আঁর তো বয়স অইয়ে, আঁই তো বেশিদিন নো বাইচ্চুম। হেতারলা আঁই শেখ হাসিনারে চাইতে আসছি যে। আঁই শেখ সাবরেও দেকখি’এভাবেই বলছিলেন চকরিয়া থেকে কক্সবাজার আসা ৭০ বছর বয়সী হাফিজুর রহমান। আজ বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় অংশ নিতে এসেছেন। শুধু হাফিজুর রহমানই নন, আজকের জনসভায় প্রধানমন্ত্রীকে নিজের চোখে দেখতে এবং তার দিক নির্দেশনামূলক বক্তব্য শুনতে লাখ লাখ মানুষ গতকাল মঙ্গলবার থেকেই কক্সবাজার এসে জড়ো হয়েছেন।
একদিকে সাড়ে পাঁচ বছর পর প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার আসছেন। আবার এক বছর পর জাতীয় নির্বাচন। ফলে এই জনমাবেশকে জনসমুদ্রে রূপ দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন কক্সবাজারের সংসদ সদস্য ও জেলা, উপজেলা এবং স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা। সেই সঙ্গে সমাবেশস্থল ও কক্সবাজার সেজেছে অন্য রকম সাজে।
গতকাল দুপুরের পর থেকেই বিভিন্ন উপজেলা থেকে নেতাকর্মীরা আসতে শুরু করেন। এ সময় সমুদ্র নগরী মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়। বিকেল ৪টায় লাল গেঞ্জি আর লাল টুপি পরে চকরিয়ার পেকুয়া থেকে ১০ হাজারের বেশি নেতাকর্মী আসেন। তারা ওই সংসদীয় আসনের সদস্য জাফর আলমের নেতৃত্বে কক্সবাজার আসেন। সাদা ক্যাপ, সাদা গেঞ্জির একটা দল।
ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেন, তারা আজকের সমাবেশে ৫০ হাজার নেতাকর্মী নিয়ে হলুদ ক্যাপ ও পোশাকে উপস্থিত থাকবেন। এভাবে সব উপজেলা থেকে ভিন্ন ভিন্ন পোশাকে থাকবেন সমাবেশে।
গতকাল প্রধানমন্ত্রীর সমাবেশস্থল ও কক্সবাজার ঘুরে দেখা গেছে, শতাধিক তোরণ ও হাজারো ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে সমুদ্র শহর কক্সবাজার। ভাঙা জীর্ণ প্রধান সড়কে করা হয়েছে কার্পেটিং। সড়কে নেই হকারের উৎপাত। দোকানের মালামাল নেই ফুটপাতে। রাস্তার পাশের ময়লা-আবর্জনারও নেই কোনো চিহ্ন। কয়েক দিন ধরে সকাল-বিকেল রাস্তায় ছিটানো হচ্ছে পানি ও মশার ওষুধ। রাস্তার দুই পাশের দেয়াল, ফুটপাতের সাইড দেয়াল ও ডিভাইডের শোভা পাচ্ছে নতুন রং। কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়েই প্রধানমন্ত্রীকে মিছিলে মিছিলে, গানে গানে বরণ করবেন কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও জেলা আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০০৯ সাল থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায়। এ সময়টুকুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজার এসেছেন আটবার। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ২২ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার এসেছিলেন। এর পাঁচ বছর পর আবার আজ আসছেন তিনি।
এ বিষয়ে কক্সবাজার দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজার আসা মানেই জেলাবাসীর লাভ। তিনি যতবার এসেছেন, ততবারই কক্সবাজারকে নানা উপহার দিয়েছেন। এই জেলাতে তারই বদান্যতায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ চলছে। আশা করছি এবার তিনি কক্সবাজারবাসীকে উপহার দিয়ে চমকে দেবেন।’
আজ সকালে প্রথমে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের ইনানী-পাটোয়ারটেক সৈকত এলাকায় ২৮ দিনের অংশগ্রহণ অনুষ্ঠিতব্য তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক নৌশক্তি প্রদর্শন মহড়ার উদ্বোধন করবেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ নৌবাহিনী আয়োজিত নৌশক্তি মহড়ায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, চীনসহ ২৮টি দেশ অংশ নিয়েছে। এরপর বেলা আড়াইটায় শহরের সমুদ্রপাড়ের শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আওয়ামী লীগের দলীয় জনসভায় ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রধান। দলীয় সমাবেশ মাঠে করা হয়েছে তিনটি মঞ্চ। ৬২ ফুটের নৌকা আকৃতির মূল মঞ্চের পশ্চিম পাশে তৈরি করা হয়েছে আরও দুটি উপমঞ্চ। মূলমঞ্চ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাষণ দেবেন। পাশের মঞ্চে থাকবেন কেন্দ্রীয় নেতারা। এর পাশের মঞ্চ থেকে পরিবেশিত হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
