আমরা কি নিখোঁজ শিশুদের লাশ পেয়েই সন্তুষ্ট থাকব

এক। সাম্প্রতিককালে আমাদের দেশ ‘সামষ্টিক সহিংসতা’ নামক যে ভয়াবহ ব্যাধিতে আক্রান্ত, তার শিকার শিশুরা। ছেয়ে যাচ্ছে সব আজ শিশুহত্যার রোমহর্ষক খবরে। মানুষের বিবেককে কাঁপিয়ে দেওয়া একেকটি হত্যাকাণ্ডের পর মানুষ সজাগ হয়ে উঠলেও ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশে শিশুহত্যার চালচিত্র ভীষণ আতঙ্কজনক। অবৈধ সম্পর্ক দেখে ফেলায় মায়ের হাতে শিশু খুন, সম্পত্তির বিরোধে শত্রুকে ফাঁসাতে নিজের সন্তান হত্যা, সাবেক স্ত্রী বা স্বামীর সঙ্গে বিরোধের জেরে সন্তান হত্যা ইত্যাকার নানা রকম অস্বাভাবিক শিশুহত্যার খবরও আমাদের পাঠ করতে হয়েছে। অন্যান্য অসংখ্য কারণে হত্যা তো আছেই।

দুই। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৪৩৯টি শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১০৪ জনের বয়স ৬ বছরের নিচে, ৭৯ জনের বয়স ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। ৯৭৫ জন শিশুর ওপর নানা ধরনের সহিংসতা হয়েছে। এগুলো শুধু পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের হিসাব। বাস্তবে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি। শিশু অধিকার সনদে সই করার পর কেটে গেছে ৩৩ বছর। আমরা যখন ঝলমলে আয়োজনে শিশু অধিকার সপ্তাহ বা নারীর প্রতি সহিংতা প্রতিরোধ পক্ষ বা অন্য কোনো দিবস পালন করছি, তখনই হয়তো কোনো শিশুকে কেটে টুকরো করা হচ্ছে বা কোনো ছোট্ট শিশুকে ধর্ষণ করা হচ্ছে এই দেশে।

তিন। এক মাস আগে চট্টগ্রাম শহরের জামালখান এলাকার একটি ঘটনা ছিল মুষড়ে পড়ার মতো। তখন ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে বইছিল দমকা হাওয়া। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও সিএনজিচালিত অটোরিকশা করে মাইকিং করতে নেমেছিলেন এক তরুণী সালেহা আক্তার রুবি। কাতর কণ্ঠে তার আর্তি ভেসে আসছিল মাইক দিয়ে ‘আমার বোন মারজানা হক বর্ষা হারিয়ে গেছে। কেউ তার খোঁজ পেলে আমাদের একটু দয়া করে জানান।’ এক বিকেলে বর্ষা মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল দোকানে যাওয়ার জন্য। পরে বাসায় না আসায় খোঁজ নিয়ে জানা যায় দোকানে যায়নি সে। সব জায়গায় খুঁজেও পাওয়া যায়নি বর্ষাকে। কয়েক দিনেও বর্ষাকে খুঁজে না পেয়ে পুলিশের অসহযোগিতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। চিৎকার করে বলতে থাকেন : চারদিকে এতগুলো সিসিটিভি বসিয়ে কী লাভ? অবশেষে কয়েক দিন পর নালায় বস্তাবন্দি অবস্থায় পাওয়া গেল বর্ষার লাশ। বস্তায় টিসিবির সিল দেখে আশপাশের বিভিন্ন দোকান ও হোটেল-রেস্টুরেন্টের গোডাউন অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে আসল ঘটনা। ঘাতক এক দোকান কর্মচারী লক্ষ্মণ দাশ, বর্ষাদের প্রতিবেশী। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া রুবির বক্তব্য ছিল এমন ‘আমার বোন নিখোঁজের পর যদি পুলিশ তৎপর হতো, তাকে হত্যা করা যেত না। তাকে বাঁচানো যেত।’

চার। সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সবার মনোযোগ এখন ফুটবলকে ঘিরে। সেখানে কত তর্ক-বিতর্ক, কত আবেগের বহিঃপ্রকাশ। এর মধ্যে গত এক সপ্তাহ ধরে একটি ছবি বারবার হাজির হচ্ছিল। একটি নিখোঁজ সংবাদের পোস্টার। অনেকে ফেইসবুকে শেয়ার দিয়েছেন। বাবা-পরিবার হন্য হয়ে খুঁজছে পাঁচ বছর বয়সী শিশু আয়াতকে। চট্টগ্রাম শহরের ইপিজেড থানার বন্দরটিলা এলাকার ঘটনা এটি। দশদিন পর পাওয়া গেল আয়াতের খোঁজ। তার লাশ কেটে টুকরো টুকরো করে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে ঘাতক। আবির আলী নামে সেই ঘাতককে গ্রেপ্তারও করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরপরই বেরিয়ে আসে নিখোঁজ আয়াতের এ করুণ পরিণতি।

