয়ার্ডের মেম্বার। সে স্থানীয় উঠতি বয়সের ছেলেদের কাছে বজলু ভাই নামে পরিচিত। বিভিন্ন সোর্স তার ছত্রছায়ায় এলাকার ছেলেদেরকে টাকা প্রদান করে বিভিন্ন প্রকার অপকর্ম যেমন- হত্যা, মাদক বেচাকেনা, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি, কিশোর গ্যাং, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি এবং পতিতালয় পরিচালনা করে। কেউ চাঁদা না দিলে তার কপালে নেমে আসত নির্যাতনের ভয়াবহতা। এসব আধিপত্য বিস্তার নিয়ে গত এক-দেড় বছরে নিহত হয়েছেন ছয়জন।
উল্লেখ্য গত ২৭ সেপ্টেম্বর অপরাধী গ্রেপ্তারে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা (র্যাব) চনপাড়া এলাকায় অভিযান চালালে বজলুর রহমান ওরফে বজলুর নির্দেশে অপরাধীরা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আক্রমণ করে অপরাধী ছিনিয়ে নেওয়ারও অপচেষ্টা চালায়।