সৃজনশীলতায় আল্টিমেট বলে কোনো কথা নেই

আজ মঞ্চ, টিভি ও চলচ্চিত্রের নন্দিত অভিনেত্রী এবং সংসদ সদস্য সুবর্ণা মুস্তাফার ৬৩তম জন্মদিন। সুদীর্ঘ অভিনয় ক্যারিয়ারে অজস্র ভক্তের হৃদয় জয় করা এই তারকা পেয়েছেন একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও একুশে পদক। মঞ্চের প্রতি ভালোবাসা আজও একই রকম। তাইতো উপলক্ষ পেলেই ছোটেন মঞ্চে। ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে সম্মত হন এমন চরিত্র পেলে, যেখানে নিজেকে নতুনভাবে সৃষ্টি করা যায়। সংসদে শিল্পীদের কণ্ঠস্বর তিনি। জীবন্ত এই কিংবদন্তি শিল্পীর সঙ্গে কথা বলেছেন মাসিদ রণ

জন্মদিন এলে মনের ভেতর কী ধরনের বাতাবরণ তৈরি হয়?

জন্মদিন তো জন্মদিনই। আমি আসলে জন্মদিন নিয়ে অত বেশি ভাবিই না। এটা একটা তারিখ মাত্র, যেদিন আমি জন্মেছি। এখন পর্যন্ত কাজ করে যেতে পারছি এটাই বড় বিষয়। এ বয়সে নিজের জন্য কোনো ভাবনা থাকে না। প্রিয়জনরা যেন সুস্থ সুন্দর থাকে, আমি যে কাজগুলো করছি তা যেন ঠিকমতো করতে পারি। 

তবে জন্মদিনে আমার ভক্তরা শুভেচ্ছা পাঠায়, তারাই আমার জন্মদিনকে স্পেশাল করে। তাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা। সামনের বছরটা যেন সুন্দর যায় সেই প্রত্যাশা থাকে।

সুদীর্ঘ পথ অভিনয়ের মাধ্যমে পাড়ি দিয়েছেন। তার বাইরে রয়েছে ব্যক্তিজীবন। জীবনে এই পর্যায়ে এসে কীভাবে দেখেন?

আমার আসলে ব্যক্তি আর অভিনয়জীবন অনেক আগেই মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। কারণ বন্ধুবান্ধব প্রায় সবাই এই জগতেরই মানুষ। তবে হ্যাঁ, এখন আমি যে কাজটির সঙ্গে সম্পৃক্ত, সংসদ সদস্য, সেই কাজটি অতীতের চেয়ে আলাদা ধরনের। এখানে দায়িত্ব অন্যরকম, কাজের পরিবেশ, প্রেক্ষাপটই অন্যরকম। আর অভিনয়ের কথা যদি বলেন, তাহলে তো সারাক্ষণ কোনো না কোনোভাবে সৃষ্টির মধ্যে থাকা হয়।

সংসদ সদস্যের জীবন কতটা উপভোগ করছেন?

এক্ষেত্রে উপভোগ কথাটা হয়তো ঠিক হবে না। তবে এটা বলতে পারি, এই কাজটি করতে পেরে আমি অনেক আনন্দিত ও সম্মানিত। আসলে সংসদ সদস্য বিষয়টি তো একটা পদবি। কিন্তু দেশকে ভালোবাসা, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে থাকা, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে শ্রদ্ধা করা, যে কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রাবস্থাতেই সম্পৃক্ত হওয়া- এগুলো তো সবসময় ছিল। সুতরাং সংসদে গিয়ে এই যে কথা বলছি, সেটা এমন নয় যে আমাকে খুব বিস্মিত করে দিচ্ছে। কারণ দেশপ্রেমটা ভেতরে আছে বলেই সেই কথাগুলো আমি বলি। এ কারণেই হয়তো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে সংসদের সংরক্ষিত আসনের জন্য যোগ্য মনে করেছেন। এজন্য আমি তার প্রতি ঋণী।

সমালোচনা হতে পারে, তারকা হওয়ার সুবাদে আপনি মাঠ পর্যায়ের রাজনীতি না করেই সংসদ সদস্য হয়েছেন...

