ব্যাংকের বেসরকারি খাতের ঋণ এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায়। স্বল্প পরিচিত কিংবা নতুন গ্রাহককে বিভিন্ন ব্যাংকের আগ্রাসী ঋণ বিতরণের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে খাতটির সুশাসন। তবে ঋণ বিতরণে বিতর্ক থাকলেও দেশের বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান নিয়ামক হচ্ছে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ। এ খাতের ঋণের তথ্য থেকেই কর্মসংস্থান, রপ্তানিসহ দেশের অর্থনীতির নানা সূচকের পূর্বাভাস মেলে। করোনা-পরবর্তী ধকল কাটিয়ে আবারও স্বাভাবিক ধারায় ফিরেছে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ। এক বছরে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ দশমিক ৯১ শতাংশ।
যদিও লোডশেডিং, জ¦ালানি ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্র কিছুটা সংকুচিত হওয়ার কথা। হয়েছেও তাই। সেপ্টেম্বরের তুলনায় বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি সামান্য কমেছে। তবে অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও এ খাতে প্রবৃদ্ধি আশানুরূপ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, অক্টোবর শেষে দেশে বেসরকারি খাতের ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ৮৯ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা, যা আগের বছর একই সময় এ ঋণের পরিমাণ ছিল ১২ লাখ ১৯ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা। বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬১১ কোটি টাকা।
এদিকে গত সেপ্টেম্বরে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। সে হিসাবে আগের মাসের চেয়ে অক্টোবরে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমেছে। গত সেপ্টেম্বরে দেশের বেসরকারি ঋণের স্থিতি ছিল ১৩ লাখ ৭৯ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা। এক মাসের ব্যবধানে বেসরকারি ঋণ বেড়েছে ৯ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশ ব্যাংকের করা প্রাক্কলনের চেয়েও কম। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। এর আগের অর্থবছর ২০২১-২২-এ প্রাক্কলন করেছিল ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। যদিও প্রাক্কলিত হারের চেয়ে তা ছিল অনেক কম।
জানা যায়, চলতি বছর জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ছাড়িয়েছিল ১১ শতাংশ। পরের মাসে ফেব্রুয়ারিতে খাতটিতে প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৭২ শতাংশে। এরপর মার্চে সামান্য বেড়ে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ২৯ শতাংশে। পরের দুই মাস বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়ে। জুলাই মাসে হয় ১৩ দশমিক ৯৫ শতাংশে এবং আগস্টে ১৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। কিন্তু সেপ্টেম্বর থেকে প্রবৃদ্ধি আবারও কমা শুরু করেছে। গত সেপ্টেম্বরে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ আর অক্টোবরে তা দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৯১ শতাংশ।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, অর্থবছরের প্রথম দিকে নতুন শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতি বা ক্যাপিটাল মেশিনারি, শিল্পের কাঁচামালসহ এ খাতের সব আমদানি বেড়েছিল। সে কারণেই বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে। নানা পদক্ষেপের কারণে এখন আমদানি ব্যয় কমে আসছে। সে কারণে হয়তো কিছুটা কমেছে। কিন্তু এ প্রবৃদ্ধি হতাশাজনক নয়।
এদিকে আর্থিক সংকটের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। এসবের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে, ডলার সংকট বেশ ভোগাচ্ছে বাংলাদেশকে। এ সংকট সমাধানে সরকার রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ করছে। এতে রিজার্ভের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বর্তমানে দেশের রিজার্ভের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক শূন্য ৫ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মানদ-ে হিসাব করলে রিজার্ভের পরিমাণ আরও কমে দাঁড়াবে ২৫ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারে।