উন্নয়ন ও শাসনতন্ত্রের প্যারাডক্স

বাংলাদেশ নামক এই ভূখন্ডের মানুষ নিজস্ব রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করার সুযোগ পেয়েছে ১৯৭১ সালের দেশের স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে। আমরা সবাই জানি আমাদের এই স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছে অনেক ত্যাগ ও তিতিক্ষার মাধ্যমে। বাংলাদেশ নামক দেশটি যখন তৈরি হয় তখন উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত নানান সমস্যায় দেশের মানুষ ছিল জর্জরিত। ভঙ্গুর অবকাঠামো, অতি দারিদ্র্যের হার, পুষ্টিহীনতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক চাহিদা ও অধিকারের অপ্রাপ্তি ছিল প্রায় সর্বব্যাপী। উল্লেখ্য, এর পেছনে রয়েছে ঔপনিবেশিক যুগ থেকে শুরু করে ধারাবাহিকভাবে   পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ-বঞ্চনা ও পরাধীনতা। আর এ কাজে তারা ব্যবহার করেছে তাদের প্রশাসন ও সামরিক তন্ত্রকে। গত পঞ্চাশ বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি বিভিন্ন আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে এ দেশের অগ্রগতি অনেকের জন্য বিস্ময়কর। অনেকে একে ‘প্যারাডক্স’ বা স্ববিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। প্যারাডক্স এই অর্থে যে শাসনব্যবস্থায় ধারাবাহিক চ্যুতি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ধারাবাহিক উন্নয়ন করা সম্ভব? এতসব পরিবর্তন সত্ত্বেও এ দেশে ধীরে ধীরে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য বাড়ছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতার প্রকট ঘাটতি, ক্ষমতার কেন্দ্রিকতা, গোষ্ঠীগত স্বার্থের প্রাধান্য এবং জনগণের একটা বড় অংশের প্রান্তিকতা এখনো একটি বড় উন্নয়ন ইস্যু। অনেকে এটাকেই ‘প্যারাডক্স’-এর ফলাফল হিসেবে দেখে থাকেন আর এটিই আমাদের দেশের সার্বিক উন্নয়ন পরিস্থিতি পরবর্তী ধাপে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা।

১৯৭১ সালে স্বাধীন হলেও, স্বাধীন দেশেও রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো ছিল সেই ঔপনিবেশিক আমলের পুরনো ব্যবস্থাপনায়। বিজ্ঞজনরা বলেন, এখনো আমরা পাকিস্তান আমল তো বটেই অনেক ক্ষেত্রে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কাঠামো অনুসরণ করে রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনা করছি।

অনেক সময় ঔপনিবেশিকতার দর্শন শুধু রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, আমরা জনগণও এর দ্বারা প্রভাবিত। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলার আকাশ-বাতাস ও প্রকৃতিকে যতটা অন্তরে ধারণ করেছিলেন, ততটাই বুঝেছিলেন এ দেশের মানুষকে। তিনি তো আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করনি’। কবিগুরু বাঙালি ও মানুষ হওয়ার মধ্যে কী পার্থক্য খুঁজে পেয়েছেন তা এত সহজ করে বলা সহজ হয়। তবে স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু এর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে রেসকোর্স ময়দানের এক সমাবেশে তিনি কবিগুরুকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘সাত কোটি বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে।’ স্বাধীনতার সমসাময়িককালে বাঙালি জাতীয়তাবোধ ও সংস্কৃতির মধ্যে সমতা ও সাম্য বোধের যে উন্মেষ ঘটেছিল তা ক্ষমতার মোহের আবহে খুব বেশিদিন টিকে থাকতে পারেনি। যেমন পারেনি সমাজ কাঠামোকে দুর্নীতির গ্রাস থেকে মুক্ত করতে। স্বাধীনতার পরপরই বঙ্গবন্ধু এই সংকট বুঝতে পেরে রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার কাছে যে বিকল্প ছিল তা থেকে তিনি একটি বেছে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, অবশ্য, এই কাঠামো কতটুকু ভালো, কতটুকু মন্দ, কতটুকু গণতান্ত্রিক বা উদার তা নিয়ে প্রশ্ন করার যথেষ্ট সুযোগ আছে এবং থাকবেও।

