জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আত্মনির্ভরশীল হতে হবে

স্থপতি ও নগরপরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব পরিবেশ ও সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। তিনি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। জাতিসংঘের চলমান জলবায়ু বিষয়ক শীর্ষ সম্মেলন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং আমাদের নগর পরিকল্পনা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর : ‘জলবায়ু পরিবর্তনে পৃথিবী যন্ত্রণার বার্তা দিচ্ছে’ এই সতর্কবার্তা জানিয়ে চলছে জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক শীর্ষ সম্মেলন। বর্তমান বৈশি^ক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের একজন পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ও নগর পরিকল্পক হিসেবে আপনার কাছে এই সম্মেলনের তাৎপর্য কী?

ইকবাল হাবিব : কপ-২৬ এর মতোই কপ-২৭’ও একটি প্রহসনের সম্মেলন হতে যাচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতার শিকার হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সাবের হোসেন চৌধুরী আমাদের প্রস্তাব উত্থাপন করলেও এবারও আমাদের প্রাপ্য জলবায়ু তহবিল আমরা রিলিজ করতে পারিনি। সত্যিকার অর্থেই সারা বিশ^ জেনে-বুঝেও, বিশেষ করে ইউরোপে বৈশ্বিক শুষ্কতা, বন্যা এবং দাবানলের মতো বাস্তবতা সত্ত্বেও এবারও ঐকমত্যের ভিত্তিতে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ মূল অনুঘটক দেশগুলো তাদের এ বিষয়ে উদ্যোগের কেবল প্রতিশ্রুতিই দিয়ে গেল। এই প্রতিশ্রুতি সাপেক্ষে আমাদের অবস্থা বেহাল। জলবায়ু উদ্বাস্তু হিসেবে বিশাল একটা অংশের শহর বা নগর অভিমুখিনতার কারণে আমাদের মতো দেশের নগরগুলোর যে অবস্থা, বস্তুনিষ্ঠভাবে বললে পরিবেশ আগ্রাসী যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সেগুলো আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিরাট জনস্বাস্থ্যগত দুর্ভাবনা ও দুর্যোগের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য আমাদের নগরগুলোর যে প্রস্তুতি, সেগুলোর জন্য যথোপযুক্ত কারিগরি সহায়তা অথবা বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারছি না। পুরো বিষয়টা একটা চক্রের মধ্যে পড়ে গেছে। আমরা নগরগুলোতে বাস্তবসম্মত পরিবেশবান্ধবতা নিশ্চিত করতে পারছি না। জনঘনত্ব বাড়ছে। কৃষিভিত্তিক খাদ্য নিরাপত্তা বিঘিœত হচ্ছে। একইসঙ্গে জনস্বাস্থ্যের ব্যাপক অবনতি ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে আমরা যদি বিকেন্দ্রীকরণের কাজটাও করতে পারতাম তাহলে একটা বড় ধরনের উন্নয়ন হতে পারত। আমরা অনেক ইপিজেড, বিইপিজেড, বেজা অথবা হাইটেক পার্ক করা সত্ত্বেও, বিনিয়োগবান্ধবতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও এক্ষেত্রে বিনিয়োগ আসছে না। সবকিছু মিলিয়ে এবারের কপ-২৭ হতাশা এবং কপ-২৬ এরই গতিধারায় একইরকম প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি ছাড়া আর কিছু মনে হচ্ছে না। 

দেশ রূপান্তর : দায়ী উন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণ কমানোর ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি ছিল, মানে প্যারিস চুক্তি তো ব্যর্থ?

ইকবাল হাবিব : পুরোপুরি ব্যর্থ। শুধু যে ব্যর্থ হয়েছে সেটাই না, উষ্ণতা কমানোর যে চুক্তিবদ্ধ বিধিব্যবস্থার কথা ছিল, সেখান থেকেও সরে আসছে। এবার ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের নামে জার্মানি পুনরায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাচ্ছে। পুরো ইউরোপ এখন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমানোর সব প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসছে। তারা প্রতিশ্রুত টাকাও দিচ্ছে না আবার তাপমাত্রা কমাতে তাদের যেসব পদক্ষেপ নেওয়ার কথা সেখান থেকেও সরে আসছে যুদ্ধের অজুহাত দিয়ে।

দেশ রূপান্তর : জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের মতো ক্ষতির শিকার দেশগুলোর প্রত্যাশা পূরণের কোনো সম্ভাবনা দেখছেন?