আমার চার বছরের সংসদ সদস্য জীবনে আপনি যেটা বলছেন তা একেবারেই নয়। সংসদে আমার সহকর্মীরা আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করেন। সংরক্ষিত আসনের যে সব সদস্যের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করি, তাদের সঙ্গেও আমার অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক। উনারা বরং আমাকে বলেন, শিল্পীদের এখানে রিপ্রেজেন্ট করার জন্য আমি সবচেয়ে যোগ্য মানুষ। সংসদ আসলে কাজের জায়গা, এখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ে সবাই ভীষণ ব্যস্ত থাকেন। সুতরাং সংসদে এসব নিয়ে কথা বলার সুযোগও নেই। বাইরের লোক এসব কথা বলে থাকতে পারেন।

টিভি নাটকের কথা যদি বলি, আপনি এ যাবৎকালের সেরা অভিনেত্রী। ভক্তরা এমন ভাবতেই পারে। আপনি যেভাবে মেধা ও জনপ্রিয়তার মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন, আপনার কাছে কি মনে হয় সে তুলনায় নিজেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে মেলে ধরতে পেরেছেন বা সেই সুযোগ আপনি পেয়েছেন?

সৃজনশীলতায় আল্টিমেট বলে কোনো কথা নেই। আমরা সততই অতীতের দিকে তাকিয়ে একটু ইমোশনাল হয়ে যাই। কিন্তু একজন সৃজনশীল মানুষ সব সময়কেই কার্যকর করতে পারেন। তিনি সব পরিস্থিতিতেই নিজেকে ভেঙে আবার নতুন করে কিছু সৃষ্টি করতে পছন্দ করেন। আমি প্রথম নাটকের স্ক্রিপ্ট নিয়ে যতটা এক্সাইটেড ছিলাম, এখনো কোনো নতুন নাটকের ভালো স্ক্রিপ্ট পেলে ততটাই এক্সাইটেড থাকি। এখনো প্রিপারেশন আগের মতোই থাকে। এখনো সংলাপ মুখস্থ করি, কস্টিউম নিয়ে ভাবি, কোন পোশাকের পর কোন পোশাক পরতে হবে- সব বিষয়ে আমি খুব সিরিয়াস। মোটকথা প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত কাজটিকে ঠিকমতো করার চেষ্টা করেছি। আমার ধারণা শিল্পকর্মের যে কোনো ক্ষেত্রেই নিজের কাজটা ঠিকমতো করলে, সাধনাটা ঠিকমতো করে গেলে, নিজের অবস্থান ধরে রাখা যায়। আমি শুরু করেছিলাম অনেক অল্প বয়সে। এখন যে বয়স, তাতে এখনো যদি ঠিক আগের মতো করেই ভাবতে চাই, জীবনযাপন করতে চাই, আগের মতো চরিত্রই করতে চাই তাহলে তো সেটা খুবই হাস্যকর বিষয় হবে। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, এজিং গ্রেসফুলি। মানে তুমি খুব উদার হৃদয়ে নিজের বয়সকে মেনে নাও। এবং সেই বয়স অনুযায়ী নিজেকে প্রকাশ করো। আমার মনে হয় এই ভাবনার সঞ্চার হওয়াটাও একটা সৃজনশীল প্রক্রিয়ার অংশ। দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছি সেটা তো অবশ্যই সৌভাগ্য। সেটা আমাকে ঋণী করে।

আপনার কথায় প্রকাশ পেল, ক্যারিয়ার নিয়ে কোনো অতৃপ্তি নেই?

অতৃপ্ত কেন হব? আমি তো সেই কাজটি করেই এখন পর্যন্ত জীবিকা নির্বাহ করতে পেরেছি, যেটি করতে সবচেয়ে ভালোবাসি। অভিনয়ের প্রেমে পড়েই তো সেই ছোটবেলা থেকে কাজ শুরু করি। অনেক মানুষ আছেন পৃথিবীতে, বাংলাদেশেও আছেন, যারা হয়তো জীবিকার জন্য একটা পেশায় নিয়োজিত, কিন্তু তারা মন থেকে সেই কাজটি করতে পছন্দ করেন না। আমি বিশ^াস করি, তাদের মধ্যেই অনেক গুণী সংগীতশিল্পী, অভিনেতা, চিত্রশিল্পী রয়ে গেছেন। কিন্তু সেই মেধা প্রকাশের কোনো সুযোগ পাননি। তাই আমি সারা জীবন কৃতজ্ঞ থেকেছি। তৃপ্ত হতে গেলে অনেক কিছুর দরকার হয় না তো। চাইতে তো আমি অনেক কিছুই পারি। কিন্তু সব চাওয়া কি লজিক্যাল? সবকিছু একসঙ্গে চাইলে তো হবে না। নিজের ক্ষমতা, মেধা, অবস্থান এগুলো বুঝতে হয়। বাবা (কিংবদন্তি অভিনেতা গোলাম মুস্তাফা) খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বলতেন, ‘মানুষ সব সময় শুধু সঠিক কাজ করবে না। ভুল করারও অধিকার আছে। একটা মানুষ তার ভুল থেকে শেখে। কোনো অভিজ্ঞতাই দিনশেষে খারাপ হয় না। তোমার যদি বুদ্ধি থাকে তবে খারাপ অভিজ্ঞতা থেকেও ইতিবাচক কিছু শিখতে পারো।’ সবকিছু তো মনমতো হবে না। ওটা গ্রহণ করাটাও এক ধরনের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া।

