পারফেক্ট নাম্বার নাইন

মেসি গাড়ি ছুটছে, তাতে সওয়ার হয়ে ছুটছেন জুলিয়ান আলভারেজও। আর এই জুটিতে গোল বিস্ফোরণে ঝড়ের বেগে ছুটে আর্জেন্টিনা পৌঁছে ফাইনাল জংশনে। ১৮ ডিসেম্বর বিশ্বকাপের সেরার লড়াইয়ে ঈশ্বর মেসির জাদুকরী পায়ে ভর করলেই ঘুচবে আক্ষেপ। এই আসরের মেসি কেবল একা রবি হয়ে জ্বলছেন না; তার ছোঁয়ায় উদ্ভাসিত হচ্ছেন আলভারেজও। সেমিফাইনালে ক্রোয়াটদের কাঁদিয়েছেন দুজনে মিলে। প্রথমে আলভারেজের এনে দেওয়া পেনাল্টি থেকে গোল করেন মেসি। এর দায় তিনি শোধ দেন আলভারেজের পরের দুই গোলে। প্রথমটায় মেসির অবদান খুব বেশি নেই। নিজেদের অর্ধ থেকে কেবল বলটা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন ২২ বছরের আলভারেজকে। সেই বল নিয়ে প্রায় অর্ধেক মাঠ দৌড়ে তিন ক্রোয়াট ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে অসাধারণ গোল করেন। আর দ্বিতীয়ার্ধে মেসির জাদুকরী পাসে গোলের আনুষ্ঠানিকতা সেরে আলভারেজ নিজের আগমনীবার্তা দেন দুনিয়াকে। সেই জয়ে মেসির সঙ্গে মেতে ওঠেন বাঁধভাঙা আনন্দে। মেসি-আলভারেজ যুগলবন্দিতে এখন শিরোপা জয়ের স্বপ্নে বিভোর আলবিসেলেস্তারা। দুজনে মিলে করেছেন ৯ গোল। অথচ একটা সময় প্রিয় তারকার সঙ্গে একটা ছবি তুলতে পেরে ধন্য হয়েছিলেন আলভারেজ।

সৌদি আরবের কাছে অঘটনের শিকার হয়ে অভিযান শুরু হয়েছিল আর্জেন্টিনার। তখন লিওনেল স্কালোনির সেরা একাদশে বিবেচনায় ছিলেন না আলভারেজ। তারচেয়ে ইন্তার মিলান স্ট্রাইকার লাউতারো মার্তিনেজ ছিলেন আর্জেন্টাইন মাস্টারমাইন্ডের প্রথম পছন্দ। মেক্সিকোর বিপক্ষেও সেরা একাদশে আসা হয়নি এ বছর জানুয়ারিতে ম্যানসিটিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই বেশিরভাগ সময় বেঞ্চে কাটানো আলভারেজ। তবে দুটি ম্যাচেই অফ ফর্ম মার্তিনেজের বদলি হয়ে মাঠে নামেন এই তরুণ। তবে পোল্যান্ড ম্যাচে স্কালোনি তাকে নিয়ে আসেন প্রথম একাদশে। কোচের আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন গোল করে। সুবাদে রাউন্ড অব সিক্সটিনের ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও মূল দলে চলে আসেন তিনি। এ ম্যাচে মেসির মোহনীয় গোলের পর সুযোগ সন্ধানী গোলে আলভারেজ দলকে নিয়ে আসেন কোয়ার্টার ফাইনালে। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে কঠিন ম্যাচে অবশ্য গোল না পেলেও আলভারেজ ভালোই ভুগিয়েছে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে। আর মঙ্গলবার রাতে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে মেসিকে পেনাল্টি উপহার দেওয়ার পর করেন জোড়া গোল। যার প্রথমটিকে নির্দ্বিধায় এ আসরের সেরা গোলের তালিকায় স্থান দেওয়া যাবে।

তাই তো ম্যাচ সেরার স্বীকৃতিটা প্রিয় সতীর্থকেই দিয়ে দিতে চাইলেন মেসি, বলেছিলেন ‘এই স্বীকৃতি আলভারেজের প্রাপ্য।’ ম্যানসিটি কোচ পেপ গার্দিওলা যার মধ্যে খুঁজেন অপার সম্ভাবনা, সেই আলভারেজে মজেছেন আর্জেন্টাইন কোচ স্কালোনিও, ‘জুলিয়ান অসাধারণ খেলেছে। কেবল গোলই করেনি, তাদের (ক্রোয়েশিয়ার) শক্তিশালী মিডফিল্ডারকে চ্যালেঞ্জ জানাতে নিচে নেমে এসে অনেক শ্রম খরচ করেছে। এই বয়সটাই তার জন্য বিশ্বকে চেনানোর সময়।’

আর দশটা বালকের মতো মেসি ছিলেন আলভারেজেরও স্বপ্নের তারকা। মাত্র ১২ বছর বয়সে মেসিকে খুব কাছে পেয়ে একটা ছবি তুলতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন। ১০ বছর আগের সেই ছবিটি মঙ্গলবার ম্যাচ চলাকালীন ভাইরাল হয়েছিল ইন্টারনেটে। ১০ বছর পর সেই মেসির সঙ্গেই জুটি গড়ে আর্জেন্টিনাকে দেখাচ্ছেন তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন। ক্রোয়েশিয়াকে হারানোর পর এই তরুণ তারকা প্রত্যয়ী কণ্ঠে বলেছেন, ‘এই জয়টা আমাদের প্রাপ্য ছিল, কারণ আজ আমরা অসাধারণ একটা ম্যাচ খেলে ফাইনালে নাম লিখিয়েছি। যেটা আমাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল। এখন আমাদের রবিবার আরও একবার সেরা ফুটবল খেলেই স্বপ্নের ট্রফিটা দেশকে এবং অবশ্য প্রিয় মেসিকে উপহার দিতে হবে।’

বিশ্বকাপের ফাইনালটাকে নিজের শেষ ঘোষণা দেওয়া মেসিও তরুণ আলভারেজের সঙ্গটা দারুণ উপভোগ করছেন। দুজনের বোঝাপড়াটা হয়েছে চমৎকার। এই যুগলবন্দিতে ভর করেই ১৮ ডিসেম্বর আরেকটি স্বপ্নময় রাতের অপেক্ষায় আর্জেন্টিনা।