ইকবাল হাবিব : আমি এখনো দেখছি না। যদিও বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে অন্যতম প্রধান দেশ। যারা নিজেরাই নিজেদের তহবিলটা সবার আগে বানিয়ে সারা পৃথিবীকে এটা বলার চেষ্টা করেছে যে, আমরা স্ব-উদ্যোগে আমাদের তহবিলটা অন্তত তৈরি করেছি, আপনারা এবার আপনাদের অংশটুক দেন। এতকিছু করার পরও আমাদের প্রতিশ্রুত তহবিল পাওয়ায় অগ্রগতি হচ্ছে না। এবারও তারা প্রতিশ্রুতি ছাড়া কিছুই দিতে পারেনি। তো প্রতিশ্রুতির এই আদল তো আমরা অতীতেও দেখেছি। আমি নিজে কপ ২৬-এ গ্লাসগোতে গিয়েছিলাম, সেখানেও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সত্যিকার অর্থে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এবারও তাই করল। পরের বার তারা এটা মেজার করবে কি না বা মেজারেবল হবে কি না সেটারও কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ যে অগ্রগতির প্রক্রিয়া শুরু করা, যেটা এবারের দাবি ছিল সেটাতেও তারা একমত হয়নি। আমার কাছে মনে হয়, এটা রসিকতায় পরিণত হয়েছে, প্যারিসের যে অঙ্গীকার, সেটা কেবলমাত্র অঙ্গীকার ছাড়া অন্য কিছু ছিল কি না, সেটা একটা বিরাট প্রশ্ন।

দেশ রূপান্তর : চীন তো বিষয়টা থেকে সরেই গিয়েছে, বিষয়গুলো তো আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

ইকবাল হাবিব : হ্যাঁ। চীনের যুক্তি তো ফেলে দেওয়ার মতো না। তারা বলছে উন্নত বিশ্বের উৎপাদনের যে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ, তার কারখানা হিসেবে আপনি যতদিন চীনকে রেখে দেবেন ততদিন তার পক্ষে কার্বন নিঃসরণ কমানোটা কঠিন। এখনো উন্নত বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের যন্ত্রাংশ তৈরির সমস্ত কারখানাগুলো চীননির্ভর। এটা আমরা খেয়াল করছি না। সবকিছু মিলিয়ে আমরা একটা চক্রের পাল্লায় পড়েছি। এরা গোষ্ঠীভিত্তিক চিন্তা করছে। শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থের কথা ভাবছে। কিন্তু সবাই মিলে যে টেকসই স্থিতির দিকে যাওয়ার কথা যা সবাই মিলে করব সেটা না করে বরং আমাদের চাপ দেওয়া হচ্ছে আমরা যেন সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য বিকল্প জ্বালানি উৎপাদনের দিকে যাই। যদিও আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে সৌরবিদ্যুতের একটা কার্যক্রম শুরু করেছি।

দেশ রূপান্তর : কিছুদিন আগে আমাদের এক মন্ত্রী তো বললেন যে লার্জ স্কেলে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদনে যাওয়ার মতো জমি নেই দেশে।

ইকবাল হাবিব : হ্যাঁ, শুধু জমি না, আমাদের রোদের যে তীব্রতা সেটা ভারতের মধ্যপ্রদেশের, মানে মরুভূমি এলাকার রোদের তীব্রতার তুলনায় আট ভাগের একভাগ। তারমানে এটি যারা বলছেন তারা পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ ছাড়াই বলছেন। আমরা একটা জলের দেশ, তারপর আমাদের যে জনসংখ্যা, যে জনঘনত্ব, এখানে জমি স্পেয়ার করার কোনো সুযোগ নেই। তারপর রয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা ও খাদ্য উৎপাদনের মতো বিষয়। যার কারণে পুরো বিষয়টাই আমাদের মতো দেশের জন্য সম্ভব না। এই কপগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমাদেরই ভাবতে হবে যে, আমরা নিজেরাই নিজেদের কীভাবে অভিযোজনের মধ্য দিয়ে বা রেজিলিয়েন্সের মাধ্যমে এই জায়গা থেকে বের হয়ে আত্মনির্ভরশীল হতে পারি। আমাদের আসলে ওই ডিপেন্ডেন্ট চিন্তা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। মেটাফোর ব্যবহার না করেই বলছি আমাদের একটা প্যারাডাইম শিফট দরকার, মানসিকভাবে, যে উই ক্যান নট ওয়েটিং ফর গডো, এনি মোর। কোনো গডোর জন্য আমরা আর অপেক্ষা করতে পারব না। 

দেশ রূপান্তর : ঢাকা পৃথিবীর অন্যতম দূষিত মহানগর। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ এবং সবুজহীনতায় ধুঁকতে থাকা নগরী। ঢাকাকে বাসযোগ্য করার বিষয়ে সরকারের প্রস্তুতি ও কর্মকা-কে কীভাবে দেখেন?

ইকবাল হাবিব : আগের প্রশ্নের উত্তর যেখানে শেষ করেছি, আমি মনে করি আমাদের একটুখানি আত্মনির্ভরশীল পরিকল্পনা করতে হবে। সেক্ষেত্রে আমাদের সবার অন্তর্ভুক্তিতার পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আমাদের গণপরিবহনভিত্তিক চলাচল, সাশ্রয়ী আবাসন, সবার জন্য আবাসন, ভূমির ব্যবসা থেকে বা শুধু ভূমির প্রকল্প থেকে সরে এসে প্রত্যেকের জন্য অন্তত একটা ইউনিট বা ফ্ল্যাট... সেই ধারণায় শিফট করতে হবে। প্রয়োজনে সরকারকে ভূমি ব্যাংক তৈরি করতে হরে। প্রয়োজন হলে আইন ও অনুশাসন পরিবর্তন করতে হবে। পুঁজিকেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে সরে সরকারকে জমি বা ভূমি ব্যাংক তৈরির জন্য আইনি অগ্রাধিকার দিতে হবে, যার ভিত্তিতে সরকার যেকোনো জায়গা অ্যাক্যুইজেশন করতে পারবে। জনগণের জন্য গণপরিসর ভিত্তিক বা গণমানুষের আবাসন সংকট নিরসনের জন্য অন্তর্ভুক্তিতার অগ্রাধিকার দিতে হবে। এটা আবাসনের ক্ষেত্রে, নাগরিক সুবিধাদির ক্ষেত্রে, অবশ্যই মানুষের চলাচলের ক্ষেত্রেও দরকার। অর্থাৎ চলাচলের ওপর অগ্রাধিকার দিয়ে ব্যক্তিগত বা বিশেষ গোষ্ঠীর চলাচলকে খর্ব করার বা নিয়ন্ত্রণ করার যে পদ্ধতিগুলো সারা পৃথিবীতে পরীক্ষিত সেগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। এটার মধ্য দিয়েই আমরা সবাই মিলে ভাগাভাগি করে সবাই মিলে বেঁচে থাকার বাস্তবোচিত জায়গায় আমরা যেতে পারব। সেটাই হবে কার্যত পরিবেশবান্ধবতার দিকে এবং জনবান্ধবতার দিকে এগিয়ে যাওয়া। এটা বলা যেমন সহজ, করাটা যে কঠিন, তা না। সেক্ষেত্রে যারা করবে, তাদের সব ধরনের প্রভাবমুক্ত, গোষ্ঠীকেন্দ্রিকতা-মুক্ত, ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তা থেকে মুক্ত হতে হবে। এতে যদি নিজেদের স্বার্থও ছাড় দিতে হয়, সেই জায়গায় যেতে হবে। গণপরিবহন নিয়ে আমাদের যারা সিদ্ধান্ত নেবেন তারা তো ব্যক্তিগত গাড়িতে চলেন। গণকেন্দ্রিক আবাসন ব্যবস্থায় যেতে পারছি না, কারণ পুঁজির বিনিয়োগ হিসেবে আমরা জমিকে কেন্দ্র করেছি। জমি এখন পণ্য। এই জায়গাগুলোতে পরিবর্তন প্রয়োজন। সেই রাজনৈতিক দর্শন রাজনীতিবিদরা নেবেন সেটা আমি প্রত্যাশা করি। তা না হলে এই দেশে সুস্থভাবে, পরিবেশবান্ধব পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব হবে।