ফুটবলার থেকে যুদ্ধের নায়ক

ব্রিটিশ ফুটবলের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় ওয়াল্টার টাল। ছিলেন একজন ট্রেলব্লেজার। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ অফিসার হন।  যুদ্ধক্ষেত্রে শ্বেতাঙ্গ এক ব্যাটালিয়নের নেতৃত্ব দিয়ে প্রাণ বিসর্জনও  দেন। কিংবদন্তি এই খেলোয়াড়-যোদ্ধার আত্মত্যাগ ইতিহাসে মর্যাদার আসন পেয়েছে কি। লিখেছেন নাসরিন শওকত

এ-বছরের শুরুর দিকে। স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে রেঞ্জার্স আইবক্স স্টেডিয়ামে মৌসুমের প্রথম বন্ধুত্বপূর্ণ খেলার আয়োজন করা হয়। যেখানে সমবেত হয়েছিল ৪৩ হাজার দর্শক। খেলাটি ছিল টটেনহ্যাম হটস্পার ও রেঞ্জার্সের মধ্যে। একশো বছর আগে মারা যাওয়া এক ফুটবলারের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আয়োজন এ খেলার। কিংবদন্তি ওই ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন ওয়াল্টার ড্যানিয়েল জন  টাল। যিনি প্রথম বিশ^যুদ্ধের সময় ছিলেন একজন পেশাদার ফুটবলার ও সৈনিক। কিন্তু যুদ্ধের সেই ডামাডোলে ফুটবল ছেড়ে হাতে তুলে নেন বন্দুক। যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে ব্রিটিশ সেনাদের নেতৃত্ব দেন। আর এর মধ্য দিয়ে শ্বেতাঙ্গ সেনাদের দলনেতা হিসেবে অর্জন করেন প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ কর্মকর্তার স্বীকৃতি। ওয়াল্টার টালের জীবনীকার ফিল ভাসিলির মতে, ওয়াল্টার টালের জীবন ছিল বিস্ময়কর ‘যেন একটি ‘টেস্টামেন্ট’। তার সংকল্প ছিল পাহাড়সম। যে বিশ্বে তিনি বাস করতেন, সেখানকার সেইসব মানুষ ও সেইসব বাধাকে মোকাবিলা করতে চেয়েছিলেন দৃঢ়তার সঙ্গে, যারা তাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে চেয়েছিল একসময়।’

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও ফুটবল

১৯১৪-এর ১৪ আগস্ট। ১১৮ বছর আগের এই দিনে প্রথম বিশ^যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তখন আশা করা হয়, ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও (এফএ) ক্রিকেট-এর উদাহরণ অনুসরণ করে দ্রুত সব খেলা বাতিল করবে। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং বিরোধিতা সত্ত্বেও টানা এক বছর পর্যন্ত ১৯১৪ থেকে ১৯১৫ মৌসুমজুড়ে খেলা হয়েছিল ফুটবল লিগের ম্যাচগুলো। তখন স্বাভাবিক ছন্দেই অনুষ্ঠিত হতে থাকে এফএ কাপ। যুদ্ধের স্মরণে সে সময় ফুটবল লিগ তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছিল ঠিকই। কিন্তু ক্লাবগুলোকে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের অনুমতি দেয়। তখন পেশাদার ফুটবলের ধারবাহিকতা নিয়ে বেশিরভাগ বিরোধিতার সৃষ্টি হয়েছিল একটি উদ্বেগকে কেন্দ্র করে। আর সেটা হলো, বেশির ভাগ পুরুষই যুদ্ধে যোগ দেওয়ার পরিবর্তে ফুটবল খেলতে ও দেখতে পছন্দ করছিলেন। আর তাই ফুটবলকে তখন যুদ্ধের সেনা নিয়োগের একটি প্রয়োজনীয় হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়েছিল। শত্রু ও মিত্র উভয় পক্ষের বিনোদনের জন্য ফুটবল ছিল একটি জনপ্রিয় মাধ্যমও, যা মনোবল বাড়াতে পারে।

১৯১৬-এর ১ জুলাই। ক্যাপ্টেন ‘বিলি’ নেভিল ইস্ট সারে রেজিমেন্টের সব সেনাকে জোরেশোরে ফুটবল খেলতে উৎসাহিত করেছিলেন। সম্ভবত শত্রুপক্ষের দুর্বল তরুণ সেনাদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য তার। কিন্তু তখন ব্রিটিশদের একটি সেনা সমাবেশের খবর ব্যাপক প্রচারণা পায়। দেশটির অসংখ্য পেশাদার ফুটবল খেলোয়াড় তখন  সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। আর সেই যুদ্ধে যারা নিহত হন, তাদের মধ্যে ছিলেন টটেনহ্যাম হটস্পার সাবেক খেলোয়াড় ওয়াল্টার টাল। আর ব্রাডফোর্ড পার্ক এভিনিউয়ের ডোনাল্ড বেল। শুধুমাত্র এই দুই পেশাদার ফুটবলারই ভিক্টোরিয়া ক্রস পুরস্কার পেয়েছিলেন।

ফোকস্টোনের বিস্ময়

যুক্তরাজ্যের দেশ ইংল্যান্ড। ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্বের প্রশাসনিক ও ঐতিহাসিক কাউন্টি কেন্ট। দক্ষিণ ইংল্যান্ড ও উত্তর ফ্রান্সকে বিচ্ছিন্ন করে কেন্টের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে ইংলিশ চ্যানেল। কেন্টের একটি জেলা শিপওয়ে, যার বন্দর শহর ফোকস্টোন। এদিকে পূর্ব ইংল্যান্ডে রয়েছে চুনাপাথরের পাহাড়ের পর্বত নর্থ ডাউনস। যা কেন্ট কাউন্টির ডোভার জেলার হোয়াইট ক্লিফস থেকে সারির ফার্নহাম পর্যন্ত বিস্তৃত। নর্থ ডাউনসের দক্ষিণ প্রান্তের দুটি পাহাড়ের মাঝখানের একটি উপত্যকার অপরূপ উপকূল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ফোকস্টোন শহরটি। ১৯২৯ সালে স্থানীয় বাসিন্দারা একটি বন্দর তৈরির লাইন্সেস পায়। তার আগ পর্যন্ত ফোকস্টোন ডোভার বন্দরের একটি অংশ ছিল। রেলযুগের শুরু থেকে ফোকস্টোন ইংলিশ চ্যানেলজুড়ে যাত্রীবাহী বন্দর ও উচ্চ শ্রেণির সমুদ্র তীরবর্তী অবকাশ যাপন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল।

উপকূলীয় শহর ফোকস্টোনে ১৮৮৮ সালে জন্ম নেন ওয়াল্টার টাল। মিশ্রবর্ণ পরিবারের সন্তান তিনি। তার বাবা ড্যানিয়েল টাল কৃষ্ণাঙ্গ অভিবাসী। আর মা এলিস এলিজাবেথ পামার ফোকস্টোনের স্থানীয় শে^তাঙ্গ।  ছুতার মিস্ত্রি ড্যানিয়েল বারবাডোস থেকে আসেন ইংল্যান্ডে। ড্যানিয়েলের বাবা-মা একসময় ছিলেন ক্রীতদাস। ড্যানিয়েল এলিসের পর আরও এক নারীকে বিয়ে করেন। তাদের দুজনের ছয় সন্তান ছিল। ওয়াল্টারের বয়স যখন ৯, তখন তারা বাবা-মা দুজনেই মারা যান। এরপর ১৮৯৭ সালে ওয়াল্টারের সৎমা তাকে ও তার বড় ভাই অ্যাডওয়ার্ডকে এতিমখানায় পাঠিয়ে দেন। পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রিন এতিমখানায় দুই ভাইয়ের কাটতে থাকে জীবন।