আপনি মঞ্চে কাজ করেছেন। টিভিতে বিস্তার সবচেয়ে বেশি। বেশ কিছু বাণিজ্যিক ঘরানার ছবিতেও সফল। কিন্তু সেভাবে সিনেমায় কেন পাওয়া যায়নি?

সিনেমা একটি বড় মাধ্যম। একটি দেশের চলচ্চিত্র সেই দেশকে রিপ্রেজেন্ট করে। আমরা চলচ্চিত্রের খুবই ভালো সময় পার করে এসেছি। তবে মাঝখানে একটা সময় ভালো ছবি হয়নি। সেজন্যই যে দূরে সরে গেছি তাও নয়। যদিও আমার সিনেমায় নিয়মিত হওয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা আছে। আমি আর্ট ফিল্ম করেছি আবার কমার্শিয়াল সিনেমাও করেছি। দুই জায়গাতেই আমি সমানভাবে সফল। তবে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, সিনেমা অনেক সময়সাপেক্ষ কাজ। আমি বাবাকে দেখেছি, হুমায়ুন ফরীদিকেও দেখেছি, অক্লান্ত পরিশ্রম করে সিনেমা করেছেন। এর ফলে ব্যক্তিজীবন থেকে একদম বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল। আই ডিড নট ওয়ান্ট টু দ্যাট। আমি অত প্রেশার নিতে চাইনি। এটা একদম সত্যি কথা। তাছাড়া সবাই তো গোলাম মুস্তাফা হতে পারবে না, যিনি রাত দুইটা পর্যন্ত শ্যুটিং করে এসে বই নিয়ে বসতেন। আমার একটু পড়তে হয়, বন্ধুদের  সঙ্গে একটু আড্ডা মারতে হয়, আর গান তো আমার জীবনের অংশ। যদিও গলায় একটুও সুর নেই, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ (হা হা)।

এক সাক্ষাৎকারে উপস্থাপক মনে করিয়ে দিলেন, আপনি সিনেমায় সেই সময়ে যে ধরনের আধুনিক ও স্মার্ট পোশাক, সাজসজ্জা নিয়ে এসেছিলেন। আপনি মজা করে বলেছিলেন, ‘পরে সেটা আপডেট না হয়ে আরও ব্যাকডেটেড হয়ে গেল কেন।’ পুরো সিনেমার মানই তো নেমে গেল। কারণ হিসেবে আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে?

