‘প্রিয় লিও, দেড় যুগ ধরে প্রতি সপ্তাহে যেভাবে বিনোদন দিয়েছ জাদুকরী ফুটবলে, তার ঋণ শোধাবার নয়। তুমি আছো বলেই আমরা স্বপ্ন দেখি। তুমি আছো বলেই বিশ্বাস করি, আবার আমরা বিশ্বসেরা হব। তুমি আছো বলেই...’
মেসিকে নিয়ে গাওয়া অনেক গানের একটি স্প্যানিশ ভাষায় গুনগুন করছিলেন বুয়েনস আয়ার্স থেকে বিশ্বকাপ দেখতে আসা ষাট বছরের লুকা ম্যাথিউস। মেট্রোতে পাশে বসে তার কাছ থেকেই তর্জমাটা জেনে নেওয়া। সেটা জানার পর জানতে চাওয়া, ‘বিশ্বসেরা হতে হলে তো আরও তিন ম্যাচ জিততে হবে এবং প্রতিবারই মেসিকে দেখাতে হবে জাদু। তারও আগে কাল (আজ) পেরুতে হবে নেদারল্যান্ডস বাধা?’ ম্যাথিউস প্রশ্নটা শুনেই বাহুতে আঁকা ম্যারাডোনা ও মেসির ট্যাটু দেখিয়ে বললেন, ‘এটা এখানে আসার আগে করিয়েছি। দেখে নিও, ম্যারাডোনা ১৯৮৬তে যেটা করেছে, সেটা এবার মেসি করে দেখাবে। কারণ ওর সঙ্গে ঈশ্বর আছেন।’
মেসিতে এমনই অন্ধ বিশ্বাস হাজারো আর্জেন্টাইনের। সাদা-আকাশিদের ত্রাতা হয়ে আরেকবার আবির্ভূত হবেন, ডাচ পরীক্ষার আগে এমনটাই প্রার্থনা। এই বিশ্বকাপেই আর্জেন্টিনার অতিমাত্রায় মেসি নির্ভরতার প্রমাণ মিলেছে বারবার। আবার এটাও সত্য, নিজে জ্বলে উঠে সতীর্থদের ভেতর থেকেও আগুনটা বের করে এনেছেন অধিনায়ক।
তাই তো আর্জেন্টিনা এখন অনেক প্রত্যয়ী। এমনকি ডাচ কোচ-খেলোয়াড়দের হুমকি আর অতীতের অস্বস্তি টলাতে পারছে না তাদের। এটাই যে আর্জেন্টাইন ফুটবলের বরপুত্র মেসির বিশ্বকাপ জয়ের শেষ সুযোগ! এই অভিযান এখানেই থেমে গেলে কি হয়?
রূপকথার রাজ্য থেকে ডাচদের বারবার বাস্তবে টেনে নামাতে জুড়ি নেই আর্জেন্টিনার। ১৯৭৮ বিশ্বকাপের ফাইনালের আগে জয়ের পাল্লা হেলে ছিল নেদারল্যান্ডসের দিকে। তবে মাঠের লড়াইয়ে জিতে প্রথম বিশ্বকাপের স্বাদ পায় আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত ৯০ মিনিট ১-১ অমীমাংসিত থাকা ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে ২ গোল করে উল্লাসে মেতেছিল আলবিসেলেস্তারা। এরপর বিশ্বকাপ মঞ্চে দেখা হয়েছে আরও তিনবার। ১৯৯৮ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে সেই হারের প্রতিশোধ নেয় নেদারল্যান্ডস। ২০০৬-এ গ্রুপ পর্বের ম্যাচটা গোলশূন্য থাকার পর শেষবারের দেখা ২০১৪’র সেমিফাইনালে। শিহরণ জাগানিয়া ম্যাচে ডাচদের টাইব্রেকারে কাঁদিয়ে ফাইনালের মঞ্চে পা রাখে আর্জেন্টিনা। আজ আরেকবার দু’দলের মোকাবিলা হচ্ছে নকআউট পর্বে। তো আরেকটি রোমাঞ্চকর ম্যাচের প্রত্যাশা করাই যায় লুসাইল আইকনিক স্টেডিয়ামে।
গ্রুপ পর্ব থেকে নকআউট পর্বে আসা দলগুলোর মধ্যে মাত্র তিনটির হারের রেকর্ড ছিল না। তাদের অন্যতম নেদারল্যান্ডস। সেনেগালকে ২-১ গোলে হারিয়ে শুরু। ইকুয়েডরের সঙ্গে ড্রয়ের পর এ গ্রুপের সেরা হয় স্বাগতিক কাতারকে হারিয়ে। দ্বিতীয় পর্বে যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো সুযোগ না দিয়ে মেম্পিস ডিপে, ভার্জিল ফন ডাইকরা চলে আসে কোয়ার্টার ফাইনালে। একঝাঁক তারকা নিয়ে এবার বিশ্বকাপ অভিযানে এসেছেন লুই ফন গাল। আট বছর আগে সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারে হারের প্রতিশোধের কথা আগেই বলেছেন অভিজ্ঞ কোচ। সেই সঙ্গে মেসিকে অকার্যকর করে রাখার কথাও বলেছেন। ম্যাচের ঝাঁজটা তাই আগেভাগেই আঁচ করা যাচ্ছে। আর্জেন্টাইন বস লিওনেল স্কালোনিকে তাই অনেক বেশি কৌশলী হতে হচ্ছে এই ম্যাচে। ডাগআউটে তার প্রতিপক্ষের অভিজ্ঞতাকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই ৪৪ বছরের স্কালোনির। তাই তো ফন গালের মেসিকে নিয়ে কথাগুলো উড়িয়ে না দিয়ে নিজেদের আরও বেশি সতর্ক থাকার কথা বলেছেন, ‘মেসি এমন একজন খেলোয়াড়, যাকে নিয়ে প্রতিপক্ষ সব দলই বিশেষ পরিকল্পনা রাখে। তবে পুরো ক্যারিয়ার জুড়েই মেসি সেসব পরিকল্পনাকে ভুল প্রমাণ করে এসেছে। তবে মাঠে কী হবে তা আগে থেকে বলা যাবে না। সবসময়ই পরিকল্পনার পরিবর্তন আসতে পারে। হয়তো মুখে একটা কথা বলা হলো, সেটা মাঠে বাস্তবায়িত হলো না। তবে সবচেয়ে ইতিবাচক হলো, আমাদের নিয়ে প্রতিপক্ষরা সবসময়ই একটু বাড়তি পরিকল্পনা করে। আর সেটা মেসির কারণেই।’ ডাচ কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুইফের টোটাল ফুটবলের মেথডই ছিল একটা দল হয়ে খেলা। পরিস্থিতি অনুযায়ী সবাইকে আক্রমণে ওঠা, আবার ঘর সামলাতে রক্ষণে যোগ দেওয়া। সেই ধারণাকেই বয়ে চলা ফন গালের দলকে সহজ ভাবার সুযোগ নেই স্কালোনির, ‘নেদারল্যান্ডস খুবই ব্যালেন্সড দল যাদের সবাই ডিফেন্ডার, আবার সবাই অ্যাটাকার। তাই কাল একটা অসাধারণ ম্যাচ হবে কারণ দুটি দলই ঘর সামলে প্রতিপক্ষের রক্ষণে হামলে পড়ার কৌশলে খেলার চেষ্টা করবে।’ মহারণে স্কালোনি মাঝমাঠের মূল অস্ত্র রদ্রিগো ডি পলকে পাচ্ছেন না, এমন একটা গুঞ্জনকে উড়িয়ে দিয়ে স্কালোনি দাবি করেছেন ‘ডি পল ও ডি মারিয়া দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছে। তাদের খেলার বিষয়টি নির্ভর করছে আজ (গতকাল) রাতের অনুশীলনের ওপর। এর আগে কারও সম্পর্কে কোনো কিছু বলা ঠিক নয়।’ ডাচ কোচ ফন গালের মেসিকে অকার্যকর করে রাখার দাবিটা একেবারে অযৌক্তিক নয়। আট বছর আগে সেই সেমিফাইনালে মেসিকে জ্বলে উঠতে দেননি নানা কৌশলে। যদিও শেষ রক্ষা হয়নি বলেই সাও পাওলোর ওই রাতটা ভুলতে পারেননি।
তবে লুসাইলের রাতটা তার শিষ্যদের হোক, এটাই মনেপ্রাণে চাওয়া ফন গালের। তবে রাতটা মেসি এবং আর্জেন্টিনার হোক, এমন চাওয়ার সংখ্যাটা সারা দুনিয়ায় কোটি কোটি মানুষের। মেসিকে যে সত্যিকারের শতাব্দীর সেরা হতে জিততে হবে মরুর বিশ্বকাপ। নইলে যে তাকেও যোগ দিতে হবে ইউসেবিও, ক্রুইফদের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে না পারা নায়কদের তালিকায়।