তারকা ফুটবলার

অল্প বয়স থেকেই ওয়াল্টার ফুটবলের প্রতি তার অনুরাগ আবিষ্কার করেন। গ্রামীণ জীবনে অভ্যস্ত ওয়াল্টারের কাছে অচেনা লাগে পূর্ব লন্ডন। ব্যস্ত ও কোলাহলপূর্ণ শহরটি ছিল তাদের খামার থেকে একেবারেই আলাদা। এরই মধ্যে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো থেকে এক পরিবার এসে অ্যাডওয়ার্ডকে দত্তক নিয়ে যায়। ফলে বেথনাল গ্রিনে একেবারে একা হয়ে যান ওয়াল্টার। এই এতিমখানাতেই ফুটবলের হাতেখড়ি হয় তার। বেথনাল গ্রিনে থাকার সময়ই ওয়াল্টার ফুটবল ও ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলাধুলা করতেন। তবে ফুটবল দলে খেলে নিজের একাকিত্বের মধ্যে সান্ত¡না খুঁজে পেতে চেয়েছেন তখন। এভাবেই খেলতে গিয়ে একদিন ওয়াল্টারের ফুটবল দক্ষতা স্থানীয় অপেশাদার দল ক্ল্যাপটন এফসি’র নজর কাড়ে। ১৯০৮ সালের অক্টোবর। ওয়াল্টার ক্ল্যাপটন এফসি দলে যোগ দেন। শুরু হয় তার পেশাদার ফুটবল খেলোয়াড়ের জীবন। সেখানে খুব দ্রুততার সঙ্গে স্টার ফুটবলার হিসেবে নিজের জায়গাও করে নেন। ওই বছরই ওয়াল্টারের নেতৃত্বে ক্ল্যাপটন এফসি এফএ অ্যামেচার কাপ, লন্ডন কাউন্টি অ্যামেচার কাপ ও লন্ডন সিনিয়র কাপ জেতে। তখন লন্ডনের একটি জার্নাল তাকে ফুটবল স্টার হিসেবে আখ্যা দিয়ে ‘মৌসুমের সেরা আকর্ষণ’ বলে উল্লেখ করে। এর পর পরই ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ক্লাবের আমন্ত্রন পায় ওয়াল্টার। টটেনহ্যাম হটস্পার। ১৯০৯ সালের গ্রীষ্মে ওয়াল্টার টটেনহ্যাম হটস্পারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। ফুটবলার ওয়াল্টারকে এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি কখনো। দলে তিনিই ছিলেন একমাত্র মিশ্র-জাতিগত ঐতিহ্যের তৃতীয় খেলোয়াড়। যিনি ইংলিশ ফুটবলের শীর্ষ স্তর ফার্স্ট ডিভিশনে পৌঁছান চোখের পলকেই। মাঠে ভেতরে ফরোয়ার্ডে খেলতেন ওয়াল্টার। টটেনহ্যামের হয়ে তার প্রথম দুটি খেলা ছিল সাউদারল্যান্ড ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে। উত্তর লন্ডনে খুব অল্প সময় ছিলেন ওয়াল্টার। তখন ১০ ম্যাচে ২টি গোল করেছিলেন। আর এর মধ্য দিয়েই  ‘হটস্পারের সবচেয়ে মেধাবী ফরোয়ার্ড ফুটবল স্টার হিসেবে সবাই ডাকা শুরু করেন তাকে। পরিষ্কার মাথা ও খেলার অনন্য কৌশলের জন্য শে^তাঙ্গ ফুটবল খেলোয়াড়দের কাছে দ্রুত মডেল হয়ে ওঠেন ওয়াল্টার।’

ব্রিটেনের শাসন ক্ষমতায় তখন অ্যাডওয়ার্ড। দেশটির মোট জনসংখ্যার মাত্র ০.০৪ শতাংশ জনগোষ্ঠী ছিল

