কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশজুড়ে বিভাগীয় গণসমাবেশ শেষে ১০ ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকায় মহাসমাবেশ করার কথা রয়েছে বিরোধী দল বিএনপির। ঢাকার এ সমাবেশ থেকে সরকার পতনের চূড়ান্ত আলটিমেটাম দেওয়া হবে বলে আওয়াজ তুলছেন দলটির শীর্ষ নেতারা। যা ঘিরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এরই মধ্যে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। গত কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণ ও মজুদের অভিযোগে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হচ্ছে। গ্রেপ্তারও করা হয়েছে অনেককে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের বিভিন্ন জায়গায় নতুন করে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নাশকতা পরিকল্পনা ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে ১১টি মামলা এবং ৬৭ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া গেছে।
বিএনপি নেতারা বলছেন, ককটেল বিস্ফোরণ ও মজুদের সাজানো অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে গণহারে ধরপাকড় চালানো হচ্ছে। তাদের দাবি, ঢাকায় মহাসমাবেশ ঠেকাতে নেতাকর্মীদের হয়রানি করতে মামলা এবং গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে পুলিশ বলছে, ঢাকার কর্মসূচি সামনে রেখে বিএনপি নেতাকর্মীরা নাশকতার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
জামালপুরের বিএনপির ৪২ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার : নাশকতা পরিকল্পনার অভিযোগে জামালপুরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে গত দুদিনে বিএনপির ৪২ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে জামালপুর সদর উপজেলায় ১২, মেলান্দহে ৬, ইসলামপুরে ৪, দেওয়ানগঞ্জে ৫, বকশীগঞ্জে ৭, সরিষাবাড়ীতে ৫ এবং মাদারগঞ্জ উপজেলা থেকে ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
জেলা বিএনপির সভাপতি ফরিদুল কবির তালুকদার শামীম বলেন, ‘নাশকতা সৃষ্টি বা পরিকল্পনার কোনো ঘটনাই ঘটেনি। বিএনপির আন্দোলনকে প্রতিহত করতে পরিকল্পিতভাবে হয়রানিমূলক গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হচ্ছে।’
গাজীপুরে বিএনপি-যুবদলের ৮ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার : ঢাকার গণসমাবেশের প্রচারণা উপলক্ষে লিফলেট বিতরণের সময় বিএনপি ও যুবদলের আট নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে গাছা থানা পুলিশ। বুধবার বেলা পৌনে ৩টার দিকে গাজীপুর মহানগরের ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইছর এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
এদিকে গাজীপুর জেলার পাঁচ থানায় গত দুদিনে বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের ৪৬৯ নেতাকর্মীকে আসামি করে পাঁচটি মামলা হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতারা বাদী হয়ে এসব মামলা করেন। সবকটি মামলা বিস্ফোরক আইনে করা হয়েছে।
তবে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহ রিয়াজুল হান্নান বলেন, ‘বিস্ফোরণসংক্রান্ত কোনো ঘটনাই ঘটেনি। মূলত ১০ ডিসেম্বরের সমাবেশকে বানচাল করতে পুলিশকে দিয়ে এসব মামলা করানো হচ্ছে।’
শ্রীপুরে বিএনপির ৮ নেতাকর্মী কারাগারে : গাজীপুরের শ্রীপুরে বিএনপির আট নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ছাত্রলীগ নেতা মাহাবুব হাসানের বাদী হয়ে করা বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের মামলায় তাদের আটক করা হয়। পরে গতকাল দুপুরে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, পুলিশ বিভিন্ন বাড়িতে অভিযান চালানোর সময় আসামি না পেয়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছে। তবে পুলিশ বলছে, মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের ধরতে আইন মেনেই অভিযান চালানো হচ্ছে।
কালিয়াকৈরে গ্রেপ্তার আতঙ্কে বিএনপি : গাজীপুরের কালিয়াকৈরে পৌর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে ইটপাটকেল ও ককটেল বিস্ফোরণের কথিত ঘটনার তিন দিন পর গতকাল দুপুরে প্রতিবাদ সভা করেছে উপজেলা আওয়ামী লীগ। এদিকে ওই ঘটনায় করা মামলায় উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও পৌর কাউন্সিলরকে গ্রেপ্তারের পর আতঙ্কিত নেতাকর্মীরা। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহ রিয়াজুল হান্নান বলেন, ‘আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলার কোনো ঘটনাই সেদিন ঘটেনি। বিএনপির ঢাকার সমাবেশে লোকসমাগম কমিয়ে রাখতে এ গায়েবি মামলা শুরু করেছে।’
সিংগাইরে আরও এক মামলা, গ্রেপ্তার ৪ : মানিকগঞ্জের সিংগাইরে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে আরও একটি মামলা হয়েছে। উপজেলা ধল্লা ইউনিয়নের গাজিন্দা গ্রামের ইদু মিয়ার ছেলে আকাশ আহমেদ নয়ন বাদী হয়ে গতকাল ২০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২০-২৫ জনকে আসামি করে মামলাটি করেন। পুলিশ এজাহারভুক্ত চার আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে।
সখীপুরে নাশকতার মামলায় ৪ বিএনপি নেতা গ্রেপ্তার : টাঙ্গাইলের সখীপুরে নাশকতার অভিযোগে বিএনপির চার নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বুধবার রাতে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। সখীপুর থানার ওসি মো. রেজাউল করিম জানান, গ্রেপ্তার চারজনকে পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে গতকাল বিকেলে আদালতে হাজির করা হয়।
শেরপুরে বিএনপি নেতা আটক : বগুড়ার শেরপুরে পুলিশ গতকাল ভোরে বিস্ফোরক মামলার আসামি বিএনপি নেতা আবদুল মজিদকে (৪০) আটক করেছে। তিনি খানপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। শেরপুর থানার ওসি মো. আতাউর রহমান খোন্দকার জানান, মজিদকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মুন্সীগঞ্জে বিএনপির ২২৪ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ৪ মামলা : গত বুধবার রাতে ককটেল বিস্ফোরণ ও অটোরিকশা ভাঙচুরের ঘটনায় মুন্সীগঞ্জে বিএনপির ২২৪ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চারটি মামলা হয়েছে। গতকাল জেলার সিরাজদীখান, লৌহজং, টঙ্গীবাড়ি ও গজারিয়া থানায় মামলাগুলো রুজু হয়। তবে জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আতোয়ার রহমান বাবুল বলেছেন, ‘ঢাকার মহাসমাবেশ ঘিরে এগুলো পুলিশের সাজানো নাটক। দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হচ্ছে মূলত ঢাকার মহাসমাবেশে যাওয়া ঠেকাতে।’
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলা, উপজেলার প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা