জাদুকরের শেষের শুরু আজ

জাদুকরের জাদুর খেলা পৌঁছে গেছে অন্তিম পর্বে। বিশ্বকে মোহাবিষ্ট করে রাখা বালকটি কবে কীভাবে কিশোর থেকে তরুণ হয়ে নিজেই বাবা হয়ে গেছেন, ঘোরলাগা চোখে সেসব বিভ্রম বলেই মনে হয়। মনে হয় এই তো সেদিন, লম্বা চুলের শিশুসুলভ চেহারার এক কিশোরকে প্রথম খেলতে দেখা। সেই কিশোর যে কবে পেশিবহুল উল্কি আঁকা শরীরের এক যুবক হয়ে উঠলেন, তার পায়ের জাদুতে বুঁদ হয়ে থাকা সেই সময়টায় ঘড়িও যেন গিয়েছিল থমকে।

‘কিছুটা উত্তেজনা আর স্নায়ুর চাপ একই সঙ্গে কাজ করছে... কারণ এবারই শেষবার’, কিছুদিন আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন লিওনেল মেসি। কাতার বিশ্বকাপই তার শেষ বিশ্বকাপ, সিদ্ধান্ত বদল না করলে বিশ্বমঞ্চে এবারই শেষবারের মতো দেখা যাবে মেসির জাদুকরী নৈপুণ্য। সেজন্যই বোধহয় এবার বিশ্বকাপে দলের সঙ্গে অনেক একাত্ম। ব্রাজিলের বিপক্ষে কোপা আমেরিকার ফাইনালের আগে দলের সবাইকে তাতিয়ে তুলতে একটা ভাষণ দিয়েছিলেন মেসি।

কথাগুলো ছিল এরকম, ‘আমরা সবাই জানি আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল মুখোমুখি হওয়া মানে কী। সেসব নিয়ে কিছু বলতে চাই না। শুধু এইটুকু বলতে চাই, তোমাদের সবাইকে ধন্যবাদ এই ৪৫ দিনের জন্য। আমার জন্মদিনে আমি বলেছিলাম, আমরা দারুণ একটা দল হয়ে উঠেছি। তোমাদের সবার সঙ্গ আমি দারুণ উপভোগ করছি। এই ৪৫টা দিন আমরা একসঙ্গে ভ্রমণ করেছি, খেয়েছি, হোটেলে নিভৃতবাসে কাটিয়েছি, পরিবারকে দেখতে পাইনি। এমিলিয়ানো মার্তিনেস এই সময় এক মেয়ের বাবা হয়েছে, সে তার বাচ্চাকেও দেখতে পায়নি, কোলে নিতে পারেনি। একজনের ছেলে হয়েছে, তাকে সে দেখতে পেয়েছে অল্প কিছু সময়ের জন্য। কেন এত আত্মত্যাগ? সব এই মুহূর্তটার জন্য। আমরা একটা লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছি আর লক্ষ্য থেকে আমরা মাত্র এক ধাপ দূরে আছি। আর তোমরা কি জানো সবচেয়ে সেরা ব্যাপারটা কী? সেটা হচ্ছে সবকিছুর ওপর ইচ্ছে করছে আমরা কতটা জোরালোভাবে কাপটা জিততে চাই তার ওপর। সেজন্যই আমরা মাঠে যাব, আমরা আমাদের নিজেদের সামর্থ্যটা আর একধাপ বাড়িয়ে দেব এবং কাপটা জিতব। আমরা কাপটা বাড়ি নিয়ে যাব, আমাদের পরিবার আর বন্ধুদের দেখাব। তারা সবসময় আমাদের পাশে ছিল। পৃথিবীতে কোনো কিছু এমনি এমনি হয় না। এই কাপটা আমাদের জন্যই, আজ আমরা এখানে এই কাপটা জেতার জন্যই। এই আসরটা হওয়ার কথা ছিল আর্জেন্টিনায়, কিন্তু ঈশ্বর চেয়েছেন আমরা মারাকানা থেকে কাপ জিতে দেশে নিয়ে যাই তাই আমরা মাঠে যাব, শান্ত থাকব, যা করা দরকার করব আর কাপটা জিতব। আমরা এই কাপটা নিয়ে বাড়ি ফিরবই।’