কৃষ্ণাঙ্গ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তখন দলে বর্ণবৈষ্যমের শিকার হন ওয়াল্টার। ১৯০৯ সালের এক খেলায় বৈষ্যমের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন ব্রিস্টল সিটির সঙ্গে চলছিল খেলা। যেখানে ওয়াল্টাকে অকথ্য আক্রমন করা হয়। স্টার ফুটবলার ওয়াল্টার তখন রিপোর্ট করেছিলেন, ‘দর্শকদের ভিড়ের একটি অংশ থেকে তাকে কাপুরুষোচিতভাবে আক্রমণ করা হয়েছিল। সেখানে খেলোয়াড় বিলিংসগেটও ছিলেন। কিন্তু তার চেয়ে ওয়াল্টারকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেন ওই দর্শকরা।’ ওয়াল্টারের বিরুদ্ধে তারা তখন এমন একটি অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করেছিল, যা কয়েক শতাব্দী আগে লন্ডনের মাছের বাজারে বলা হতো।

এরপর বড় ধাক্কা আসে খোদ ক্লাবের পক্ষ থেকে। ওয়াল্টারকে দলের অতিরিক্ত খেলোয়াড় হিসেবে বসিয়ে দিয়ে ওই বিতর্কের জবাব দেয় টটেনহ্যাম। তবে বিষয়টি তখন স্পষ্ট ছিল না যে, সিদ্ধান্তটি তারা ওয়াল্টারের সুরক্ষার জন্য নিয়েছিল নাকি বর্ণবাদী জনতাকে তুষ্ট করার জন্য। সেখানে ওই অমানবিক নির্যাতন দুই বছর ধরে সইতে হয়েছিল ওয়াল্টারকে। যতক্ষণ পর্যন্ত না নর্থহ্যাম্পটন টাউন তাকে চুক্তিবদ্ধ করে। সাউদার্ন ফুটবল লিগের ওই দলটির সঙ্গে ১৯১১-এর অক্টোবরে চুক্তি সই করেন ওয়াল্টার। তার ওই দুর্দিনে তখন এগিয়ে এসেছিলেন নর্থহ্যাম্পটন টাউন দলের ম্যানেজার হার্বাট চ্যাপম্যান। তিনিই ওয়াল্টারকে দলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তখন। ম্যানেজার হিসেবে হারবার্টের নেতৃত্বে নর্থহ্যাম্পটন টাউন দল ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে বিখ্যাত হাডার্সফ্লিড টাউন ও আর্সেনালের বিপক্ষে খেলে এবং জিতে নেয় চারটি ফার্স্ট ডিভিশন খেতাব। যা পরে ইংলিশ ফুটবল লিগের ইতিহাসে হার্বাটকে শ্রেষ্ঠ ম্যানেজারদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠা এনে দেয়। ওয়াল্টার নর্থহ্যাম্পটন দলের হয়ে সে সময় ১১১টি খেলা খেলেছিলেন। এরই মধ্যে ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ^যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এ বছরের গ্রীষ্ম থেকে ওয়াল্টারের পেশাদার ফুটবলে সাময়িক ইতি ঘটে। 

ফুটবল মাঠ থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে

যুদ্ধের সময়ও ওয়াল্টারের ক্যারিয়ার বেশ সফল ছিল। ১৯১৪ সালের ডিসেম্বরে তাকে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর মিডলসেক্স রেজিমেন্টে ১৭তম  ব্যাটালিয়নে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যে ব্যাটালিয়ন ফুটবলারদের ব্যাটালিয়ন হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯১৫ এর বসন্ত পর্যন্ত ওই ব্যাটালিয়নে ২শ’ পেশাদার ফুটবলার যোগ দেন। এই খেলেয়াড়রা তখন ক্লাবকর্মী, অপেশাদার খেলোয়াড় এমনকি ভক্ত হিসেবেও যোগ দিয়েছিলেন। ওই বছরের নভেম্বরে ওয়াল্টার ফ্রান্সে যান। এদিকে ১৯১৬ সালের শেষের দিকে এসে সোমের যুদ্ধে লড়াই করেন তিনি। চার মাসের ওই যুদ্ধে কমপক্ষে ১০ লাখ সেনা নিহত বা আহত হয়েছিলেন। এর মধ্য থেকে একা ব্রিটিশ বাহিনীরই আনুমানিক ৪ লাখ ২০ সেনা হতাহতের শিকার হন। যাদের মধ্যে আবার ১ লাখ ২৫ হাজার নিহত ছিলেন। ভয়ংকর ওই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রাণে বেঁচে গেলেও ওয়াল্টারকে ‘শেল আতঙ্ক’ তাড়িয়ে বেড়াতে থাকে। এবার মাতৃভূমি ইংল্যান্ডে ফিরতে আকুল হয়ে ওঠেন ওয়াল্টার।

