ভেসে নয়, শিক্ষার্থীরা স্কুলে যাবে

বিপুল গতিতে দেশ যখন উন্নয়নের মহাসড়কে উঠে পড়ার দাবি করা হয়, ঠিক তখনই এসব উন্নয়ন পরিকল্পনা, প্রকল্প এবং এসবের জন্য ব্যয় করা অর্থের নিদারুণ অপচয়ের খবরও সামনে আসে। হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে সামান্য একটি সংযোগ সড়ক বা ছোট কোনো নদী-নালা-খালের ওপর সেতুর অভাবে একটি জনপদ বিচ্ছিন্ন থেকে যাচ্ছে। ফলে উন্নয়নের সুফলবঞ্চিত জনপদের মানুষ দিনের পর দিন ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। অবকাঠামোগত এই সংকটে কেবল যোগাযোগই নয় তারা অর্থনৈতিকভাবেও পিছিয়ে পড়ছেন। চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো অধিকার থেকেও বঞ্চিত থাকছেন। আবার দেখা গেছে কয়েকশ কোটি টাকার প্রকল্প শেষ হলেও অবকাঠামোটি আসবাবপত্রসহ প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না, ফলে তা নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। কিন্তু কাদের উদাসীনতা ও গাফিলতিতে জনগণের ভোগান্তি ও অর্থের এমন অপচয় ঘটে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটা জানা যায় না। এক যাত্রায় দুই ফলের মতো একদিকে অবকাঠামোর অভাবে বিচ্ছিন্ন ও উন্নয়ন সুবিধাবঞ্চিত হয়ে পড়া, অন্যদিকে উন্নয়নের নামে বিপুল ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোর অব্যবহৃত থাকা। 

বুধবার দেশ রূপান্তরে ‘ভেসে ভেসে স্কুলযাত্রা’ ও ‘অকাজের ২৫০ কোটির ভবন’ শীর্ষক প্রতিবেদন দুটির কথাই ধরা যাক। প্রথম ঘটনাটি পটুয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নের দিয়ারচর ও উত্তর চরমোন্তাজ গ্রামের। দুই গ্রামের মধ্যে প্রায় আড়াইশ ফুট প্রশস্ত এক খাল। দিয়ারচরের শিক্ষার্থীদের ওই খাল পার হয়েই প্রতিদিন যেতে হয় উত্তর চরমোন্তাজের মাঝেরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। খাল পার হওয়ার জন্য কোনো সেতু নেই। নেই খেয়া পারাপারের ব্যবস্থাও। অগত্যা শীত বা বর্ষায় বইখাতার সঙ্গে রান্নার হাঁড়ির মধ্যে বইপুস্তক আর স্কুলের পোশাক নিয়ে শিক্ষার্থীরা স্কুলে যায়। ভেজা জামাকাপড় রোদে শুকাতে দিয়ে স্কুল পোশাক পরে ছোটে ক্লাসে। স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, স্থানীয়দের উদ্যোগে কয়েকবার বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করা হলেও নোনা জলে সেটি বেশিদিন টেকেনি। ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্কুলে সাঁকো থাকাকালে ৩০০-৪০০ শিক্ষার্থী ছিল। এরমধ্যে প্রায় দুইশ শিক্ষার্থী ছিল ওই দুই চরের। সাঁকো না থাকায় এখন দুই চর থেকে ৫০ জনের মতো শিক্ষার্থী আসে। গ্রামীণ জনপদের জনগুরুত্বের বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে হাটবাজার, সামাজিক, অর্থনৈতিক কিংবা সেবামূলক প্রতিষ্ঠানসহ স্কুল, কলেজ ও হাসপাতালে যাওয়ার রাস্তায় সেতু নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে তার কোনো প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি না। এক্ষেত্রে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাসহ এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কেউই দায় এড়াতে পারেন না। আমার আশা করি দ্রুত দুই গ্রামের মধ্যে সেতুর ব্যবস্থা হবে, শিক্ষার্থীরা ভেসে নয়, হেঁটে স্কুলে যাবে। 

অন্যদিকে দ্বিতীয় প্রতিবেদনটিতে দেখা যাচ্ছে সরকারি অর্থের বিপুল অপচয়। জানা যায়, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৭১টি নতুন ভবনের জন্য প্রায় ২৫০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেঞ্চ-টেবিলসহ প্রয়োজনীয় ফার্নিচার দেওয়ার কথা। এরপর ভবনের ব্যবহার শুরু হবে। কিন্তু ভবন নির্মাণ ছয় মাস আগে শেষ হলেও আসবাবপত্র সরবরাহ করা হয়নি। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ৭১টি ভবনে সর্বোচ্চ ২৫ কোটি টাকার আসবাবপত্রের প্রয়োজন হতে পারে। দেখা যাচ্ছে, স্কুলভবন তৈরি হয়ে গেলেও বেঞ্চ, চেয়ার, টেবিলের অভাবে শিক্ষার্থীরা সেখানে ক্লাস করতে পারছে না। ‘সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো উন্নয়ন প্রকল্প’-এর পরিচালক অধ্যাপক মো. নাসির উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রকল্পটি অর্থ মন্ত্রণালয় কর্র্তৃক ‘বি’ ক্যাটাগরির ঘোষিত হওয়ায় খাতওয়ারি অর্থছাড় স্থগিত আছে। চলতি অর্থবছরেও এসব ভবনের আসবাবের জন্য বরাদ্দ নেই। ফলে এসব ভবন রক্ষণাবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।’ অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, অর্থনৈতিক মন্দার জন্য উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর শ্রেণিভাগ করার বিষয়টি বাদ দেওয়া না গেলেও, মূল প্রকল্প ‘এ’ ক্যাটাগরির হলে সেগুলোর আসবাবপত্রসহ অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জাকে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে রাখলে সেই উন্নয়ন তো কোনো কাজে আসবে না। বরং এ ধরনের পরিকল্পনা ঘাটতি সরকারি টাকার অপচয়ের কারণ হবে জনগণ কোনো সুফল পাবে না। কাদের পরিকল্পনা ঘাটতি, উদাসীনতা ও গাফিলতির কারণে সরকারের অর্থের এই অপচয় হচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করা দরকার। এ ধরনের কাজ আগামীতে যাতে না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সাবধান হওয়া উচিত। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আশা করব সরকার এসব বিষয়ে দ্রুত নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। এবং শিক্ষার্থীরা সেতু পার হয়ে স্কুলে গিয়ে নতুন ভবনে বসে ক্লাস করবে।