মেসিকে কখনো শিরোপার জন্য এতটা ক্ষুধার্ত, এতটা উদগ্র মনে হয়নি। বার্সেলোনায় যখন ছিলেন, তখন শিরোপা জেতাটাকে বানিয়ে ফেলেছিলেন রোজকার ব্যাপার। হয় লা লিগা জিতছেন, নয়তো কোপা দেল রে, না হয় চ্যাম্পিয়নস লিগ। মেসির ক্যারিয়ারে এমন কোনো বছর বোধহয় নেই, যে বছর কোনো শিরোপা বা ব্যক্তিগত অর্জনের স্মারক তার হাতে ধরা দেয়নি। শুধু জাতীয় দলের জার্সি গায়েই মেসির ছিল না বড় কোনো অর্জন। কোপা আমেরিকার সবশেষ আসর জয়ের আগে তো আন্তর্জাতিক আসরে মেসির অর্জন বলতে যুব বিশ্বকাপ আর অলিম্পিকের সোনা। সর্বকালের সেরা বেছে নেওয়ার বিতর্কে যখন তার নামটা আসে, তখন প্রতিপক্ষ এই এক যুক্ততেই তো চুপ করিয়ে দেয় মেসির ভক্তদের।

মেসি নিজেও কি জাতীয় দলকে একটু দূরে ঠেলে রাখেননি? হয়তো টানা হারের হতাশা থেকেই চলে যেতে চেয়েছিলেন স্বেচ্ছা নির্বাসনে। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল, ২০১৫ ও ২০১৬’র কোপা আমেরিকার ফাইনাল। বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানি, কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলি মেসিকে করেছে শিরোপা বঞ্চিত। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন মেসি। আর্জেন্টিনার তখনকার রাষ্ট্রপতি, বুয়েনস এইরিসের মেয়রসহ অনেকেই মেসিকে অনুরোধ করেছিলেন অবসর ভেঙে ফিরে আসতে। মেসি ফিরেও এসেছিলেন এবং রাশিয়া বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে মাঠে ফিরে গোলও করেছিলেন। কিন্তু রাশিয়া বিশ্বকাপও খালি হাতে ফেরায় মেসিকে, ক্ষুদে জাদুকরের বিদায়ী বাঁশরিতেই বেজে ওঠে কিলিয়ান এমবাপ্পের আগমনী সুর।

এই বিশ্বকাপে মেসিকে মনে হচ্ছে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। রাশিয়া থেকে কাতার, মাঝের চার বছরে মেসির জীবনে ঘটে গেছে বেশকিছু বড় পরিবর্তন। আশৈশবের ঠিকানা বার্সেলোনা থেকে একরকম বের করেই দেওয়া হয়েছে মেসিকে। কোপা আমেরিকার সময় মেসি আসলে ছিলেন ক্লাবহীন, বার্সেলোনার সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ অথচ নতুন কোনো ক্লাবের সঙ্গে চুক্তি হয়নি। সেজন্যই কি জাতীয় দলের জার্সির মূল্যটা নতুন করে বুঝেছেন?

মেসির মধ্যে যার ছায়া সবচেয়ে বেশি খোঁজা হয়, সেই ডিয়েগো ম্যারাডোনা পাড়ি জমিয়েছেন অদেখা স্বর্গের পথে। দুজনের মধ্যে খুব যে ভালো সম্পর্ক ছিল, এমনটা নয় বরং একটা সময়ে মেসির মধ্যে নেতৃত্বগুণ নেই বলে সমালোচনাও করেছিলেন আর্জেন্টাইন ফুটবল ঈশ্বর। আর্জেন্টিনা সমর্থকদের আশা, বিশ্বকাপ জিতে ম্যারাডোনাকে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেবেন মেসি।

ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনালের আগে নিজের ভাষণে মেসিই বলেছিলেন, ‘কোনো কিছু কারণ ছাড়া হয় না।’ প্রথা ভেঙে কাতারের জুন-জুলাইয়ের বদলে নভেম্বরে বিশ্বকাপ আয়োজন, আর এই নভেম্বরেই ম্যারাডোনার অন্তিম যাত্রা। সেই নভেম্বরেই কি অমরত্বের পথে হাঁটবেন মেসিও।