এরই মধ্যে সোমের যুদ্ধে ওয়াল্টারের নেতৃত্ব জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অভিভূত করে। তাই ফ্রান্স থেকে ফেরার আগেই তাকে স্কটল্যান্ডের গেইলসের ক্যাডেট প্রশিক্ষণ স্কুলে পাঠানো হয় অফিসার হিসেবে। সামরিক স্কুলটিতে তখন ‘নিগ্রো বা কালো বর্ণের’ কাউকে কমিশন দেওয়া নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু ওয়াল্টারের বেলায় সেই নিয়ম লঙ্ঘন করেছিল ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী। তাদের লক্ষ্য ছিল যুদ্ধে ওয়াল্টারের মেধাকে সবচেয়ে বেশি কাজে লাগানো। তিনি ছিলেন সে সময়ের একমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ অফিসার। ওয়াল্টার যখন স্কটল্যান্ডে ছিলেন তখন রেঞ্জার্স তাকে চুক্তিবদ্ধ করেছিল। চুক্তির শর্ত ছিল, যুদ্ধ শেষে তাদের হয়ে খেলতে হবে ওয়াল্টারকে। ১৯১৭ এর মে মাসে তিনি সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে পদোন্নতি পান।

মহান যোদ্ধার আত্মত্যাগ

ওই বছরের নভেম্বর থেকে ১৯৮১-এর মার্চ পর্যন্ত ওয়াল্টারকে ইতালির যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করতে হয়েছিল। তখন পিয়াভ নদীর যুদ্ধ চলছিল, যেখানে তিনি ২৬ সেনার একটি দলকে নেতৃত্ব দেন। রাতের আঁধারের ওই অভিযানে নদী পার হয়ে উত্তর ইতালির শত্রু শিবিরে  ঢুকে পড়েন তারা। ভারী বোমাবর্ষণের মধ্যেও কোনো হতাহতের ঘটনা ছাড়াই নিজেদের শিবিরে ফিরে আসেন ওয়াল্টার ও তার দল। ওয়াল্টারের জীবনীকার ভাসিল বলেন, ‘‘নিজের দায়িত্বকে একনিষ্ঠভাবে পালনের মধ্য দিয়ে তিনি আর্মি কাউন্সিলের বরাবরের রীতিকেই যেন উপহাস করেছেন। যে রীতি অনুসার ‘শে^তাঙ্গ পদমর্যাদার’ সেনারা কোনো কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির কাছ থেকে নির্দেশ নেবে না। তিনি (ওয়াল্টার) এমন একজন সৈনিক ছিলেন, যিনি  দেশের প্রতি তার ভালোবাসা দিয়ে ‘সাধারণ জ্ঞান’, ধারণা ও সরকারি নিয়ম ও প্রবিধানের অসংগতিকে জয় করতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন।’’ 

