অস্ট্রেলিয়াকে পোল্যান্ড বানাতে চায় আর্জেন্টিনা

স্বপ্নের শিরোপা থেকে মাত্র চার জয় দূরে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। কোয়ার্টার ফাইনালের পথে আজ তাদের সামনে বাধা অস্ট্রেলিয়া। মানে-গুণে আর্জেন্টিনার সঙ্গে তুলনাই চলে না সকারুদের। তবে মরুর বিশ্বকাপের শুরুতে সৌদি আরবের কাছে অঘটনের শিকার হওয়ার পর থেকেই আলবিসেলেস্তারা সতর্ক। ঘর পোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলে যেমন ভয় পায়, মেসিদের অবস্থা হয়েছে তাই। অনেক কষ্টে গ্রুপ পর্ব পেরোনোর পর আর ভুল করতে চায় না লিওনেল স্কালোনির দল। তাই তো পোল্যান্ড ম্যাচের পর পাওয়া দু’দিনকে শতভাগ কাজে লাগাতে তৎপর ছিলেন কোচ। অমন আগুনে ম্যাচের পর বিরতির সময়টা বড্ড কম। বৃহস্পতি আর শুক্র এই দু’দিন খেলোয়াড়দের বিশ্রাম দেবেন নাকি অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর প্রস্তুতি সারবেন এ নিয়েই দ্বন্দ্বে পড়ে গিয়েছিলেন কোচ। তবে সব কিছু মানিয়ে নিয়ে দলকে ঠিকই প্রস্তুত করেছেন আরেকটি ‘ফাইনালের’ জন্য। যেখানে স্কালোনি দেখতে চান পোল্যান্ড ম্যাচের পুনরাবৃত্তি।

সামর্থ্যে পিছিয়ে থাকা প্রতিপক্ষের শক্তির জায়গা একটাই, নিজেদের ঘর সামলে, হাতেগোনা সুযোগগুলো কাজে লাগানো। পোল্যান্ডের মতো একই ভাবনা নিয়ে খেলবে না অস্ট্রেলিয়া। ম্যাচটা জিততে তাদেরও করতে হবে গোলের চেষ্টা। তবে অবশ্যই নিজেদের দুর্গ সুরক্ষিত রেখে। আর্জেন্টিনার কোচমনে করেন এক কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়েই আহমেদ বিন আলি স্টেডিয়ামে হাজির হবে গ্রাহাম আর্নল্ডের শিষ্যরা, ‘অস্ট্রেলিয়া অবশ্যই ভালো দল। ফেভারিটের তকমাটা একপাশে রেখে আমাদের ম্যাচটা খেলতে হবে। আমি চাই ছেলেরা ম্যাচটা সেভাবেই খেলুক, যেভাবে তারা পোল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেছে। অস্ট্রেলিয়া এই পর্যন্ত আসায় আমি একদমই অবাক হইনি। বিশ্বকাপে তাদের উপস্থিতি নতুন নয়। তারা আমাদের কাজটা কঠিন করে তুলবে। তাই সতর্ক থাকতে হবে।’

গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে দলের অন্যতম অভিজ্ঞ উইঙ্গার অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়াকে পাওয়া নিয়ে সংশয় আছে। পোল্যান্ডের বিপক্ষে পেশিতে টান নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল গত বছর ফাইনালে গোল করে আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকা জেতানো তারকা। স্কালোনি তার সম্ভাব্য একাদশ জানাতে পারেনি ডি মারিয়ার কারণেই, ‘ওর বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে এখনো জানি না। পোল্যান্ড ম্যাচ থেকে সে পেশিতে অস্বস্তি নিয়ে মাঠ ছেড়েছিল। ভাগ্য ভালো যে, সেটা বড় আকার ধারণ করেনি। তবে আগামীকাল (আজ) তার খেলাটা এখনো অনিশ্চিত।’ ডি মারিয়া না খেললে তার একাধিক বিকল্প আছে স্কালোনির কাছে।

আর্জেন্টাইন সমর্থকদের কাতারের মাঠগুলোতে সরব উপস্থিতি দেখে আনন্দিত স্কালোনি আজো একই রকম সমর্থন আশা করছেন, ‘ঐতিহাসিকভাবে আর্জেন্টাইনদের মধ্যে দল নিয়ে একটা উন্মাদনা থাকে। এজন্য তাদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। পোল্যান্ডের বিপক্ষে তারা যে পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল, আশা করছি আগামীকালও সেটা করবে। যাতে আমাদের মনে হয় আমরা আর্জেন্টিনারই কোনো মাঠে খেলছি।’ বহুদূরের বাংলাদেশের মানুষের আর্জেন্টাইনপ্রীতির কথা জেনেও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন স্কালোনি।

