আন্তর্জাতিক ফ্লিট রিভিউ উদ্বোধন

সংঘাত নয় আমরা সমঝোতায় বিশ্বাসী : প্রধানমন্ত্রী

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সংঘাত নয়, আমরা সমঝোতায় বিশ্বাসী। সেভাবে আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। যুদ্ধে কোনো সমাধান নেই। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তা আমরা দেখেছি। গতকাল বুধবার কক্সবাজার আন্তর্জাতিক ফ্লিট রিভিউ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এই আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ সব সময় বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শান্তিপূর্ণ অবস্থানকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের কাছে প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক সব দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি সংঘাত নয়, সমঝোতা ও আলাপ আলোচনার মাধ্যমে যে কোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব।

সরকারপ্রধান বলেন, যে কোনো যুদ্ধ মানব জাতির জন্য কী ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে আমরা তা নিজেরা দেখেছি। বর্তমান রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহতা, বীভৎসতা আপনারা অবলোকন করতে পারেন, অনুভব করতে পারেন। আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই।

প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে যে বিরোধ ছিল, তা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখেই সমাধান করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারতের সঙ্গে স্থলসীমানা নিয়ে সমস্যা ছিল সেটাও সমাধান করেছি।

ভারতের সঙ্গে ছিটমহল বিনিময়ের বিষয়টি উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘একটি দেশ আরেকটি দেশের সঙ্গে এতটা শান্তিপূর্ণভাবে ভূমি বিনিময় করতে পারে তার একটি বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছি।’ বাংলাদেশ পারে, এটাই আজ প্রমাণিত সত্য।

শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য সামুদ্রিক সম্পদ ও সামুদ্রিক বাণিজ্যরক্ষায় সমুদ্রে নিরাপদ ও সুরক্ষিত পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের সরকার সামুদ্রিক সম্পদের অপার সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করে সামুদ্রিক খাতের উন্নয়নে ব্যাপক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কিন্তু, সমৃদ্ধ অর্থনীতি কেবল তখনই সম্ভব, যখন আমরা সমুদ্রে একটি নিরাপদ এবং সুরক্ষিত পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারব। সে লক্ষ্যে আমরা আমাদের সমুদ্রসম্পদ রক্ষায় পরিকল্পিত সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গুণগত উন্নয়নমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে আমাদের নৌবাহিনীর আধুনিকায়ন করে যাচ্ছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশ পারে, এটাই আজ প্রমাণিত সত্য। আন্তর্জাতিক ফ্লিট রিভিউ ২০২২ এর মূল প্রতিপাদ্যের প্রকৃত অর্থকে প্রতিফলিত করে নীল সমুদ্রে আবদ্ধ জাতিগুলো পরস্পরের কল্যাণে কাজ করবে, এটাই আমি প্রত্যাশা করি। আশা করি, আমাদের সামনের দিনগুলোতে এ ধরনের পেশাদার প্রতিযোগিতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’

গতকাল বেলা ১১টা ২২ মিনিটে নৌবাহিনীসহ সবাইকে স্বাগত জানিয়ে ভাষণ শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নৌমহড়ায় যেসব দেশ যোগদান করেছে, তাদের প্রতিও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন তিনি।

নৌবাহিনীর সদর দপ্তর জানিয়েছে, মহড়ায় বাংলাদেশসহ ২৮ দেশের ৪৩টি যুদ্ধজাহাজ, ২টি বিএন এমপিএ, ৪টি বিএন হেলিকপ্টার অংশ নেয়। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, মিসর, নাইজেরিয়া, সুদান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, তিমুর থেকে নৌ প্রতিনিধিরা অংশ নেন। মহড়ায় ইরান, ওমান, ফিলিস্তিন ও সৌদি আরবের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক অঙ্গনে সামুদ্রিক সহযোগিতা বৃদ্ধিকল্পে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীসমূহ ইন্টারন্যাশনাল ফ্লিট রিভিউ আয়োজন করে। বন্ধুপ্রতিম দেশের নৌবাহিনীর অংশগ্রহণে আন্তর্জাতিক ফ্লিট রিভিউর আয়োজন বিশ্বশান্তি ও পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহমর্মিতার বহিঃপ্রকাশ। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ও সার্বিক সহযোগিতায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী ইতিমধ্যে পেশাদার ত্রিমাত্রিক নৌবাহিনী হিসেবে বিশ্বে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ নৌবাহিনী আয়োজিত এই ইন্টারন্যাশনাল ফ্লিট রিভিউ ২০২২ একটি যুগোপযোগী উদ্যোগ।

আইএফআর ২০২২ অনুষ্ঠান বিশ্বের বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক এবং পারস্পরিক সহযোগিতা উন্নয়নের পথকে আরও সুগম করবে বলে আশা করা যায়। সর্বোপরি, আইএফআর ২০২২-এর এই বিশাল আয়োজন কক্সবাজারকে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে নতুনভাবে উপস্থাপন করবে, যা বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রসঙ্গত, এর আগে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ২০১৭ সালের নভেম্বরে কক্সবাজারে ইন্ডিয়ান ওশান নেভাল সিম্পোজিয়াম বহুপক্ষীয় মেরিটাইম অনুসন্ধান ও উদ্ধার মহড়ার আয়োজন করেছিল। এরপর গত ১২-১৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর যৌথ ব্যবস্থাপনায় ঢাকা ও কক্সবাজারে ৪৬তম ইন্দো-প্যাসিফিক আর্মিস ম্যানেজমেন্ট সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।