এ বিষয়ে আমার মতামতের সঙ্গে অনেকেই হয়তো একমত হবেন না। কিন্তু আমি সত্যি বিশ^াস করি, যে কোনো জিনিস উন্নত হয় প্রতিযোগিতা থাকলে। আমাদের এখানে তো এখন হলিউডের কিছু সিনেমা সিনেপ্লেক্সে আসছে। কিন্তু তখন সেটা সম্ভব ছিল না। আমাদের পাশের দেশ ভারতের বাংলা ছবির ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু একটা ইয়েস বলেছিলেন যে আমাদের দেশে আসতে পারে। কিন্তু যেটা হলো অবশেষে, সেটা হলো- ইংরেজি ছবি এলো না, ভারতের ভালো ছবি এলো না, এলো হচ্ছে হংকংয়ের অত্যন্ত বিচ্ছিরি তৃতীয় শ্রেণির সিনেমা। সেগুলোকে আমাদের নির্মাতারা কপি করা শুরু করল। দর্শক তখন ফাইটিং কিংবা কাটপিস দেখছিল। সেই থেকেই বাংলাদেশের সিনেমায় অশ্লীলতার শুরু। কিন্তু দর্শককে বোকা ভাবা ঠিক নয়। যখন দর্শকের গালাগালি, কাটপিস দেখা শেষ তারপর কী? একই জিনিস আর কতবার দেখবে। দর্শক জাস্ট সেগুলো রিজেক্ট করল। হলের পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেল। সিনেমার ব্যবসা মন্দা হয়ে গেল। একে একে সিনেমা হল বন্ধ হতে থাকল। একটি দেশের সিনেমার ব্যবসায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে নারী দর্শক। তখন আমাদের নারীরা হলে যাওয়া বন্ধ করল। মধ্যবিত্তরা হলবিমুখ হলো। এক সময় কত সিনেমা হল ছিল আমাদের। আর এখন? সিঙ্গেল স্ক্রিন যা আছে, তাতে মনে হয় সাবান পানি নিয়ে স্ক্রিনটা ধুয়ে দিয়ে আসি। তবে এখন একটা ভালো বিষয় হচ্ছে- মাল্টিপ্লেক্স তৈরি হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সিনেমার ব্যাপারে খুবই আগ্রহী। কারণ তার বাবার হাত ধরেই এদেশের এফডিসি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সব মিলিয়ে এখন আবার সিনেমা নিয়ে আমি আশাবাদী হয়ে উঠছি। আমি যদি সবচেয়ে সফল ছবিগুলোর কথা বলি, তাহলে দেখবেন প্রায় সবই আমাদের নাটক থেকে আসা ছেলেমেয়েরা বানাচ্ছেন। মনপুরা, আয়নাবাজী, দেবী, গহীন বালুচর, সম্প্রতি হাওয়াসবই নাটকের নির্মাতারা বানিয়েছেন। এখন আর দর্শক ছবিতে গল্প নেই, অভিনয় ভালো নয়, অশ্লীলতা, গালিগালি দেখতে চায় না। কারণ আকাশ উন্মুক্ত হয়ে গেছে। দেখার অনেক কিছু আছে এখন। এখন দর্শক কোয়ালিটি জিনিসই দেখবে।

বলিউডে অমিতাভ বচ্চন নতুন প্রজন্মের কাজ পছন্দ হলে তার বাড়িতে হাতে লেখা চিঠি ও ফুল পাঠান। তা শিল্পীরা অ্যাওয়ার্ডের চেয়ে বেশি মনে করেন। আপনি ভীষণ ব্যস্ত একজন মানুষ। তারপরও জনসম্মুখে নতুনদের প্রশংসা করেন...

এখন ফেইসবুক এসেছে বলে মানুষ তা জানতে পারছে। যখন ফেইসবুক ছিল না তখনও আমি এটা করতাম। আমি বিশ্বাস করি, এক জায়গায় আটকে থেকে তো লাভ নেই। ইন্ডাস্ট্রিকে সামনে এগিয়ে নিতে গেলে নতুন ছেলেমেয়েকেই এগিয়ে আসতে হবে। এদেরই নতুন আইডিয়া আসবে মাথায়, তাতে হাওয়ার মতো আরও নতুন ছবি তৈরি হবে। ‘কারাগার’ দেখেই আমার মনে হয়েছে আই রিয়েলি ওয়ান্ট টু মিট দ্য ডিরেক্টর। আমি নির্মাতা সৈয়দ সাওকীকে বলেছি, কীভাবে এটা চিন্তা করলে! এগুলো যদি আমি অ্যাপ্রিশিয়েটই না করতে পারি, তাহলে মুখে মুখে বলে বেড়ালাম আমি খুব কালচারড, আমি এদেশের শিল্প সংস্কৃতি নিয়ে চিন্তিত সেটা তো খুবই হিপোক্রেসি। আমি এখন ভুলের দিকে অত নজরও দিই না। মানুষ করতে করতে শেখে। একটা ছবি হয়তো আমার ভালো লাগল না, কিন্তু আমার দায়িত্বের জায়গা হলো মনে রাখা যে এই ছবিটার পেছনে কতগুলো লোক মেধা, শ্রম ব্যয় করেছে। ফলে ভুলটাকে বড় করে দেখার সুযোগ নেই। এখন আমাদের সেই পরিস্থিতিই তৈরি হয়নি। এখন শুধুই পজিটিভিটি ছড়িয়ে দিতে হবে। বরং কিছু নিয়ে যদি লেখালেখি করতেই হয়, সেটা হবে সিঙ্গেল স্ক্রিনের আধুনিকায়ন কেন হয় না সেটা নিয়ে। বলাকা এত পুরনো একটা হল, এত ভালো একটা জায়গায় তার অবস্থান, তাদের উচিত না হলটাকে ঠিক করা? তারা যদি হলটাকে ঠিক করে, তারা ব্যবসা করে শেষ করতে পারবে না। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ সবকিছুর মাঝখানেই তো বলাকা।