কক্সবাজার পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি নজিবুল ইসলাম বলেন, ‘জনসভা সফল ও সার্থক করে তুলতে আমরা সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। জনসভায় কমপক্ষে চার থেকে পাঁচ লাখ লোক সমাগম হবে।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর জনসভায় যোগ দিতে পৌরসভা, রামু, ঈদগাও, উখিয়া, টেকনাফ, চকরিয়া, পেকুয়া, কুতুবদিয়া, মহেশখালী থেকে এসেছেন দলীয় নেতাকর্মীরা।
কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মেয়র মুজিবুর রহমান বলেন, এত দিন আপনারা সমুদ্র দেখেছেন। ৭ ডিসেম্বর দেখবেন জনসমুদ্র। কেবল সভাস্থল নয়; আশপাশ এবং পুরো শহরই লোকারণ্য হবে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী এবার ২৮টি প্রকল্পের উদ্বোধন ও ৪টি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন।
২৮ প্রকল্প উদ্বোধন ও ৪ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন : উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা প্রকল্পগুলো হলো-কক্সবাজার গণপূর্ত উদ্যান, বাহারছড়া বীর মুক্তিযোদ্ধা মাঠ, কুতুবদিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ভবন, পেকুয়া উপজেলা ভূমি অফিস ভবন, কক্সবাজার জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় ভবন, শেখ হাসিনা জোয়ারিয়ানালা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের চারতলা একাডেমিক ভবন, আবদুল মাবুদ চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয়ের চারতলা একাডেমিক ভবন, উখিয়ার মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের চারতলা একাডেমিক ভবন, কক্সবাজার জেলার লিংক রোড-লাবণী মোড় সড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ, কক্সবাজার জেলার রামু-ফতেখাঁরকুল-মরিচ্যা জাতীয় মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ, টেকনাফ-শাহপরীর দ্বীপ জেলা মহাসড়কের হাড়িয়াখালী থেকে শাহপরীর দ্বীপ অংশ পুনর্নির্মাণ, প্রশস্ত ও শক্তিশালীকরণ, কক্সবাজার জেলার বাঁকখালী নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন, সেচ ও ড্রেজিং প্রকল্প (১ম পর্যায়), শাহপরীর দ্বীপের সি ডাইক অংশে বাঁধ পুনর্নির্মাণ ও প্রতিরক্ষা কাজ, জেলার ক্ষতিগ্রস্ত পোল্ডারগুলোর পুনর্বাসন প্রকল্প, রামুর কলঘর বাজার-রাজারকুল ইউপি সড়কে বাঁকখালী নদীর ওপর ৩৯৯ মিটার দীর্ঘ সংসদ সদস্য ও রাষ্ট্রদূত ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী সেতু, কক্সবাজার জেলায় নবনির্মিত ৬টি ইউনিয়ন ভূমি অফিস ভবন, রামু উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন, মহেশখালী উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন, টেকনাফ উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন, উখিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন, কক্সবাজার পৌরসভার এয়ারপোর্ট রোড শহীদ সরণি, বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্টেডিয়াম সড়ক, নাজিরারটেক শুঁটকি মহাল সড়ক, টেকপাড়া সড়ক, সি বিচ রোড, মুক্তিযোদ্ধা সরণি ও সৈকত-স্মরণ আবাসিক এলাকা সড়ক উদ্বোধন করবেন।
ভিত্তিপ্রস্তরযোগ্য প্রকল্পের তালিকা : বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (২য় পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্প, কুতুবদিয়া উপজেলাধীন ধুরুং জিসি মিরাখালী সড়কে ধুরুংঘাটে ১৫৩ দশমিক ২৫ মিটার জেটি এবং আকবর বলি ঘাটে ১৫৩ দশমিক ২৫ মিটার জেটি, মহেশখালী গোরকঘাটা ঘাটে জেটি নির্মাণ এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত নিরাপত্তা উন্নত করার জন্য উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় নাফ নদী বরাবর পোল্ডারগুলোর পুনর্বাসন প্রকল্প।