আর্জেন্টিনা দলে লিওনেল মেসি ও ডি মারিয়ার অবদান কতটা, সেটা বুঝিয়েছেন মিডফিল্ডার রদ্রিগো ডি পল। আতলেতিকো মাদ্রিদ তারকা বলেন, ‘আর্জেন্টিনার জার্সির গৌরব ও দায়িত্বটা বুঝতে তারা আমাদের সহায়তা করেন। আর্জেন্টিনা নামক জাহাজের চালক তারাই। তবে আমাদেরও এখন দায়িত্ব নিতে হবে।’ অস্ট্রেলিয়ার ফুটবলারদের উচ্চতাকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া খুব দ্রুত গতির দল। সেন্টারব্যাকরা সবাই দীর্ঘদেহী। ওদের উইঙ্গাররাও খুব দ্রুতগতির। তাই এই জায়গাগুলো নিয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। যেটা মনে হচ্ছে, পোল্যান্ডের মতো ওরাও আমাদের পায়ে বেশি বল দিয়ে রাখবে এবং প্রতি আক্রমণে গিয়ে সুযোগ বের করতে চাইবে। তাই মিডফিল্ডারের দায়িত্ব হবে আক্রমণের পাশাপাশি রক্ষণকেও সহায়তা দেওয়া। সেটা হলে ফরোয়ার্ডরা অনেক বেশি স্বাধীন হয়ে খেলতে পারবে।’

অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে এর আগে সাতটি ম্যাচ খেলেছে আর্জেন্টিনা। যার পাঁচটিই জিতেছে তারা। তবে একেবারে প্রথম ম্যাচটাই আর্জেন্টিনা হেরেছিল ৪-১ ব্যবধানে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের প্লে-অফে দু’দলের দু’বার দেখা হয়। ১৯৯৪ বিশ্বকাপের টিকিট পেতে দুই লেগের লড়াইয়ে আর্জেন্টিনা একটিতে জিতে এবং একটি ড্র হয়। বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে দু’দলের প্রথম দেখা হচ্ছে আজ। আর প্রথম সুযোগেই ইতিহাস গড়তে চায় অস্ট্রেলিয়ানরা। ফ্রান্সের কাছে ৪-১-এ হেরে শুরুর পর দলটি চমক দেখিয়ে উঠে এসেছে দ্বিতীয় রাউন্ডে। তিউনিসিয়াকে ১-০ গোলে হারানোর পর তারা ডেনমার্কের মতো বড় শক্তিশালী দলকে হারায় শেষ গ্রুপ ম্যাচে, যা তাদের দিচ্ছে আর্জেন্টিনাকে হারানোর স্বপ্ন দেখার বড় সাহস।

স্বপ্ন বাস্তবায়নে অবশ্যই সকারুজদের সবার আগে থামাতে হবে দারুণ ছন্দে থাকা মেসিকে। খুদে জাদুকরের ছন্দ থামানোর হুমকি দিয়ে রেখেছেন দলটির ডিফেন্ডার মিলোস ডেগেনেক। নিজেদের আন্ডারডগ দাবি করে অঘটন ঘটানোর স্বপ্ন দেখছেন তিনি, ‘এটা হবে ১১ বনাম ১১। এটা ১১ মেসির বিপক্ষে খেলা নয়। মেসি একজনই। আমি অবশ্যই তাকে ভালোবাসি, তবে সেও কিন্তু একজন রক্ত-মাংসের মানুষ। এটাও ঠিক তার দল কিন্তু সৌদি আরবের কাছে হেরেছে টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থাকার পর। সৌদি যদি পারে, লেস্টার সিটি যদি প্রিমিয়ার লিগ জিততে পারে, যদি ক্রোয়েশিয়া বিশ্বকাপের ফাইনালে যেতে পারে, আমরা কেন না? আমি তো স্বপ্ন দেখি এরকম একটা ঘটনা ঘটাব, যা আজীবন আমাদের গর্বিত করবে। দিনটা কালও তো হতে পারে।’

ডেগেনেকের স্বপ্নটা আজ পূরণ না হলেই হয়। আর হয়ে গেলে সাতবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী মেসির বিদায়টা হবে শূন্য হাতে।