ইন্টারন্যাশনাল তারকা হওয়ার সব যোগ্যতা আপনার ছিল। এখন জয়া আহসান সেটি করতে পেরেছেন। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে সেটা হলো না কেন? এটাও কি এমন যে, নিজেকে সময় দেওয়ার জন্য আপনি আগ্রহী হননি।

নো নো, ইটস নট লাইক দ্যাট। এটা আসলে সময়ের ব্যাপার। এটা কি সময়ের ব্যাপার নয়? আমি আমার দেশে কাজ করে এদেশের মানুষের কাছে পরিচিত। তবে এখন বাংলাদেশিরা তো শুধু বাংলাদেশে থাকে না। বিশে^র যেখানেই বাঙালি আছেন, তারা আমার কাজ দেখে। এখন ইউটিউবের কল্যাণে তো আমরা সর্বত্র পৌঁছে গেছি। প্রথমে ফেরদৌসী মজুমদারের কথা বলতে চাই। উনাকে দেখেই তো অভিনয়ে আসা আমার। উনি কাজ করেছেন, এরপর আমি কাজ করেছি, কাজ করেছে শম্পা রেজা, মিতা রহমান, এখনো চিত্রলেখা গুহ, ওয়াহিদা মল্লিক জলি কাজ করছে। হ্যাঁ, জয়া আহসান ইন্টারন্যাশনালি বাংলাদেশি শিল্পীদের জন্য একটা বড় জায়গা তৈরি করে দিয়েছে। এজন্য তার কাছে অন্যদের কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। জয়া ইজ অ্যানাদার পার্সন, যে অসম্ভব হার্ডওয়ার্ক করতে পারে! বাংলাদেশকে জয়া রিপ্রেজেন্ট করে বাইরে। আসলে বাংলাদেশের যে কোনো অর্জন আমাকে সবসময় গর্বিত করে। আমাদের ইন্টারন্যাশনাল অ্যাম্বাসেডর সাকিব আল হাসান, জয়া আহসান এগুলো ডিনাই করে লাভ নেই। ফলে আমাদের সময় আমরা কী করতে পেরেছি না পেরেছি, পরের প্রজন্ম কী করছে সেটা আসলে তুলনারই বিষয় না। তারা আমাদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে কাজ করতে এসেছে। এসে তাদের সময়ে যে যে সুবিধা সেটা তারা পাচ্ছে। এটাই তো চিরন্তন।     

এখন অভিনয় খুবই কম করছেন। নাটকে কথ্য ভাষার ব্যবহার শুরুর পর থেকেই কি নিজেকে মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছিল?

আমি প্রশ্নটাকে একটু কারেকশন করি, এটা কোনো কথ্য ভাষা নয়। এটা হলো বিকৃত ভাষা। এই যে ইন্টারভিউতে আমি আর আপনি যে ভাষায় কথা বলছি, তা  হলো কথ্য ভাষা। আমরা তো করতেছি, খাইতেছি, যাইতেছি বলছি না। আমার আঞ্চলিক ভাষার নাটকে কোনো অসুবিধা নেই। আমি ময়মনসিংহ, খুলনাসহ কয়েকটি আঞ্চলিক ভাষায় কাজ করেছি। আর যে বিকৃত ভাষার কথা বলছি, একটি নাটকের একটি চরিত্র সেভাবে কথা বলতে পারে। কিন্তু সেই নাটকের মা, বাবা, ভাই, বোন, দারোয়ান, কাজের লোক, পুলিশ অফিসার, কলেজ শিক্ষক- সব চরিত্র কীভাবে একই ভাষায় কথা বলে? এটা সম্ভব নয়। যারা এই ভাষা বিকৃতিটা করল, যা করার তো করে ফেলল। কিন্তু মজার বিষয় হলো, তারা যখন ইন্টারভিউ দেয়, সেখানে আজ পর্যন্ত তাদের খাইছি, গেছি বলতে শুনিনি। তারা প্রমিত বাংলাতেই কথা বলে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এত প্রশংসিত ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ ছবিটিও সেই ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে...

