দোহার আনাচে কানাচে ফের শুরু হয়ে গেছে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কোলাহল। ঠিক যেমনটি ছিল সৌদি আরবের ম্যাচের আগে। বিশ্বকাপ অভিযান শুরুর আগে দোহাকে মনে হচ্ছিল আর্জেন্টিনারই কোনো শহর। অথচ সৌদির কাছে অঘটনের পর পাল্টে যায় চিত্র। আকাশি-সাদাদের কলকাকলি থেমে গিয়েছিল। হারের বেদনা ও বাদ পড়ার শঙ্কা নিয়ে আর্জেন্টাইনরা ঘুরে বেড়াতেন ইতিউতি এবং বড্ড নীরবে। সেই শঙ্কা কেটে যায় লিওনেল মেসির জাদুতে। মেক্সিকোকে হারিয়ে ফের যেন প্রাণ ফিরে পায় আর্জেন্টিনা। প্রথম দিনটা ‘স্রেফ একটা বাজে দিন’ ধরে নিয়ে আর্জেন্টাইনদের চোখেমুখে এখন আত্মবিশ্বাসের ছটা। সমর্থকদের অগাধ বিশ্বাসটাই যেন ভীষণ চাপে ফেলে দিচ্ছে মেসির আর্জেন্টিনাকে। তৃতীয় বিশ্বকাপে চোখ রেখে অভিযানে নামাদের আজ আবারও দিতে হবে অগ্নিপরীক্ষা। পোল্যান্ডকে হারালে শেষ ষোলো যেমন নিশ্চিত হবে, গ্রুপসেরা হয়ে এড়ানো যাবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে। চাপ আছে লেভানডফস্কির পোল্যান্ডেরও। এক পয়েন্ট পেলে ৩৬ বছর পর তাদের নাম উঠবে শেষ ষোলোতে। স্টেডিয়াম ৯৭৪-ও প্রস্তুত মেসি-লেভাদের মহারণ মঞ্চায়নে।
যে মাঠে দু’দিন আগেই শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে চিরবৈরী ব্রাজিল, সেই মাঠেই জয়ের পতাকা উড়িয়ে আর্জেন্টিনাকে পা রাখতে হবে পরের ধাপে। আবার এই মাঠটাই আজ হয়ে উঠতে পারে খুদে জাদুকর মেসির বিদায় মঞ্চ! বিখ্যাত ফুটবল ম্যাগাজিন ফোর ফোর টু’র জরিপে শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড় তিনি। তারপরও এই জরিপটাকে তর্কের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে, পেলে-ম্যারাডোনার পাশে বসতে বিশ্বকাপটা জিততে হবে। গত দেড় দশক যার জাদুতে বুঁদ হয়ে আছে গোটা বিশ্ব, ফুটবলকে অনিন্দ্যসুন্দর রূপ দেওয়া সেই মহাতারকাকে এবার মহাকালের ফিরিয়ে দেওয়ার পালা। ভাগ্য নিশ্চয় অতটা নিষ্ঠুর হবে না।
তবে মেসির প্রতি পোলিশদের সদয় হওয়ার সুযোগ নেই। তাদেরও যে অনেক কিছু পাওয়ার বাকি। মধ্য ইউরোপের দেশটির আছে এক সমৃদ্ধ ফুটবল অতীত। ১৯৭৪ ও ১৯৮২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট তারা। এরপর থেকে অবশ্য বিশ্বকাপের মঞ্চে বড্ড অনিয়মিত। টানা দুটি বিশ্বকাপে দর্শক থাকার পর চার বছর আগে রাশিয়ায় ফেরাটা মনে রাখার মতো হয়নি। বিদায় নিতে হয়েছিল গ্রুপ পর্ব থেকে। এবার তাদের পরের ধাপে যাওয়ার সম্ভাব্য যথেষ্ট। আর্জেন্টিনার কাছ থেকে পয়েন্ট পেলেই পূরণ হবে প্রথম লক্ষ্য।