পাঁচ। আজ হয়তো বিশ্বকাপ ফুটবল, কাল অন্য কিছু নিয়ে মেতে থাকি আমরা। আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যস্ত রাখা হয় বিরোধী দল ঠেকাতে। ফলে যা ঘটার সেটিই ঘটে যায়, যা হওয়ার সেটিই হয়ে যায়! আমাদের শিশুদের জন্য একটি সাজানো বাগানের আকাক্সক্ষা থেকে যায় স্বপ্নে, বাস্তবে তা রূপ পায় না। বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে তোলা তো দূরের কথা, পৃথিবীতে এসেই আমাদের শিশুরা খুন হচ্ছে, ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। গণমাধ্যমে নিষ্ঠুরতা দেখতে দেখতে তাতে অভ্যস্ত হয়ে যাই আমাদের মনে কোনো রেখাপাত করে না। সামাজিক মান-মর্যাদার ভেদাভেদের মতো কোনো কোনো ঘটনার দিকে আমরা ফিরেও তাকাই না, আবার কোনো ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশে দেরি করি না। রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতির নানা ধূম্রজালে পথ হারাতে হারাতে আমরা এমন পর্যায়ে এসে ঠেকেছি যে, আমাদের শিশুদের এমন পরিণতিই মেনে নিচ্ছি। এমনকি শিশুরা নিখোঁজের পর তাদের লাশ পেয়ে আমাদের ‘সন্তুষ্ট’ থাকতে হচ্ছে।

ছয়। কেউ কেউ ঘটনাগুলোতে ‘বাজার অর্থনীতি’ দর্শনকে দায়ী করে। কিন্তু তার চেয়ে বেশি ‘সামাজিক অবক্ষয়’ হিসেবেই দেখা উচিত। গত সেপ্টেম্বর মাসে ‘ক্রাইম পেট্রোল’ দেখে নোয়াখালীর স্কুলছাত্রী তাসনিয়া হোসেন অদিতাকে হত্যার পরিকল্পনা ও হত্যা করা হয়। আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে এসব কথা জানিয়েছেন সাবেক কোচিং শিক্ষক আবদুর রহিম রনি। (সূত্র : ঢাকা মেইল) ভারতীয় টিভি সিরিজ ‘ক্রাইম পেট্রোল’ দেখে দেশে গত দুই বছরে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রামে ১৯ বছর বয়সী তরুণ আবির আলী ‘ক্রাইম পেট্রোল’ আর ‘সিআইডি’ দেখে যে লোমহর্ষক অপরাধের কৌশল শিখেছে, সেটারই প্রয়োগ করেছে ওই ছোট্ট শিশু আয়াতের ওপর। এসব টিভি সিরিয়ালের মূলে রয়েছে বাজার অর্থনীতি। একই সঙ্গে সমাজের বৈষম্য-সহিষ্ণুতা প্রায় সর্বত্র উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আমাদের আকাক্সক্ষাগুলো পরিবর্তিত হচ্ছে। ‘রুলিং অর্থনৈতিক মডেল’ এ ধরনের প্রবণতাকে ভর করে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে। সমাজের মধ্যে প্রচলিত উদাহরণগুলো ভেঙে পড়েছে। নিয়ম ভেঙে, নিয়মকে পাশ কাটিয়ে ও তোয়াক্কা না করে সমৃদ্ধি অর্জনের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। প্রকৃত ও পারিবারিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব হারিয়েছে। বিপরীতে চলছে সনদধারী শিক্ষাব্যবস্থা। যোগ হয়েছে ভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। আমাদের সমাজের মূল্যবোধগুলো ক্ষয়িষ্ণু হয়ে গেছে। আমরা ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’র কথা বলে থাকি কিন্তু বিচারিক আদালতে দ্রুত বিচারে রাকিব, রাজন হত্যার রায় হওয়ার পর একই এলাকায় আমরা শিশুহত্যা হতেও দেখেছি। অনেকেরই ধারণা, এ ধরনের অপরাধে কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না। আসলে সামাজিক দিকগুলোয় নজর দেওয়ার সময় পার হয়ে গেছে কি না, তাও ভেবে দেখা দরকার।

সাত। দেশ যতই আধুনিক হোক বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করুক বা উন্নত বিশ্বের কাতারে নাম লেখানোর স্বপ্ন দেখুক, তাতে ভুক্তভোগী শিশুদের বাবা-মা ও পরিবার এবং এমন আরও অসংখ্য পরিবারের কিছুই আসবে-যাবে না। সভ্যতার কাছে এর থেকে বড় লজ্জা আর কী হতে পারে যেকোনো মূল্যে শিশুদের নির্যাতন ও হত্যা রুখতে হবে। এ ধরনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর পাশাপাশি আরও কঠোর হতে হবে। আমরা শিশু নির্যাতন, খুন, নারী ধর্ষণের আর একটি ঘটনাও দেখতে চাই না। অপরাধীদের বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজসহ সর্বস্তরের মানুষ এগিয়ে আসুক; পাড়া-মহল্লা, গ্রাম-গঞ্জে শিশু ও নারীদের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন রোধে তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলুক এটাই প্রত্যাশা। প্রতিটি ঘটনার দ্রুত বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। অন্যথায় নৈরাজ্য নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না।

লেখক : সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, ঢাকা মহানগর

emonn.habib@gmail.com