১৯১৮ এর ৮ মার্চে ওয়াল্টার উত্তর ফ্রান্সে ফেরেন ২৩তম ব্যাটালিয়নে। ২১ মার্চের ভোর। সূর্য তখনো ওঠেনি। আররাসের কাছের ওই সেনাঘাঁটিতে ব্রিটিশ ও ফরাসি সেনাদের ওপর বোমাবর্ষণ শুরু করে জার্মান সেনারা। এটি যুদ্ধ জয়ের শেষ প্রচেষ্টা ছিল জার্মান বাহিনীর। জার্মান বাহিনীর পাঁচ ঘণ্টার ব্যাপক বোমা ও গোলাবর্ষণের মুখে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল ব্রিটিশ বাহিনী। যে যুদ্ধ স্থায়ী হয় চার মাস। দীর্ঘ এই লড়াইয়ে ৪ লাখ ১৮ হাজার সেনা হতাহতের শিকার হন। যার মধ্যে ওয়াল্টার নিজেও ছিলেন। শেষ পর্যন্ত আসে সেই অন্তিম দিন। ১৯১৮-এর ২৫ মার্চ। ব্রিটিশ ইতিহাসের কালো সেই দিনে পাস-দ্য-ক্যালিসের ফাভরিউইল গ্রামের কাছে বাপাউমে প্রথম যুদ্ধ চলছিল। যে যুদ্ধক্ষেত্রে ওয়াল্টারকে গুলি করে হত্যা করা হয় সেদিন। প্রচ- গোলাগুলি চলছিল তখনো। লিচেস্টার ফসের সাবেক গোলরক্ষক প্রাইভেট টম বিলিংহাম ওয়াল্টারকে উদ্ধার করার চেষ্টা করেন। কিন্তু মহান এই যোদ্ধার মরদেহ কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি আর।

কেমন উপহাস

ব্রিটিশ ফুটবলের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় ছিলেন ওয়াল্টার। ছিলেন সামরিক বাহিনীর প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ কর্মকর্তাও। ফ্রান্সের আররাস স্মৃতি সদনে মেধাবী খেলোয়াড় ও ত্যাগী সেনা ওয়াল্টার টাল-এর নাম খোদাই করা আছে। তার সঙ্গে রয়েছে আরও ৩৪ হাজার ৭৯৪ জন সেনার নামও, যারা প্রাণ হারিয়েছিলেন আররাস যুদ্ধক্ষেত্রে। তবে এই বীরসেনাদের কেউই স্থান পাননি কবরে। ওয়াল্টারকে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘মিলিটারি ক্রস’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মরণোত্তর সেই সম্মাননাও পাননি। তার জীবনীকার ভাসিলি বিশ্বাস করেন, তিনি সামরিক বাহিনীর অতি গোপনীয় একটি মেমো প্রমাণ হিসেবে পেয়েছেন। যেখানে ওয়াল্টারকে কোনো স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করা হয়েছে। ওই মেমোতে সর্বোচ্চ মাত্রার বর্ণবাদী ভাষারও ব্যবহার করা হয়েছে। নিউ ইয়র্কে অবস্থিত ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর নিয়োগ সংশ্লিষ্ট সদর দপ্তরের ওই মেমোতে বলা হয়েছে, ‘‘আমরা কালো বর্ণের কাউকে এখন ‘শ্বেতাঙ্গ ইউনিট’-এ পদ দেওয়ার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করছি।’’ ভাসিলির মতে, ‘এমন একজন ব্যক্তিকে ঘিরে এই বর্ণবাদ পরিচালিত হয়েছে, যিনি অজ্ঞতার বাধাগুলোকে উপহাস করেছিলেন আপন মহিমায়। যে উপহাসের মধ্য দিয়ে তিনি সমসাময়িক অন্যদের সঙ্গে বর্ণের বিচারে অসমতাকে অস্বীকার করার চেষ্টা করেছিলেন।’ তবে বেশ কয়েক দশক পর এই বীরসেনা ও খেলোয়াড়কে সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করেছে নর্থহ্যাম্পটন টাউন। ১৯৯৯ সালে শহরটির সিক্সফিল্ড স্টেডিয়ামের বাইরে ওয়াল্টার টালের নামে একটি স্মৃতিফলক ও একটি বাগান নির্মাণ করা হয়েছে। এই স্টেডিয়ামের রাস্তার ধারে একটি পাবও তার নামে রয়েছে। ২০২১ এর অক্টোবরে তার স্মরণে ম্যানচেস্টার-এ একটি জাতীয় জাদুঘরের হল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।