গেরো ভাঙার চ্যালেঞ্জ ব্রাজিলের

২০০২ কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপ জয়ের পর টানা দুই আসরে কোয়ার্টার ফাইনালে থেমে যাওয়া। ২০১৪-তে ঘরের মাঠে সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের লজ্জা। পরের আসরে বেলজিয়ামের কাছে ২-১ গোলে হেরে আবারও শেষ আট থেকে বিদায়ের পরিণতি। এভাবেই কেটে গেছে কুড়িটি বছর। বারবার মাঝপথেই থেমে গেছে হেক্সা মিশন। সর্বোচ্চ পাঁচবারের বিশ্বকাপ জেতা ব্রাজিলের একটা প্রজন্ম জানে না বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মাহাত্ম্য। এবারও কি সেই দুর্ভাগ্যই বরণ করতে হবে? আবারও কি কোয়ার্টার ফাইনালে থেমে যাবে সাম্বার ছন্দ? এডুকেশন সিটি স্টেডিয়ামে বিষাদের রঙ কি নেবে হলুদ বরণ? নাকি আরেকবার বিস্ফোরিত হয়ে সেলেসাওরা ক্রোয়েশিয়াকে বিদায়ের পথ দেখিয়ে সদর্পে পা রাখবে সেমিফাইনালের মঞ্চে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আজ গ্যালারির বেশিরভাগই থাকবে ব্রাজিলিয়ানদের দখলে।

মরুর বিশ্বকাপে এই দিনটা বড্ড অস্বস্তির দক্ষিণ আমেরিকানদের জন্য। একই দিনে আলাদা আলাদা পরীক্ষায় নামতে হচ্ছে ওই অঞ্চলের দুই পরাশক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে। একই ধাপে, একই স্বপ্ন বুনে। আজ তাই মেট্রোতে, পথে-ঘাটে একে অপরকে ক্ষেপানোর ফুরসত নেই দুই চিরবৈরীর সমর্থকদের। সবার মধ্যেই একটা চাপা আতঙ্ক। এবারও যদি না হয়? দুনিয়াজুড়ে কোটি সমর্থকের এই আতঙ্কটা দুই শিবিরে ভর করলেই সর্বনাশ। ব্রাজিলের অবশ্য অতটা দুশ্চিন্তা হওয়ার কথা নয়। গেল আসরের রানার্সআপ হলেও ক্রোয়াটরা বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিলকে কখনই খুব বেশি বিপদে ফেলতে পারেনি। দু’বারই তাদের দেখা হয়েছিল গ্রুপ পর্বে। ২০০৬ ও ২০১৪ বিশ্বকাপে দু’বারই ব্রাজিল জিতেছে সহজেই। শেষবার জয়ের ব্যবধানটাও ছিল ৩-১। যে জয়ে জোড়া গোল করেছিলেন নেইমার। সব মিলিয়ে চারবার মুখোমুখি হয়েছে দু’দল। ২০০৫ সালে প্রথম ম্যাচটা ড্র হওয়ার পর বাকি তিনবার জিতেছে ব্রাজিল। সর্বশেষ সাক্ষাৎটা হয়েছিল গত বিশ্বকাপের আগে। অ্যানফিল্ডে সেই ম্যাচটাও ব্রাজিল জিতে নেয় ২-০ গোলে। সে ম্যাচেও নকআউটের গেরো ভাঙার চ্যালেঞ্জ ব্রাজিলের গোলের দেখা পেয়েছিলেন পিএসজি তারকা নেইমার। তাতে বোঝাই যাচ্ছে ক্রোয়াটরা নেইমারের প্রিয় প্রতিপক্ষ। ক্রোয়াটদের পোড়াতে আজও  কি অসামান্য রূপে দেখা দেবেন নেইমার?

গ্রুপের দুটি ম্যাচ চোটের কারণে খেলতে পারেননি। দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে কোরিয়ার বিপক্ষে গোল করেন পেনাল্টি থেকে। তবে ঠিক স্বরূপে দেখা যায়নি ৩০ বছরের তারকাকে। প্রতিপক্ষ পেয়ে নেইমার বিস্ফোরিত হলে পুরো দলই জেগে উঠবে, এমন বিশ্বাস সমর্থকদের। যদিও কাল সংবাদ সম্মেলনে তিতেকে নেইমারকে নিয়ে সেভাবে প্রশ্নের জবাব দিতে হয়নি। বরং প্রফেসরকে বড় পরীক্ষার আগে বেশ ফুরফুরে মনে হয়েছে। কোরিয়াকে ৪-১-এ উড়িয়ে দেওয়া ম্যাচে গোলের উদযাপনে শিষ্যদের পাশাপাশি নিজেও নেচে উঠেছিলেন কবুতরের ছন্দে। এই উদযাপন বারবারই হবে, জানিয়ে তিতে বলেন ‘যারা ব্রাজিলের ইতিহাস, সংস্কৃতি, জীবনাচার সম্পর্কে জানে না তাদের সম্পর্কে কিছু বলতে চাই না। আমি আমার সংস্কৃতিকে সম্মান করি। তাই উদযাপনটা চলতেই থাকবে। নাচ হবেই। কারণ এটা আমাদের সংস্কৃতির অংশ।’

