তিতের শেষটা হোক মিঠে

বাংলায় তিতে শব্দের মানেটা অপছন্দের স্বাদ হলেও পর্তুগিজে শব্দটার অর্থ হচ্ছে আঁটসাঁট। এদেনর লিওনার্দো বাচ্চির পিতৃপ্রদত্ত নামটা বদলে ‘তিতে’ করে দিয়েছিলেন তার গুরু লুই ফেলিপে স্কোলারি। ব্রাজিলের কোচ পিতৃপ্রদত্ত নামের চেয়ে গুরুর দেওয়া নামেই বেশি বিখ্যাত, আর কীর্তিতে স্কোলারির পাশে বসার এটাই শেষ সুযোগ তিতের। কারণ, বিশ্বকাপ শেষে যে কোচিং পেশাই ছেড়ে দেবেন ৬১ বছর বয়সী তিতে।

বছর ছয়েক ধরেই সেলেসাওদের দায়িত্বে তিতে। ২০১৬ সালের ২০ জুন দায়িত্ব নিয়েছিলেন করিন্থিয়ানসের সাবেক কোচ। কোপা আমেরিকার শতবর্ষ আসরে গ্রুপ পর্ব থেকে ব্রাজিলের বিদায়ের পর ব্রাজিলের ফুটবল ফেডারেশন ছাঁটাই করে দুঙ্গাকে। বিশ্বের সফলতম জাতীয় দলের কোচের দায়িত্ব দেওয়া হয় তিতেকে, যে নামটা তখন ছিল অনেকটা অজানাই। কারণ ইউরোপের বড় কোনো দলে কখনো কোচিং করাননি তিতে, একই ভূমিকায় দায়িত্ব পালন করেননি অন্য কোনো জাতীয় দলেও। খেলোয়াড় হিসেবেও খুব বড় কোনো সাফল্য নেই, হাঁটুর চোটে মাত্র ২৭ বছর বয়সেই খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি।

দুঙ্গার সময়ে ব্রাজিল যে কুৎসিত ফুটবল খেলার কুখ্যাতি কুড়িয়েছিল, সেই দুর্দশা অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছেন তিতে। রাশিয়া বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচ দিয়ে শুরু হয়েছিল তিতের ব্রাজিলের, সেবার সবার আগে বিশ্বকাপে খেলা নিশ্চিত করে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নরা। যদিও বিশ্বকাপে তারা কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে যায় বেলজিয়ামের কাছে। এমন ফল হলে সাধারণত কোচের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ বাড়ায় না ব্রাজিলের মতো দল; তবে তিতে থেকে গেছেন, কারণ তার আমলে দলে ছিল উন্নতির ছাপ। পরের বছর কোপা আমেরিকা জয়, ২০২২ বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে ১৭ ম্যাচের ১৪টিতেই জিতে এবং কোনো ম্যাচ না হেরে কাতারের টিকিট নিশ্চিত করার কৃতিত্ব তিতের প্রাপ্য। সেই সঙ্গে গোটা দলটাকেও বাঁধতে পেরেছেন এক সুরে। তাই তো ব্রাজিলের ফুটবলাররাও চাইছেন বিদায়ী উপহার হিসেবেই তিতের হাতে বিশ্বকাপটা তুলে দিতে।

ব্রাজিলের মাঝমাঠের খেলোয়াড় ফ্রেদ জানিয়েছেন কেন তিনি তিতের কাছে কৃতজ্ঞ, ‘তিতে দারুণ একজন কোচ। আমরা সবাই জানি তার সামর্থ্য কতখানি। তার সঙ্গে কাজ করতে পেরে আর অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করতে পেরে আমি নিজেকে খুবই সম্মানিত মনে করছি। তার প্রতি আমার অনেক শ্রদ্ধা শুধু এই জন্য নয় যে, তিনি আমাকে খুঁজে বের করেছেন, যদিও আমি এজন্য তার কাছে খুবই কৃতজ্ঞ। তাকে আমি শ্রদ্ধা করি তার ব্যক্তিত্বের জন্য’ ফিফা ডটকমকে জানিয়েছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে খেলা এই মিডফিল্ডার।

নিউক্যাসলে খেলা ব্রুনো গুইমারেসও জানিয়েছেন কেন তিতেকে পছন্দ, ‘তার সঙ্গে আমার একটা ছবি ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়ে যায়। তখন আমি সাও পাওলোর ছোট একটা ক্লাবের যুব দলে খেলি, আর তিতে তখন করিন্থিয়ানসের হয়ে অনেক কিছু জিতে চলেছেন। তখন তার সঙ্গে একটা ছবি তুলতে চেয়েছিলাম। এতেই বোঝা যায় মানুষ হিসেবে এবং কোচ হিসেবে তাকে আমি কতটা শ্রদ্ধা করি। উনি খুবই বুদ্ধিমান, তার ট্যাকটিক্যাল জ্ঞান এবং দূরদৃষ্টি খুবই ভালো। আমি ইউরোপে যেসব কোচের সঙ্গে কাজ করেছি, তাদের চেয়ে তিতের এইসব জ্ঞান অনেক ভালো।’

বার্সেলোনায় খেলা রাফিনহাও তিতেকে ধন্যবাদ দিয়েছেন জাতীয় দলে প্রথমবার ডাকার জন্য, ‘প্রথমেই আমি তাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই প্রথম কোচ হিসেবে আমাকে জাতীয় দলে ডাকার জন্য এবং কাতারে বিশ্বকাপ খেলতে নিয়ে আসার জন্য। উনি না থাকলে আজ আমি এখানে থাকতাম না। উনি আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ শুধু এই জন্যই নয় যে, যখন আমি ব্রাজিল দলে খেলি তখন উনি যা শেখান, উনার গুরুত্ব এজন্যও অনেক বেশি, কারণ উনার শিক্ষাটা আমি ক্লাবেও কাজে লাগাতে পারি।’

টটেনহ্যামে খেলা ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড রিচার্লিসনের কাছে তিতে বাবার মতো, ‘তিতে আমার কাছে বাবার মতো। উনি সবসময় আমাদেরকে আগলে রাখেন আর জাতীয় দলের ভেতর উষ্ণ আন্তরিক পরিবেশ তৈরি করে রাখেন। তিতে হচ্ছেন এমন একজন, যে প্রশংসা করতে কুণ্ঠাবোধ করেন না আবার একই সঙ্গে কড়া সত্য কথাটাও প্রকাশ করেন। তার কাছ থেকে আমরা অনেক কিছু শিখেছি। আমরা তার দীক্ষায় সাহসী, চৌকস আর ট্যাকটিক্যালি অনেক শৃংখলাবদ্ধ হতে শিখেছি। আমরা ব্যাপারটা মেনে নেই কিংবা না নেই, এটাই তার শেষ বিশ্বকাপ। তিতে যেন হাসিমুখে বিশ্বকাপ শেষে বিদায় নিতে পারেন সেজন্য আমাদের যা যা করা দরকার তার সবই করব।’

তিতে নিজে অবশ্য কাপ জিতেই শেষ করতে হবে, এমন কোনো ধনুর্ভঙ্গ পণ করেননি। জানিয়েছেন, বিশ্বকাপটা শান্তি নিয়েই শেষ করতে চান ‘আমরা জিতি কিংবা না জিতি, আমি শান্তি নিয়ে বিশ্বকাপ শেষ করতে চাই। এটাই আমার ইচ্ছা। অনেক কিছু হবে যেসব আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আমি আমার সেরা কাজটা করতে চাই আর মনের শান্তি পেতে চাই। আমি নিশ্চিত সেটা আমি করতে পারব।’