যুবদল সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে আটক করেছে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। রাজশাহীতে বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশে অংশ নিয়ে ঢাকায় ফেরার পথে গতকাল শনিবার রাতে আমিনবাজার থেকে তাকে হেফাজতে নেয় ডিবি সদস্যরা।
এ সময় টুকুর সঙ্গে থাকা যুবদলের সহসভাপতি নুরুল ইসলাম নয়ন, ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি জাভেদ হাসান স্বাধীন এবং টুকুর ব্যক্তিগত সহকারী মোখলেসুর রহমানকেও আটক করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস উইং সদস্য শামসুদ্দিন দিদার। এ ছাড়া ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোশাররফ হোসেন খোকনকে ডিবি সদস্যরা আটক করেছে বলে জানিয়েছেন তার ব্যক্তিগত সহকারী মো. রাকিব। এদিকে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাসভবন ফিরোজার সামনের সড়কের দুই পাশে গতকাল রাতে তল্লাশিচৌকি বসায় পুলিশ। এ ছাড়া পূর্বঘোষণা অনুযায়ী রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান ডিভিশনের উপকমিশনার আব্দুল আহাদ রাত ১১টার দিকে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খালেদা জিয়ার বাসার সামনে নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া বিশেষ অভিযানের অংশ হিসেবে রাজধানীর হোটেল, মেস ও গেস্ট হাউজগুলোতে রাত নয়টার পর থেকে অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা হয়নি।’
আটকের পর সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয় বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
টুকুসহ অন্য নেতাদের আটকের নিন্দা জানিয়ে তাদের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, ‘সরকার আমাদের ১০ ডিসেম্বরের গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে উন্মাদ ও হিংস্র হয়ে গেছে।’
রাজধানীজুড়ে বিশেষ অভিযান শুরু : পূর্বঘোষণা অনুযায়ী রাজধানীজুড়ে শুরু হয়েছে পুলিশের বিশেষ অভিযান। এর মধ্যে গতকাল রাত ৯টার পর বনানীর কাকলী এলাকার কয়েকটি আবাসিক হোটেলে তল্লাশি চালাতে দেখা গেছে। রাজধানীর অন্য থানাগুলোর পুলিশ সদস্যরাও সক্রিয় রয়েছে। গতকাল রাত ১০টার পর মতিঝিলের দৈনিক বাংলা মোড়ের হোটেল রহমানিয়ায় অভিযান শুরু করে পুলিশ। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মতিঝিল থানার ওসি ইয়াসির আরাফাত বলেন, ‘আমরা অভিযান পরিচালনা করছি। এ বিষয়ে পরে জানানো হবে।’
জানা গেছে, দৈনিক বাংলার মোড় সংলগ্ন ওই বহুতল ভবনের ওপরতলায় রয়েছে বার এবং আবাসিক হোটেল। সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যত্যয় ঘটতে পারে বা কোনো অপরাধী আছে কি না, তা নিশ্চিত হতে অভিযানে যায় পুলিশ।
এর আগে পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে জানা হয়েছিল যে অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়ে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে বিশেষ অভিযান চলবে। ডিসেম্বরে বিজয় দিবসসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিবসকে কেন্দ্র করেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
নয়াপল্টনে ককটেল বিস্ফোরণ : রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে একটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে কার্যালয়ের সামনের সড়কে রোড ডিভাইডারের পাশে এ বিস্ফোরণ ঘটে। তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি। কে বা কারা এই ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে তা জানা যায়নি। এ ঘটনায় পুলিশ কাউকে আটক করেনি। তবে ককটেল বিস্ফোরণ প্রসঙ্গে রাতে নয়াপল্টনে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করে বলেন, ‘এটা আওয়ামী সরকারের নির্দেশিত গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর যৌথ প্রযোজনা। ১০ ডিসেম্বরের গণসমাবেশকে বানচাল করার জন্য পুলিশের একটা মাস্টারপ্ল্যান।’
ককটেল বিস্ফোরণের পর বিএনপি কার্যালয়ে অবস্থান করা বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল করেন। এ সময় তারা ককটেল বিস্ফোরণের জন্য সরকারকে দায়ী করেন। সন্ধ্যার পর কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয় পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। তখন কার্যালয়ে আটকে পড়া নেতাকর্মীরা সাংবাদিকদের জানান, কার্যালয় থেকে বের হলেই নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিএনপির আরও ২১ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার : কয়েক দিনের ধারাবাহিকতায় নাশকতা ও নাশকতা পরিকল্পনার মামলায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের আরও ২১ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে বিএনপি ও ছাত্রদলের পাঁচ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল ভোরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে গত শুক্রবার ভোরে বিএনপি ও ছাত্রদলের ৭ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। দুই দফা গ্রেপ্তারের পর আতঙ্কে রয়েছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। গ্রেপ্তার এড়াতে তাদের অনেকেই বাড়িঘর ছেড়েছেন। একই জেলার আড়াইহাজার থানা পুলিশ গতকাল বিকেলে নাশকতার মামলায় সদর পৌরসভার জিয়া মঞ্চের আহ্বায়ক আরাফাত সিদ্দিকীকে (২৫) গ্রেপ্তার করেছে।
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে বিএনপির ৬ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার রাতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। পরে গতকাল আদালতের মাধ্যমে তাদের এক দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে দুটি মামলায় মির্জাপুরে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের ১২ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হলো।
লক্ষ্মীপুরে পুলিশকে ইটপাটকেল ছুড়ে আহত করার অভিযোগে করা মামলায় ছাত্রদলকর্মী সবুজ আহমেদ সবুজকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শুক্রবার রাতে লক্ষ্মীপুর পৌর শহরের বাজার ব্রিজ এলাকার দোকান থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে গতকাল আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
নাশকতা ও বিস্ফোরক মামলায় মুন্সীগঞ্জের পৃথক উপজেলায় পুলিশের অভিযানে বিএনপির ৮ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ২ জন এবং গজারিয়া উপজেলা থেকে ৬ জনকে আটক করা হয়।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলার প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা