লাগামহীন চিকিৎসা ব্যয়

করোনা মহামারীর পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, শিল্পোন্নত-উন্নয়নশীল নির্বিশেষে সব রাষ্ট্রকেই স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর পুনর্বিন্যাস নিয়ে ভাবতে হবে। অন্যদিকে, মহামারী শেষ হতে না হতেই ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ও সর্বশেষ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে ব্যক্তির চিকিৎসা ব্যয়েও। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে চিকিৎসাসেবার মূল্য। বিশেষ করে গত ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে মানুষকে আগের চেয়ে বেশি মূল্যে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। দেশে বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি ব্যয়ের তুলনায় তিন গুণ বেশি অর্থ ব্যক্তির পকেট থেকে খরচ হচ্ছে। গত দুই দশক ধরেই মানুষের পকেটের এই ব্যয় বাড়ছে। অন্যদিকে কমছে সরকারি ব্যয়। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকার নির্ধারিত ৫৩ ধরনের ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি।

মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘দেশে ৭৩% চিকিৎসা ব্যয় ব্যক্তি বহন করে’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ‘চিকিৎসা করাতে গিয়ে ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ বিপর্যয়মূলক ব্যয়ের মধ্যে পড়ে।’ সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউট আয়োজিত অনুষ্ঠানে আলোচকরা জানান ভারত, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপের মতো দেশে কিডনি রোগীসহ অনেক জটিল রোগীর জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা চালু রয়েছে। আমাদের দেশে রোগীর তুলনায় ডাক্তার, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে উচ্চতর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বেশিসংখ্যক দক্ষ ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবাকর্মী তৈরি করতে হবে। কিডনি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আর রশিদ বলেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর ৪০ হাজার রোগীর কিডনি বিকল হয় এবং তাদের ৭৫ ভাগই মৃত্যুবরণ করে ডায়ালাইসিস অথবা কিডনি সংযোজনের চিকিৎসার অভাবে। কিডনি ডায়ালাইসিস ও সংযোজনের খরচ কমিয়ে রোগীদের সাধ্যের মধ্যে করতে হবে। মনে রাখতে হবে জনগণকে সুস্থ রাখলে দেশের জিডিপি বাড়বে।

দেশের স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ব্যক্তি খাতে চিকিৎসায় ব্যয় বেড়েছে পাঁচ খাতে। এগুলো হলো: বিভাগীয় শহরে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও রোগীর স্বজনদের থাকা-খাওয়া, গণপরিবহন, অ্যাম্বুলেন্স, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ। এর সঙ্গে চিকিৎসার আনুষঙ্গিক অন্যান্য ব্যয়ও বেড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ দেশ রূপান্তরকে বলেছিলেন, ‘‘আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবায় ‘আউট অব পকেট’ বা ব্যক্তির পকেট থেকে ব্যয় বেশি। সরকারের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের হিসাবে, ২০২১ সালে এ ব্যয় ছিল ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ। সেটাও আন্ডার এস্টিমেটেড ছিল। ওটা সঠিকভাবে করলে ৮০ শতাংশও হয়ে যেতে পারে।’’ বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ আগে যেভাবে ডাক্তার দেখাত, এখন ডাক্তার দেখানো কমে গেছে। মানুষ এখন একদম ঠেকায় না পড়লে ডাক্তারের কাছে যাচ্ছে না, হাসপাতালমুখী কম হচ্ছে।

কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের যে খরচ, তার যদি ১০ শতাংশ বা তার বেশি স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় হয়, তাহলে সে পরিবার বা ব্যক্তি আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এটা বাংলাদেশে অনেক বেশি, ২৫ শতাংশ। পকেটের টাকায় চিকিৎসাব্যয় করতে গিয়ে প্রতি বছর দেশে ৮৬ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে, যা মোট জনসংখ্যার সাড়ে ৪ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তির পকেট থেকে যে ব্যয় হয় তা এশিয়া ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও সবচেয়ে বেশি। জাতিসংঘের জরিপ অনুসারে এশিয়ার ৪৮টি দেশের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে কম ব্যয় করে বাংলাদেশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য ৩৬ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজেটের মাত্র ৫.৪ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ আছে, যেখানে এটা হওয়া উচিত ১৫ শতাংশ। এ খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয় করা উচিত, সেখানে ব্যয় হচ্ছে ১ দশমিক ২ শতাংশ অর্থ।

সাধারণ মানুষের মানসম্মত চিকিৎসাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসা ব্যয় লাঘব করতে হলে দেশব্যাপী জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালে আনতে স্বাস্থ্য খাতের খোলস বদলানোর পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতকে একদম ঢেলে সাজাতে হবে। আমলাতন্ত্র পরিবর্তন চায় না। তারা গতানুগতিক পন্থায় থাকতে চায়। রাজনীতিবিদরা চাইলে স্বাস্থ্য খাতে পরিবর্তন হবে।’ অসাধু চক্র এবং সরকার ও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থা, সব জায়গায় নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার কারণে ব্যয় বেশি বেড়েছে। সরকার যদি স্বাস্থ্য খাতে মনিটরিং বাড়ায়, তাহলে মানুষের দুর্ভোগ কিছুটা হলেও কমবে। এখন যে মনিটরিং হচ্ছে, সেটা পর্যাপ্ত নয়।