সি গ্রুপ এখন পুরোটাই উন্মুক্ত। চার দলেরই সুযোগ আছে শেষ ষোলোতে যাওয়ার। জটিল হিসাব এড়াতে হলে আর্জেন্টিনাকে জিততে হবে। কাক্সিক্ষত জয় না পেলে, ম্যাচটা ড্র হলে, মেসিদের ভাগ্য জুড়ে যাবে লুসাইল স্টেডিয়ামে একই সময় শুরু হওয়া সৌদি আরব-মেক্সিকো ম্যাচের ফলে। পোল্যান্ডের ড্র হলেই চলবে। তবে ৪ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপের শীর্ষে থাকারাও জয় দিয়ে চাইবে ফরাসিদের এড়াতে। ৩ পয়েন্ট করে আছে আর্জেন্টিনা ও সৌদি আরবের। তবে গোল গড়ে এগিয়ে থাকায় দু’বারের শিরোপাজয়ী আর্জেন্টিনা আছে সুবিধাজনক স্থানে। এক পয়েন্ট নিয়ে মেক্সিকোরও আশা বেঁচে আছে।
আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি অবশ্য এসব মারপ্যাচে পড়তে চান না। শেষ ষোলোর প্রতিপক্ষ নিয়েও তার ভাবনা নেই। তার ভাবনায় শুধুই জয়, ‘সবার আগে আমাদের জিতে শেষ ষোলোতে যেতে হবে। তারপর দেখব প্রতিপক্ষ হিসেবে সেখানে কাকে পাই। এখন কেউই বলতে পারে না কার ভাগ্যে কী আছে।’ কাল রাতে শেষ ট্রেনিং সেশনে স্কালোনি চূড়ান্ত করেছেন পোল্যান্ডের বিপক্ষে শুরুর একাদশ। তাই সংবাদ সম্মেলনে একাদশ নিয়ে সেভাবে কোনো ধারণা দেননি। তবে শোনা যাচ্ছে মেক্সিকোর বিপক্ষে দ্বিতীয় গোল করা এনজো মার্তিনেজকে বদলি হিসেবেই বেশি পছন্দ স্কালোনির, ‘এই ম্যাচে অনেক বেশি বৈচিত্র্য আনার সুযোগ নেই। মেক্সিকোর বিপক্ষে আমরা প্রতিটি বিভাগেই ভালো করেছি। এই দলের প্রত্যেকের কাছেই প্রতিটা ম্যাচ সমান গুরুত্বপূর্ণ। মেক্সিকোর বিপক্ষে জয়টা খুব প্রয়োজন ছিল। এখন আমরা আরেকটি জয়ে পরের ধাপে যাওয়ার অপেক্ষায়।’
সৌদি আরবকে হারিয়ে ও মেক্সিকোর সঙ্গে ড্র করে পোল্যান্ডও আছে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে। দলটির আক্রমণভাগের প্রাণভোমরা লেভানডফস্কি শেষ দুই ম্যাচে গোল করেছেন, করিয়েছেনও। তাকে রুখতে তাই বড় পরীক্ষা দিতে হবে আর্জেন্টাইন রক্ষণকে। সে প্রস্তুতি নেওয়া আছে দাবি করেছেন লিসান্দ্রো মার্তিনেজ। আর্জেন্টিনার এই ডিফেন্ডার মনে করেন, হাসিমুখেই এই ম্যাচটা শেষ করবে তার দল। মেসিকে রুখতে পোল্যান্ড কোচ জেসল মিচিনিউইজ চাইছেন রক্ষণ আঁটসাঁট রাখতে, সেভাবেই লেভার ক্যারিশমায় দল গোল পাক সেটাই থাকবে তার প্রত্যাশা।
লেভানডফস্কির এখনকার ঠিকানা ধুঁকতে থাকা বার্সেলোনা। যে দলটা একটা সময় সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছিল মেসির ছোঁয়ায়। সবার প্রশ্ন বার্সার সাবেক ও বর্তমানের লড়াইয়ে কে জিতবে? এ যে দুজনেরই শেষ বিশ্বকাপ। লেভা জিতলে হৃদয় ভাঙবে মেসির কোটি ভক্তের। আর মেসির জয়ে শেষটা বিবর্ণ হয়ে যেতে পারে পোলিশ রাজপুত্রের।
সেটা মেসির জন্য হোক, কিংবা লেভা; স্টেডিয়াম ৯৭৪-এ আজ বিদায়ী বিউগলটা না বেজে উঠলেই মঙ্গল।