জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের শেষ ভাগে পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানি বাহিনী এ দেশীয় দোসরদের সহযোগিতায় হত্যা করেছিল শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, সাংবাদিকসহ জাতির হাজারো মেধাবী সন্তানকে। সেই সময় হত্যাকা-ের শিকার শহীদ বুদ্ধিজীবীদের বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করছে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।

গতকাল বুধবার রায়েরবাজার বধ্যভূমি ও মিরপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করা হয়েছে।

দিনের প্রথম প্রহরে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শ্রদ্ধা জানাতে জড়ো হতে থাকেন নানা বয়সী মানুষ। ভোরের আলো ফুটতেই প্রথমে তাদের উদ্দেশে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপ্রধান আবদুল হামিদ। এরপর শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী চলে যাওয়ার পর মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা জানান আওয়ামী লীগ, বিএনপি, শহীদ পরিবারের সন্তান ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা।

বিএনপির পক্ষ থেকে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ভারপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স।

মিরপুরের মতো রায়েরবাজার বধ্যভূমিতেও মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধের শহীদ বেদিও সকাল থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সর্বস্তরের মানুষের ফুলে ফুলে ভরে ওঠে।

সকাল ৭টার দিকে গ্রাফিক্স আর্টস ইনস্টিটিউটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা প্রথমে রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানান। পরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের সংগঠন প্রজন্ম ৭১, রক্তধারা ৭১-সহ বিভিন্ন সংগঠন শহীদ বেদিতে ফুল দেয়।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীসহ আওয়ামী লীগ নেতারা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে।

স্মৃতিসৌধের খালি জায়গাগুলো সাজানো হয়েছিল শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ছবি দিয়ে। একাত্তরের গেরিলাযোদ্ধা মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন (বিচ্ছু জালাল) সকাল থেকে মাইকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন।

এ ছাড়া রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধের শহীদ বেদিতে ফুলেল শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি নাটক, কবিতা, প্রতিবাদী সমাবেশের মাধ্যমে যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালন করা হয়েছে। বেদির একপাশে ছিল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে কবিতাপাঠ, আবৃত্তি ও দেশের গান পরিবেশন।

বেদি এলাকায় মানববন্ধন করেছে সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটি।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র দুদিন আগে পরাজয় নিশ্চিত জেনে নির্মম আঘাত হানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর ও আলশামস। বেছে বেছে দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, দার্শনিক ও সংস্কৃতিক্ষেত্রের অগ্রগণ্য মানুষকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

পাকিস্তানি ঘাতকরা চেয়েছিল বাঙালিকে মেধা-মননশূন্য করতে। সেজন্য তারা বেছে বেছে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, দার্শনিকসহ বিশিষ্টজনদের হত্যা করে। তাদের শরীরে নিষ্ঠুর নির্যাতনের চিহ্নসহ লাশ পাওয়া যায় মিরপুর ও রায়েরবাজার এলাকায়। পরে তা বধ্যভূমি হিসেবে পরিচিতি পায়।

প্রতিবছর ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করা হয়। এবারও যথাযোগ্য মর্যাদায় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস-২০২২ পালনের লক্ষ্যে জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী বাণী দিয়েছেন। বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি টিভি চ্যানেল দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করেছে। দিবসটি উপলক্ষে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা ও অন্যান্য উপাসনালয়ে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা করা হয়েছে।