‘দিকে দিকে পাখি পাতা, জাল নয়’

কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে অতিথি পাখির ডানায় ভর করে আগমন ঘটে শীতকালের। পরিযায়ী পাখিদের আমরা আদর করে অতিথি পাখি বলে ডাকি। যেসব প্রজাতির পাখি পরিযানে অংশ নেয়, সেগুলোকে পরিযায়ী পাখি বলে। আমাদের দেশে এসব অতিথি পাখির আগমন ঘটে উত্তর মেরু থেকে। সাইবেরিয়া, ফিলিপস, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, ফিনল্যান্ড, অ্যান্টার্কটিকাসহ অনেক অঞ্চলে তাপমাত্রা যখন মাইনাস শূন্য ডিগ্রিতে নেমে আসে, তখন সেখানে দেখা দেয় প্রচণ্ড খাদ্যাভাব। তীব্র শীতে পাখির দেহ থেকে পালক খসে পড়ে। ফলে প্রাণ বাঁচাতে শীতপ্রধান অঞ্চলের পাখিগুলো হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে আসে আমাদের মতো নাতিশীতোষ্ণ এলাকায়। কিন্তু প্রকৃতি তাদের অনুকূলে হলেও একশ্রেণির দুর্বৃত্ত ব্যস্ত হয়ে ওঠে এসব অতিথি পাখি নিধনে।

মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘বাঁচতে এসে হারাচ্ছে জীবন’ শিরোনামের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রতি বছরের মতো এবারও শীতের শুরুতেই হাকালুকি হাওরে আশ্রয় নিতে আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখি। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে, মৌসুমের শুরুতেই ফাঁদ পেতে ও বিষটোপ দিয়ে হাওরে পাখি নিধন চলছে।

প্রকৃতিপ্রেমীদের আক্ষেপ, বাঁচতে আসা প্রাণীগুলোকে এভাবে হত্যা করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঠিকঠাক নজরদারি করতে পারছে না। অবশ্য বন বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় লোকবল না থাকায় পাখি শিকারিদের সঙ্গে পেরে উঠছে না তারা। হাওরপাড়ের বাসিন্দারা জানান, শুষ্ক মৌসুমে হাওর শুকিয়ে যায়। এ সময় শীতপ্রধান বিভিন্ন দেশ থেকে ছুটে আসা ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি এ হাওরে আশ্রয় নেয়। পাখিরা দিনে দল বেঁধে হাওরের বিভিন্ন বিলে খাবার খুঁজে বেড়ায়। এ সুযোগে দুর্বৃত্তরা জাল দিয়ে ফাঁদ পেতে পাখি নিধন করে। জালের ফাঁদ পেতে অতিথি পাখি নিধনের খবর পড়লেই কবি জয় গোস্বামীর ‘দিকে দিকে পাখি পাতা, জাল নয়’ লাইনটির কথা মনে পড়ে। এ ছাড়া সেদ্ধ করা ধানের সঙ্গে একধরনের বিষ মিশিয়ে ‘বিষটোপ’ তৈরি করে শিকারিরা বিভিন্ন বিলের পাড়ে ছিটিয়ে দেয়। পাখিরা খাবার ভেবে এসব টোপ খেয়ে মারা যায়। শিকার করা এসব পাখি লুকিয়ে আশপাশের বিভিন্ন হাটবাজার ও বাড়ি বাড়ি ফেরি করে চড়া দামে বিক্রি করা হয়।

বাংলাদেশে ১৯৯৪ সালে অতিথি পাখি এসেছিল ৮ লাখের বেশি। ২০১৪ সালে এ সংখ্যা নেমে এসেছে দুই লাখের নিচে। অর্থাৎ গত ২০ বছরে প্রায় ছয় লাখ পাখি আসা কমে গেছে। তবে এখন এ সংখ্যা সাড়ে তিন লাখের মতো হতে পারে বলছেন গবেষকরা। অতিথি পাখি যেন নিরাপদে বাংলাদেশে অবস্থান করতে পারে সেজন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে কিছু অভয়ারণ্য তৈরি হয়েছে। এসব পাখি শিকার বা হত্যাকে দণ্ডনীয় অপরাধ ঘোষণা করে আইনও করা হয়েছে। কিন্তু থেমে নেই অতিথি পাখি নিধনের ঘটনা। বরং পাখি শিকারিরা নিত্যনতুন কৌশলে চালিয়ে যাচ্ছে নিধনযজ্ঞ। ‘বাঁশির নকল সুর’ বাজিয়ে পাখিকে ধরার এক নিদারুণ কায়দাও এখানে আছে। এমনকি, পাখির ডাক মোবাইলে বাজিয়েও পাখি ধরার কথা খবরে আসছে। অতিথি পাখিকে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাস্তায় হাঁক দেওয়া সেসব পাখি বিক্রেতাকে ইদানীং কম দেখা গেলেও বিভিন্ন এলাকার খাবার দোকান ও হোটেলে নিয়মিতই মেলে রান্না করা পাখির মাংস।

দেশের বিস্তীর্ণ উপকূল অঞ্চল দেশি, পরিযায়ীসহ নানা পাখির বিচরণস্থল। দুনিয়ায় বিরল এমন অনেক পাখি কেবল এখানেই দেখা যায়। দেশের এই অঞ্চল দিনে দিনে পাখিদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। পরিবেশকর্মী খোরশেদ আলম বলেন, অবাধে পাখি শিকারের কারণে হাওরে পাখির সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের আওতায় আনা জরুরি। বিচারহীন পাখি হত্যা জনমনস্তত্ত্বে এখন ‘সহ্য করার মতো স্বাভাবিক’ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যেন। পাখি হত্যা রোধে প্রশাসনের সত্যিকার অর্থে সক্রিয় ও সজাগ হওয়া জরুরি। পাখি শিকার বন্ধে বন বিভাগের লোকবল সংকট রয়েছে। অবিলম্বে বন বিভাগের লোকবল সংকট নিরসন করে শিকার রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশের বিস্তীর্ণ উপকূল অঞ্চলে পাখি সুরক্ষায় দৃঢ় নীতি ও সক্রিয় পদক্ষেপ না নিলে এই অঞ্চল অচিরেই হয়তো নিদারুণভাবে পাখিশূন্য হবে। পাখি নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি এবং উপকূলীয় অঞ্চলে জনতৎপরতা বাড়াতে পরিবেশ ও প্রাণী অধিকার কর্মী ও সচেতন নাগরিকদের আরও সোচ্চার হতে হবে। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গ্রামে গ্রামে পাখিরক্ষা কমিটি গঠন করে জনগণকে সচেতন করার পদক্ষেপ নিতে হবে। আদরের অতিথি পাখি উড়ে এসে বসার ও বিচরণের নিরাপত্তা পাক আর বেলা শেষে ডানা মেলে ফিরে যাক।