ফুটবল উন্মাদনায় বেদুইন মন

সাহিত্যে জাদুবাস্তবতার পরিভাষা এনে দেওয়া লাতিন আমেরিকার নোবেলজয়ী সাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের লেখায়, ফুটবল এক প্রবল সংক্রামক ব্যাধি। সমর্থকদের ছোঁয়াচে জীবাণুর মতো আক্রমণ করে ফুটবল, কিংবা ধর্মের মতো।  তিনি মনে করতেন, ‘হাজারো মানুষের ভিড়ে স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলা দেখা একটা ম্যাজিক্যাল, অবাস্তব অভিজ্ঞতা, পাগলামির মতো।’ এক সময় ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ বলা হতো অলিম্পিককে। তবে সেই তকমা এখন ফুটবল বিশ্বকাপ আসরের। রবিবার থেকে পশ্চিম এশিয়ার দেশ কাতারের মরুভূমির বুকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উৎসব ফুটবল বিশ্বকাপের ২২তম আসর শুরু হলো। এটিই হতে যাচ্ছে এ যাবৎকালের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশ্বকাপ আয়োজন। মেসির বাঁ-পায়ের ফ্রি কিক, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালডোর  পাখির মতো শূন্যে ভাসা, নেইমারের ড্রিবলিং আর মাঠ ও মাঠের বাইরের উন্মাদনার জাদুবাস্তবতায় কে হবেন নায়ক? এসব নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা, তর্ক-বিতর্ক।

পশ্চিম এশিয়ার প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক দেশ মধ্যপ্রাচ্যের কাতার। আয়োজক স্বত্ব পাওয়ার পর থেকেই দেশটির গরম আবহাওয়া নিয়ে সমালোচনার শুরু। যেখানে যোগ হয় দেশটির মানবাধিকার রেকর্ড, অভিবাসী শ্রমিকদের সঙ্গে ‘অমানবিক আচরণ’ এবং দেশটির আইনে সমকামিতাকে অপরাধ হিসেবে তুলে ধরার মতো বিষয়গুলো। ‘স্পোর্টসওয়াশিং’ শব্দটি তাই এবারও বেশ উচ্চারিত হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ২০২১ সালে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, বিশ্বকাপ উপলক্ষে কাতারে স্টেডিয়াম বানাতে আসা বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং নেপালের ৬ হাজার ৫০০ অভিবাসী শ্রমিক মারা যান। যদিও কাতার সরকার বলেছিল, শ্রমিক মারা যাওয়ার সংখ্যাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। তবে বিশ্বকাপ শুরুর আগের দিন ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো দোহায় সংবাদ সম্মেলনে কাতারের মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে প্রতিবেদনকে ইউরোপিয়ানদের ‘ভ-ামি’ বলে আখ্যা দেন। ফিফা সভাপতি বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের দেশটির অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়ে কথা বলার আগে ইউরোপিয়ানদের নিজেদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘যদি ইউরোপ সত্যিই এসব মানুষকে নিয়ে ভাবে, তাহলে তাদের উচিত এসব শ্রমিককে ইউরোপ-আমেরিকায় কাজ করার সুযোগ করে দেওয়া, তাদের জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা করে দেওয়া।’ অন্যদিকে, শোনা যাচ্ছে, প্রথম দিন ইকুয়েডরের সঙ্গে খেলায় এক গোলে জিতবে কাতার, আর সেটা নিশ্চিত করতে হয়েছে অর্থের লেনদেন। এটা সত্য হলে কাতার বিশ^কাপ প্রদীপের নিচের অন্ধকারেই নিমজ্জিত হবে। এদিকে রক্ষণশীল আরব মুসলিম দেশ হিসেবে পরিচিত কাতারে, ফুটবলপ্রেমীরা বিশ্বকাপের দর্শক হিসেবে প্রাণ খুলে আনন্দ করতে পারবেন কি না তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। নারী দর্শকদের পোশাক নিয়ে নিষেধাজ্ঞা দিয়েও প্রবল সমালোচনা হয়েছে। এলজিবিটি কমিউনিটির অধিকারের দাবিতে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ৩২টি দলের মধ্যে ৮টি দলের খেলোয়াড়রা রংধনু রিস্টব্যান্ড হাতে পরে মাঠে নামবে। জার্সিতে হামেলের লোগো ঝাপসা করেছে ডেনমার্ক দল, শ্রমিকদের মৃত্যু নিয়ে পোশাক নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর লুকোচুরির প্রবণতার প্রতিবাদে। বিশ্বকাপের খেলা পাবলিক স্ক্রিনিং না করার সিদ্ধান্ত হয়েছে লন্ডন, প্যারিস এবং ফ্রান্সের কয়েকটি শহরে। তবু, আমরা আশা করি আসছে এক মাস বিশ্ববাসী শুধুই বুঁদ হয়ে থাকবে ফুটবলে, অনাবিল আনন্দে।

বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে বাংলাদেশ খেলতে না পারলেও তার সগৌরব উপস্থিতি থাকছে। অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিশ্বকাপের জন্য নির্মিত আটটি স্টেডিয়াম নির্মাণে অবদান রাখার কারণে ইতিমধ্যে কাতার সরকার ১১৯টি দেশের ফ্ল্যাগ দিয়ে ‘ফ্ল্যাগ প্লাজা’ বানিয়েছে, সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঘাম ঝরানো শ্রমে বাংলাদেশের পতাকাও স্থান পেয়েছে। দেশের তৈরি ৬ লাখ টি-শার্ট থাকছে মর্যাদাপূর্ণ এই আসরে। ফিফার অফিশিয়াল ভলান্টিয়ার হিসেবে প্রায় ৪০০ বাংলাদেশি প্রস্তুত রয়েছেন। বিশ্বকাপ খেলা চলাকালীন মাঠের প্রধান চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বাংলাদেশি নারী চিকিৎসক আয়েশা পারভিন। বিভিন্ন ট্যাক্সি কোম্পানি ও রাইড শেয়ারিং কোম্পানিতে কর্মরত গাড়িচালকদের মধ্যে প্রায় আট হাজার বাংলাদেশি আছেন। দার্শনিক, মার্কসবাদী তাত্ত্বিক আন্তোনিও গ্রামসির কাছে ‘ফুটবল হলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজের মডেল। ফুটবল চায় সৃজনশীলতা। ফুটবল মানে প্রতিযোগিতা, সংঘাত। কিন্তু এটি নিয়ন্ত্রিত হয় একটি শোভনসুন্দর খেলার অলিখিত নিয়মের দ্বারা।’ আলজেরীয় সাহিত্যিক আলবেয়ার কামু ছিলেন পেশাদার ফুটবলার। তিনি বলেছেন, ‘একজন মানুষের নৈতিকতা ও কর্তব্যবোধ সম্পর্কে আমি যতটুকু জেনেছি, তার জন্য আমি ফুটবলের কাছে ঋণী।’ ফুটবল মানে একটাই মাঠ। একটাই বল। সবার জন্য সমান। খেলোয়াড়দের মধ্যে পার্থক্য করে দেয় শুধু পরিশ্রম আর প্রতিভা। কখনো স্বপ্নপূরণ, কখনো স্বপ্নভঙ্গ। কখনো নায়ক, কখনো খলনায়ক। ভাঙাগড়ার বিশ্বকাপ, হাসি-কান্নার বিশ্বকাপ। কাতারেও কেউ কাঁদবে, কেউ হাসবে। পশ্চিম এশিয়ার প্রথম বিশ্বকাপ নিশ্চয়ই নতুন নায়ক খুঁজে দেবে। ফুটবল উন্মাদনায় বেদুইন হয়ে ওঠা মন চায়মহামারী, যুদ্ধ আর শঙ্কার কথা ক্ষণিকের জন্য ভুলে ফুটবলের মহোৎসবে মেতে উঠব সবাই।