আমাকে খুবই বদার করেছে। আন্তর্জাতিক প্রশংসা পেয়েছে খুবই ভালো, তাতে কিছু যায় আসে না। ওই ভাষাটা আমার খুব কানে লেগেছে। ওখানে সাবেরী আলমের ক্যারেক্টারটা ছাড়া সবাই এক ভাষায় কথা বলেছে। সেটা হতে পারে না।

জীবনের কিছু ক্ষেত্রে আমাদের সমাজের দৃষ্টিকোণ থেকে আপনি খুবই সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছেন। হুমায়ুন ফরীদি আপনার চেয়ে বয়সে বেশ বড় ছিল, আবার বদরুল আনাম সৌদ অনেক ছোট। এখন এই বিষয়টাকে ইন্টারন্যাশনালি ট্রেন্ডসেটার বলা হয়। যেমন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া-নিক জোনাস। এসব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আপনার চিন্তাধারা কী ছিল?

কেউ এগুলো ভেবে অন্তত বিয়ে করে বলে আমার মনে হয় না। আর বিয়েতে কারও বয়স কম, কারও বেশি এটা হতেই হবে। নয়তো দুজনকে একই সালে একই দিনে জন্মাতে হবে (হা হা হা)। এখানে ছোট-বড় ব্যাপার নয়। এখানে ম্যাটার করে দুজনের সম্পর্ক, মানসিক মিল-অমিলগুলো। প্রাপ্তবয়স্ক দুজন বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। বয়স নিয়ে কথা বলারও কিছু নেই আসলে। আর আমি এগুলোকে ট্রেন্ডসেটার হিসেবেও দেখি না। এটা হচ্ছে, লিসেন টু ইওর অউন হার্ট। 

অজস্র চরিত্রে নিজেকে ভেঙে-গড়ে রূপায়ণ করেছেন। এখনো কি কোনো স্বপ্নের চরিত্র বা নির্মাতা আছে, যাদের সঙ্গে কাজ করতে চান?

আমার খুব প্রিয় চরিত্র হচ্ছে সাহেব বিবি গোলামের মেজ বউ। চরিত্রটি করার সুযোগ পেলে খুব খুশি হব। আর অনেক পছন্দের নির্মাতার সবচেয়ে পছন্দের নির্মাতার সঙ্গে তো বিয়েই হয়ে গেল। বদরুল আনাম সৌদ। সে প্রচ- মেধাবী, ওহ মাই গড। তার সঙ্গে আমার আলাপই তো ডলসহাউজ নাটকের সেটে। একটা অল্প বয়সের ছেলে ৯ জন সিনিয়র শিল্পীকে সামলাচ্ছে, রিহার্সেল করাচ্ছে, শটের মাঝখানে বলছে এটা একটু এভাবে করলে ভালো হয়। একজন নির্মাতা যখন কাজের প্রতি সৎ থাকেন তখন তার প্রতি ভালোলাগা শ্রদ্ধাবোধ জন্মানো খুবই স্বাভাবিক। আর সৌদ তো মাল্টি ট্যালেন্টেড। যেমন ভালো নির্মাতা, তেমনি তার লেখা খুবই ভালো। গানের লিরিক দেখে দারুণ।

জীবনসঙ্গী হিসেবে বদরুল আনাম সৌদ কেমন?

সৌদ এক কথায় একজন কাজপাগল মানুষ। যখন সে কাজ করে তখন পুরোটাই নিমজ্জিত থেকে করে। আর ব্যক্তিজীবনে বললে, সে অনেক বেশি কেয়ারিং। অনেক বেশি উৎসাহ দিতে পারে মানুষকে। এই সময়ে এমন কমিটেড মানুষ পাওয়া যায় না। সবচেয়ে বড় বিষয় আমরা একে অপরকে স্পেস দিতে জানি। কাজের মধ্যে থাকলে কখনো সৌদ আমাকে বিরক্ত করে না, আমিও তাই। এই যে সে একটা নতুন সিনেমা শেষ করল, পোস্ট প্রোডাকশনের কাজে ইন্ডিয়া গেল, আমি তাকে একটুও বিরক্ত করিনি।  

সবশেষে জানতে চাই, আগামী দিনের প্রতি প্রত্যাশা কী?

সবার কাছে দোয়া চাই। মানুষ আমাকে যে পরিমাণ ভালোবাসে তার মর্যাদা যেন রাখতে পারি। কখনোই যেন এমন কোনো আচরণ না করি, যাতে আমার ভক্ত বা কাছের মানুষরা কষ্ট পায়। বিশ্বাস করুন, আমার যা আছে তাতেই আমি খুশি। কারণ এদেশের মানুষের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি তা নিয়ে পুরো একটা জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়। আই হ্যাভ নো রিগ্রেটস।