বঙ্গবন্ধুর সেই প্রচেষ্টা যেমন সফল হয়নি, তাই শাসনব্যবস্থা নিয়ে আমাদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর পরও আমরা বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। অনেকেই বলে থাকেন, স্বাধীন বাংলাদেশে ক্ষমতার কেন্দ্র পরিবর্তন হলেও ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামো ও তথাকথিত ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হতে পারেনি। এখনো কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার দাপট ও পদে পদে সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব চোখে পড়ার মতো। এর প্রধানতম কারণ মনে হয় দেশ স্বাধীন হলেও আমরা শাসনব্যবস্থার কাঠামো যেমন স্বাধীন করতে পারিনি, তেমনি পারিনি আমাদের পুরাতন চিন্তাভাবনা বদলাতে। অন্যদিকে এই দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরে দেশের জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় কয়েক গুণ। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা যায়নি, গড়ে তোলা যায়নি অত্যাবশ্যকীয় অবকাঠামো। জনসংখ্যার একটা অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচ থেকে বের হয়েছে সত্য কিন্তু একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্য এবং ক্ষমতাবান ও ক্ষমতাহীনদের মধ্যে পার্থক্য। দেশকে আমরা যতই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ বলি না কেন বর্তমান ব্যবস্থাপনায় সেবা প্রদানকে কোনোভাবেই নাগরিকের অধিকার হিসেবে দেখা হয় না। বরং সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া অনেকে বেশি ভারসাম্যহীন ক্ষমতা সম্পর্ক দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক দলের নেতারাসহ বিভিন্ন পর্যায় থেকে শাসন কাঠামোর পুনর্গঠনের বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। অনেকেই শাসনব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টি বেশ জোরেশোরে নিয়ে আসছেন। আসলে আমাদের শাসন কাঠামোতে বিভিন্ন গোষ্ঠী ক্ষমতা আহরণ করেছে কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য শাসনব্যবস্থার সংকট সব সময়ই ছিল। অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির প্রশ্ন প্রায় সব সময় উত্থাপিত হয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সরকারি সেবা পেতে প্রায় সব সময়ই কাঠখড় পোহাতে হয়েছে। আর এখানেই মূল সংকটটি দৃশ্যমান। আর এই সংকট দূর করাই নতুন শাসনব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত, যেখানে সমতা ও সাম্য এবং ক্ষমতাহীনদের মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি সরকারি সেবা প্রদানের জন্য জনগণের কাছে স্বচ্ছতার পাশাপাশি জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে প্রক্রিয়ার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে বর্তমান দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের বড়ই প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমান ব্যবস্থাপনায় একদিকে যেমন নীতিগত ও কাঠামোগত সংকট রয়েছে এবং একই সঙ্গে এই বিশেষজ্ঞ জ্ঞানেরও ঘাটতি। প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির ধারণ করা বা প্রথাগত দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে বর্তমান প্রতিযোগিতায় তাল মেলানো সম্ভব হবে না।

নতুন যুগে নতুন ব্যবস্থাপনা ও নতুন কাঠামোর প্রশাসন হবেÑসেটাই প্রত্যাশিত। কাঠামো ঠিক রেখে শুধু পাত্র-পাত্রী পরিবর্তন করে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আশা করা উচিত হবে না। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে আজকে আমাদের বড় অর্জন বাংলাদেশ এখন দরিদ্র দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল বিশ্বে পদার্পণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো। এই উন্নয়নশীল বাংলাদেশের কাছে প্রত্যাশাও অনেক বেশি। পুরনো কাঠামো কিন্তু উন্নয়নশীল বাংলাদেশ বড় বেশি বেমানান। নিঃসন্দেহে এই উত্তরণ দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে নতুন চাহিদা তৈরি করবে এবং এই চাহিদা পূরণ করাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তৈরি হতে পারে। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে উত্তরণের এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার এখনই সময় এবং যে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন প্রচলিত চিন্তাভাবনা থেকে মুক্তি ও জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং এর মধ্য দিয়ে নতুন ব্যবস্থার গ্রহণ।

লেখক : উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

psmiraz@yahoo.com