হিজাব নিয়ে ইরানের প্রশাসনের গোঁড়া মানসিকতার বিরুদ্ধে প্রথম বড় জয় পেলেন ইরানের নারীরা। শেষ পর্যন্ত চাপের মুখে ‘নীতি পুলিশ’ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিল ইরানের ইসলামি সরকার। টানা দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চলমান বিক্ষোভের মুখে বহুল আলোচিত-সমালোচিত ‘নীতি পুলিশ’ বিলুপ্ত করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। চলমান আন্দোলনে এই প্রথম বড় জয় এল ইরানের নারীদের।
ইরানের নীতি পুলিশের অত্যাচারেই মাহসা আমিনির মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছিল। এরপর থেকেই বিগত আড়াই মাসের বেশি সময় ধরে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছেন ইরানিরা। নারীর পোশাকের স্বাধীনতার দাবিতে বিক্ষোভ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় পাঁচশ নারী-পুরুষ ও শিশু।
সঠিক নিয়মে হিজাব না পরার অভিযোগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাজধানী তেহরানে কুর্দি তরুণী মাসা আমিনিকে (২২) গ্রেপ্তার করে নীতি পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর পুলিশি হেফাজতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে তেহরানের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৬ সেপ্টেম্বর তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। নির্যাতনে মাসার মৃত্যু হয়েছে দাবি করে ইরানের মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন।
মাসার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভ রুখতে দমন-পীড়ন জোরদার করে ইরানি কর্তৃপক্ষ। তবে আড়াই মাস পরে এসে এবার দেশটির কর্তৃপক্ষ নীতি পুলিশ বিলুপ্ত করার ঘোষণা দিল। টানা বিক্ষোভের ফলে সৃষ্ট চাপের মুখে ‘নীতি পুলিশ’ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিল ইরানের ইসলামি সরকার।
হিজাব বিরোধী আন্দোলনে ইরানি নিরাপত্তাবাহিনীর গুলিতে এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ৪৬৯ জন বিক্ষোভকারী। পরিস্থিতি এমন হয়ে গিয়েছিল যে নিজেদের ফুটবল দলের হারেও উল্লাস করতে দেখা যায় ইরানি নাগরিকদের। নিজেদের দেশের ফুটবল দলকে ‘সরকারের প্রতীক’ হিসেবেই দেখছিলেন আন্দোলনকারীরা। এই আবহে ইরানের হারে উল্লাস করা নাগরিকদের ওপরও অত্যাচার চালিয়েছিল সেদেশের পুলিশ। তবে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অশান্ত পরিস্থিতিকে শান্ত করতে এবার ‘নীতি পুলিশকে’ নিষিদ্ধ করল ইরান সরকার। ইরানের প্রসিকিউটর জেনারেলকে উদ্ধৃত করে এমনটাই জানায় আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা এএফপি।
আমিনির মৃত্যুর পর থেকেই ইরানে শুরু হয়েছিল হিজাব বিরোধী আন্দোলন। হিজাব পরার বাধ্যবাধকতার বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে রাস্তায় নেমেছেন হাজার হাজার মানুষ। নারীরা প্রকাশ্যে হিজাব পুড়িয়ে সরকার বিরোধী স্লোগান তুলছেন মাঝ রাস্তায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। পুলিশের গুলিতেও প্রতিবাদ থামেনি। রাস্তায় দাঁড়িয়ে হিজাব পুড়িয়েছেন মেয়েরা। সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ করে নিজেদের চুল কেটে প্রতিবাদ জানিয়েছেন শত শত নারী।
যাতে সমর্থন জানান বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ নারী-পুরুষ, এমনকি, তারকারাও। অবশেষে চাপের মুখে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হল ইরানের প্রশাসন। ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ জাফর মনতাজেরি বলেছেন, বিচার বিভাগের সাথে নৈতিকতা পুলিশের কোনও সম্পর্ক নেই এবং এই পুলিশকে বিলুপ্ত করা হয়েছে।
ইরানের নৈতিকতা পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে গাশত-ই এরশাদ বা ‘গাইডেন্স পেট্রোল’ নামে পরিচিত। দেশটির সাবেক কট্টরপন্থী প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের আমলে ‘শালীনতা এবং হিজাবের সংস্কৃতি’ ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পুলিশের এই শাখা।
দেশটির পুলিশের বিশেষ এই শাখা ২০০৬ সালে প্রথমবারের মতো টহল শুরু করেছিল। নারীদের মাথা ঢেকে রাখার আইন পরিবর্তন করা দরকার কিনা সে বিষয়ে সংসদ এবং বিচার বিভাগ- উভয়ই কাজ করছে বলে মনতাজেরির মন্তব্যের একদিন পর নৈতিকতা পুলিশ বিলুপ্তির ঘোষণা এসেছে।
এর আগে, শনিবার দেশটির প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে বলেন, ইরানের প্রজাতন্ত্র ও ইসলামিক ভিত্তি সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। তবে সংবিধান বাস্তবায়নের পদ্ধতি নমনীয় করা হতে পারে।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের চার বছর পর ইরানে সবে ধর্মের নারীদের জন্য হিজাব বাধ্যতামূলক করা হয়, যা ইসলামের ইতিহাসেও এক নজিরবিহীন। ওই বিপ্লবের মাধ্যমে মার্কিন-সমর্থিত তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারকে উৎখাত এবং ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। ইসলামিক বিপ্লবের পর এবারই প্রথম সবচেয়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র। তাই ব্যাপক দমনপীড়নের মাধ্যমে সরকারবিরোধী এই বিক্ষোভ মোকাবিলার চেষ্টা করছে ইসলামি সরকার।
মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বার্তা সংস্থা এইচআরএএনএ শুক্রবার জানায়, তাদের হিসাবে ইরানে ৪৬৯ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে, যাদের ৬৪ জনই অপ্রাপ্তবয়স্ক।
বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর ৬১ সদস্যও মারা পড়েছে বলে জানিয়েছে তারা। এ ছাড়া গ্রেপ্তার হয়েছে ১৮ হাজার ২১০ বিক্ষোভকারী।