প্রতিপক্ষ ক্রোয়েশিয়ার মানসিকতা নিয়েও কথা বলেছেন ব্রাজিল বস, ‘দলটিতে কৌশলী অনেক খেলোয়াড় আছে। তারা দল হিসেবেও বেশ কৌশলী। আমি অবশ্য মনোযোগ দিচ্ছি নিজেদের দিকেই। শেষ ম্যাচে যেভাবে দল খেলেছে, সেটাই দেখতে চাই। প্রতিপক্ষ অবশ্যই কঠিন, তবে আমরা চেষ্টা করব নিজেদের খেলার পুনরাবৃত্তি করতে। মাঠেই প্রমাণিত হবে, কে সেরা।’

ক্রোয়াটদের জন্য এই ম্যাচে বড় চ্যালেঞ্জ কোরিয়ার ম্যাচে ভয়ংকর হয়ে ওঠা ব্রাজিলিয়ান আক্রমণভাগকে রুখে দেওয়া। সে জন্য তাদের মূল শক্তি মিডফিল্ড থেকেই ঘর সামলানোর কাজটা শুরু করতে হবে। ক্রোয়েশিয়া নামের সঙ্গে টাইব্রেকার শব্দটা জড়িয়ে গেছে গত আসর থেকেই। রাশিয়ায় তারা পরপর দুই ম্যাচ জিতেছিল টাইব্রেকারের ভাগ্য পরীক্ষায়। এবার দ্বিতীয় পর্বেও তাদের জাপানকে হারাতে হয়েছে টাইব্রেকারে। সে ম্যাচে তাদের গোলকিপার ডমিনিক লিভাকোভিচ তিনটি শট ঠেকিয়ে নায়ক হয়েছিলেন। ব্রাজিলকে রুখতে হয়তো আজও সেই ভাগ্য পরীক্ষা পর্যন্ত ম্যাচটা টেনে নিয়ে যেতে চাইবে জøাতকো দালিচের দল। সেই ২০১৭ সাল থেকে ক্রোয়াটদের দায়িত্ব পালন করা কোচ অবশ্য সরাসরি সেই ইচ্ছের কথা প্রকাশ করেননি, ‘কেউই চায় না টাইব্রেকারে ম্যাচের ভাগ্যটা নিয়ে যেতে। ব্রাজিলের ফরোয়ার্ডরা দারুণ ছন্দে আছে। তারাও চাইবে নির্ধারিত সময়েই ম্যাচটা শেষ করতে। আমরাও তাই চাইব। তবে যদি সেটা টাইব্রেকারে যায়, তার জন্য আমরা প্রস্তুত।’

এই ম্যাচের আগেও লেফটব্যাক অ্যালেক্স সান্দ্রোকে পাওয়া নিয়ে সংশয় আছে ব্রাজিলের। কাল রাতে শেষ অনুশীলনের পরই তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন তিতে। খানিকটা সংশয়ের কথা কোচ জানিয়েছেন নেইমারকে নিয়েও। সদ্য চোট থেকে ফেরা পিএসজি তারকার সেরা একাদশে থাকা নির্ভর করছে কাল রাতের অনুশীলনের ওপর।

তবে নেইমারও নিশ্চয় চাইবেন না এমন একটা ম্যাচে বেঞ্চে বসে থাকতে। তার উপস্থিতিতে সতীর্থরা কীভাবে উজ্জীবিত হয়, কীভাবে গোলের পসরা সাজায়, তা তো আগের ম্যাচেই দেখা গেছে। ক্রোয়াটদের বিপক্ষে না হারার রেকর্ডটি টিকিয়ে রাখতে, নিজেদের হেক্সা মিশন বাঁচিয়ে রাখতে এবং অবশ্যই পেলের ৭৭ গোলের রেকর্ড ছুঁতে নেইমার একটা মুহূর্তও নিশ্চয় চাইবেন না নষ্ট করতে। কারণ তিনি হাসলে, সেই হাসি যে ছড়িয়ে পড়ে সবার মাঝে।